শ্রী শিবাজী সেনগুপ্ত

(এই সংখ্যার ‘আমচি মুম্বাই’ বিভাগে পরিচয় করিয়ে দেব মুম্বাই শহরের বিশিষ্ট চারজন অভিনেতা ও নাট্যকর্মীর সঙ্গে। নানান প্রতিকূলতার মধ্যেও যারা কয়েকযুগ ধরে এই শহরে বাংলা নাট্যচর্চার  পরিসরটিকে সজীব রেখেছেন। ওনাদের প্রত্যেককেই একই প্রশ্নমালা পাঠিয়ে অনুরোধ করেছিলাম সেগুলোর সংক্ষিপ্ত উত্তর লিখে পাঠাতে। ওনারা আমাকে বাধিত করেছেন। আমাদের উদ্দেশ্য হলো সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা বম্বেDuck-এর আগ্রহী পাঠকদের সঙ্গে এনাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং পাঠকদের মুম্বাই শহরে বাংলা নাট্যচর্চা সম্বন্ধে একটা ধারণা দেওয়া। )

আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিলেন  শ্রী শিবাজী সেনগুপ্ত।

১) আপনার একক এবং আপনার নাট্যদলের নাট্যচর্চার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

মুম্বাইতে এসেছি ১৯৮৪ সালে। তখন থেকেই মুম্বাইতে নাটক করে চলেছি। কখনও অভিনেতা, কখনও পরিচালক হিসেবে। মুম্বাইতে প্রথম নাটক করি ১৯৮৪ এ দাদার লিটল পাইওনির্য়াসের হয়ে শিবাজী পার্কের বেঙ্গল ক্লাবের দূর্গাপূজাতে। পরের দিকে দাদার শিবাজী পার্ক বেঙ্গল ক্লাবের প্রযোজনায় হিন্দী নাটক “ জগন্নাথ ” নাটকের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতার  রৌপ্য পদক প্রাপ্তি হয়েছিলো মহারাষ্ট্র সরকার থেকে। কলকাতায় পড়াশোনার সাথে সাথে নাট্যচর্চা করতাম। তখন যাত্রা করতে ভালোলাগতো। যাত্রা করেছি লুকিয়ে লুকিয়ে বাবার কানমলা খাওয়া সত্ত্বেও। কারিগরী বিদ্যার ছাত্রাবাসের সুপারিডেন্টকে ম্যানেজ করে রির্হাসালে যেতাম প্রায়শই। সতীর্থের বিশ্বাসঘাতকতায় খবর পৌঁছে যেতো বাবার কাছে। কারণ ছিলো সিগারেটের কাউন্টার পার্ট না দেওয়া। বাবা সবশুনে বলতেন পড়াশোনা ঠিক রেখে সবকিছু করো। বাবাওতো একজন ভালো অভিনেতা ছিলেন। বাংলা ভাষার নাটকের সাথে সাথে দীর্ঘ দিন কাজ করেছি নাদিরা জাহির বব্বরের ‘একজুট ’ নাটকের গ্রুপের সাথে। নাদিরা জীর ( বাজী ) দৌলতে পৃথ্বী থিয়াটারে বহু নাটক করার সুযোগ অর্জন করেছি। পেয়েছি বহু বিশিষ্ট অভিনেতার সান্নিধ্য। শিখেছি নাটকের অনেক খুঁটিনাটি। এখনও শিখে চলেছি নিরন্তর। নাটক করা ছাড়াও কয়েকটি সিনেমা, কয়েকটি ডেলীসোপ করেছি। একসময় প্রচুর বাঙ্গলা ডাবিