সিনেমার মতো
তিস্তা চক্রবর্তী

“….we are all just prisoners here, of our own device…”

ঈগলসের ‘হোটেল ক্যালিফর্নিয়া’-র এই লাইনটা আমার খুব পছন্দের। গুনগুন করতে করতে আজ রাতের পাঁচ নম্বর সিগারেটের শেষ সুখটানটা দিয়ে অ্যাশট্রের দিকে হাত বাড়ালাম। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ। শীতটা বলতে নেই এবার বেশ জাঁকিয়েই পড়েছে। রোজই বাড়ি ফেরার পথে দু’তিন পেগ মেরে আসছি বটে কিন্তু শরীর জুড়ে শৈত্যপ্রবাহ যেন থামছেই না। ভাবছি উষ্ণতার সন্ধানে একবার আদিমতম নেশার আশ্রয় নেব কিনা!

এই মুহূর্তে আমার ঘরখানা ডকুমেন্টারি ফিল্মের সেটের মতো বেশ বেপরোয়া দেখাচ্ছে। চরম অযত্নের ছাপ খুব স্পষ্ট প্রতিটি কোনায়। ঘরময় ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা অসংখ্য দোমড়ানো মোচড়ানো কাগজের দলা আমার জমে থাকা ফ্রাস্ট্রেশনকে উগরে দিচ্ছে। দরজার একপাশে ডাঁই হয়ে পড়ে আছে গত তিনদিনের জমতে থাকা এঁটো খাবারের প্লেট, মাংসের হাড়, খালি হয়ে আসা মদের বোতল, ওষুধের ছেঁড়া স্ট্রিপ আরোও হাবিজাবি কীসব! জানলার বাইরের নিকষ কালো পর্দা দেখলে নিজেকে বেশ প্রত্নজীব গোছের মনে হয়। ভিতর ঘরে বাসা বেঁধে থাকা জমাট অন্ধকার কি তবে বাইরের অন্ধকারের চেয়েও ঘন হয়ে ওঠে কখনো-সখনো?

এই দেখুন, এত কথা বলছি এতক্ষণ ধরে কিন্তু আমার পরিচয়টাই ঠিক করে দেওয়া হয়নি। নমস্কার, আমি রত্নদীপ। রত্নদীপ মিত্র। প্রদীপ মিত্র ও রত্না মিত্রর একমাত্র সন্তান। নিবাস আহিরীটোলা। পেশায় আমি… এই পেশার কথা উঠলেই আমি বড্ড কনফিউজড হয়ে যাই জানেন! আসলে আর পাঁচটা ছাপোষা মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো আমার বাবামাও তাঁদের রত্নদীপকে একজন রত্ন বানানোর স্বপ্ন চোখে নিয়ে বাংলা স্বরবর্ণের আগে ইংরিজি অ্যালফাবেট শেখাতে শুরু করে দেন। ঝাঁ চকচকে না হলেও মোটামুটি একটা ভদ্রস্থ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তিও করে দেন। কি হবে বাবু তুমি বড় হয়ে? ডাক্তার? ইঞ্জিনিয়ার? কর্পোরেট? খুব কনফিউজড লাগতো আমার। আদৌ এগুলোর একটাও হয়ে ওঠার যোগ্যতা আমার আছে কিনা সেটাই বুঝে উঠতে পারিনি কখনো। নব্বইয়ের দশক। পাড়ায় পাড়ায় সরস্বতী পুজো। দেবীর পায়ে জমা পড়েছে সারাবছরের লেখাপড়ার খতিয়ান। উল্টোদিকের মাইকে তখন হইহই করে নচিকেতা গেয়ে উঠছেন জীবনমুখী গলায়…”আমি ভবঘুরেই হব এটাই আমার অ্যাম্বিশন…”

নাহ, ভবঘুরে হওয়া এতো সহজ নয়। অতএব নিজের অ্যাম্বিশন ভুলে বাপমায়ের অ্যাম্বিশনের পালে হাওয়া দিতে স্কুলের পাট চুকিয়ে ভর্তি হলাম এক নামজাদা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। আর এখানেই একদিন ঘটনাচক্রে আলাপ হয়ে যায় দু’ক্লাস সিনিয়র ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র মৈনাকদার সাথে। মৈনাকদাই বেশ দায়িত্ব নিয়ে আমাকে তিনটে নেশার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল — মদ, গাঁজা আর… সিনেমা!

বিচিত্র সংগ্রহ ছিল মৈনাকদার। কুরোসাওয়া গোদার থেকে নিষিদ্ধ নীল, কী যে ছিল না সম্ভারে! গোগ্রাসে গিলতে লাগলাম সব বাছবিচার ভুলে। ক্রমে বাকি দুই নেশাকে ছাপিয়ে জাপটে ধরল সেলুলয়েডের মোহ। সিনেমাওয়ালা। হ্যাঁ, এটাই মনে হয়েছিল একমাত্র ভবিতব্য আমার। মাই আল্টিমেট রিডেম্পশন। অজান্তেই কখন যেন ঠিক করে নিয়েছিলাম পথ। দায়সারাভাবেই পড়াশোনা শেষ করলাম। তারপর স্বপ্নের উড়ান… পুনে ফিল্ম ইন্সটিটিউট। 

এই অব্দি শুনে নিশ্চয়ই ভাবছেন ব্যাটা নির্ঘাত বিদেশি সিনেমা টুকে টুকে বেশ কয়েকটা আঁতেলমার্কা ছবি বানিয়ে ফেলেছে। আজ্ঞে না, তেমনটা ঠিক নয়। চেষ্টা যে একেবারে করিনি তা নয়, কিন্তু পাকেচক্রে একটাও ঠিকঠাক দাঁড়ায়নি। বেশ কয়েকটা প্রোজেক্ট মুখ থুবড়ে পড়ার দরুণ আর কেউ আমার কাজ নিয়ে তেমন কোনো আগ্রহও দেখায় না আজকাল। তাই ঠিক করেছি কমার্শিয়াল ছবিতেই যদি নতুন করে নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায়…

একটা গল্প লিখেছি জানেন। ঠিক গল্প নয়, এটা আসলে একটাই সুতোয় বোনা চারটে আলাদা দৃশ্য। জাম্পকাট হয়ে আসবে পরপর… মানে অনেকটা সেই অ্যালবামের মতো বুঝলেন, যতবার পাতা ওল্টাবেন ততবারই একটা নতুন গল্প মনে পড়ে যাওয়া আর কি…

শেষবারের মতো নিজেকে প্রমাণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করছি, শুনবেন? শুনুন না একটু।

                  দৃশ্য১: মৃন্ময়ীকথা 

বিজয়া দশমী। রাতের নিরবিচ্ছিন্ন অন্ধকার সরিয়ে নদীর জলে এখনও জেগে গর্জনতেল মাখা অহল্যারূপ। দীপ্ত, মায়াময়। কাঁদছে কি মৃন্ময়ী? বৃদ্ধ পুরোহিত চোখ মুছলেন।  চিন্ময়ীরা হারিয়ে যায় বিনা নোটিশে। ফাঁকা ঘর জুড়ে হাওয়ার শনশন শব্দ বুক এফোঁড়ওফোঁড় করে দিয়ে চলে যায়। আজন্মের নিরামিষাশী পুরোহিতের দুঃস্বপ্নে পোড়া মাংসের গন্ধ হানা দেয় বারবার। গা গুলিয়ে ওঠে, ধিক্কারে। চোয়াল কঠিন হয়ে আসে। কিছু বলছেন যেন! কেউ কান পাতলে ঠিক শুনতে পাবে বিড়বিড় শব্দ, “এবার আর কাঁদিস না মিনু। নিরাভরণ করার সময় লুকিয়ে একটা অস্ত্র তোর আঁচলে বেঁধে দিয়েছি। কেউ ডাকলে বিপদে আপদে ধার দিস সেখানা, বুঝলি…”

              দৃশ্য২: বীজতলার থান

“মন রে কৃষিকাজ জানো না…”

কোমরে কড়া পড়ে গেল শিকড়-বাকড়-তাবিজ-কবচের বেড়াজালে। এসব করেই নাকি বাচ্চা বিয়োবে রাণী! বীজ কই, বীজ? সে বেলায় ফক্কা। বিছানায় শিবেনের দৌড় তো তার ভালোই জানা। কিন্তু ওই বজ্জাত শাশুড়িবুড়ির মুখে খালি একই রা… ‘বাঁজা মেয়েছেলে!’ ঢলানিপনা করে নাকি সে বাচ্চা নিচ্ছে না, গতরের বাঁধুনি ধরে রাখতে চায়!

শম্ভু গুণিনের কাছে তেরাত্তির জমা দিয়েছিল ওরা রাণীকে। আশীর্বাদি বীজ বুনে দিতে হবে রাণীর গর্ভে। তা আশীর্বাদিই বটে! খিলখিল করে হেসে লুটিয়ে পড়ে রাণী। অবশ্য গুণিন চাষী মন্দ নয়। বীজ অঙ্কুরেই আগামীর জাত চেনায় । তাহলে এসব লালকালো সুতলি ঘুনসি শিকড় মাদুলি ধারণ করে নিজেকে ভারাক্রান্ত করা কেন? একটানে খুলে ফেলল সব বুজরুকি। ছুঁড়ে দিল দুধপুকুরের গর্ভে। এই উর্বর জমি তার। বীজ নিজের পছন্দেই বুনবে সে। এক পা এক পা করে নেমে যাচ্ছে রাণী। অতলে… সব বাঁধন ছিঁড়ে…

                  দৃশ্য৩: বিনিময় 

পুকুরের স্থির জলের দিকে তাকিয়ে আছে অনিরুদ্ধ… একদৃষ্টে। এবারের প্রোমোশনটা না পেলে পুপুলের হস্টেল খরচ, নতুন ফ্ল্যাটের ইএমআই সবকিছু চালানো বেশ কঠিন হয়ে উঠবে। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে একটার পর একটা সিগারেট ছাই হচ্ছে তখন থেকে। কিছুটা সময় পুড়ছে, আর কিছুই নয়।

“কি গো, রেডি হবে না! ধোঁয়া ওড়ালেই পেট ভরবে তো!” মেখলার গলায় সম্বিত ফিরল। পেছন ফিরে মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলো মেখলাকে। নিখুঁত কোমরের ভাঁজে উদ্ধত বুকে তীক্ষ্ণ চাহনিতে এই মধ্য তিরিশেও যেন আগুন। এগিয়ে এসে ওর কোমরটা জড়িয়ে বুকের কাছে টেনে আনল সে। ঘাড়ের কাছে মুখ ডুবিয়ে… নরম চুল আর পারফিউমের গন্ধে হারিয়ে যেতে যেতেও মুহূর্তের জন্য হিসেবি হয়ে ওঠে অনিরুদ্ধ। না’হয় হাত সেঁকলোই ধর্মেশ আহুজা কিছুটা এই আগুন আঁচে। বিনিময় তো আদিম কাল থেকেই বাণিজ্যের নিয়ম। চুলোয় যাক দু’পয়সার নীতিবোধ শালা!

                    দৃশ্য৪: ভাসান 

এই নিয়ে পরপর তিনবার। ব্যর্থ উপন্যাসের পান্ডুলিপি হাতে নিয়ে বসে আছে পার্থ গঙ্গার ঘাটে। সন্ধের এই সময়টা বেলুড় মঠে প্রায়ই আসে সে। নিভৃতে। ব্যাঙ্গালোরের চাকরিটা এবার না নিলে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। লেখক হবার বাসনায় মাটিচাপা দেবার সময় এসে গেছে হয়তো। ডান অ্যান্ড ডাস্টেড।

জলের দিকে তাকিয়ে থাকলে অর্থহীন ইচ্ছের বুদবুদ থেকে-থেকেই বুড়বুড়ি কেটে যায়। চিতসাঁতারে আকাশ ভাসে চোখে, ডুবসাঁতারে নিশ্চিন্ত আড়াল। মাঝে-মাঝেই তাই ডুবতে ইচ্ছে করে খুব…

ঝপাস করে একটা শব্দ। নাহ্, দুঃসাহস সবাইকে মানায় না। পার্থ দাঁড়িয়ে রয়েছে ঘাটে। ভাঙা মুকুট থেকে খসে পড়া আহত শোলার কুচির মতো ছড়িয়ে রয়েছে ওরা ঘোলাজলে। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে বিগত বহু বছরের লালিত রূপকথা। অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে আসছে ক্রমশ। চোখ কচলে নিয়ে পা চালায় পার্থ। ফেরার বাস ধরতে হবে…

   “কাট কাট… এক্সেলেন্ট শট স্যার… যাস্ট মাইন্ডব্লোইং…”

ডিরেক্টর অপূর্ব ঘোষ উচ্ছ্বসিত। রত্নদীপ মিত্র ওরফে অভিনেতা কৌস্তভ সেনের ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি । ভুরু নাচিয়ে বললেন, “কী দাদা, অ্যাওয়ার্ড আসছে তো?”

অপূর্ব ঘোষ বছর কুড়ি পেছনে হাঁটছিলেন। জীবনের গল্পও আসলে অনেকটা সেলুলয়েডের মতোই। শুধু একজন সঠিক পরিচালক প্রয়োজন, যিনি আড়াল থেকে চিৎকার করে উঠে বলবেন… “ক্যামেরা স্টার্ট রোলিং অ্যান্ড… অ্যাকশন!”

1 Comment

  • শ্বেতা

    Reply March 12, 2021 |

    খুব সুন্দর। বর্তমানে মানুষের ইচ্ছা বা অনিচ্ছা গুলো মনে হয় এইভাবেই পূরণ করার অবান্তর চাহিদা জীবনটাকে অকারণ জটিলতায় ভরিয়ে তোলে। কোনটা প্রয়োজন আর কোনটা বিলাসিতা সেটাই সঠিকভাবে নির্ধারণ করা দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। তাই বিভিন্ন সামাজিক গন্ডির বেড়াজালে বড়ো হয়ে উঠলেও দিনের শেষে কোথায় যেন সবাই একাকার হয়ে যায়। তোর লেখনী সমৃদ্ধ করুক আমাদের ।আমরা গর্বিত তুই আমাদেরই একজন ❤️💛💚

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...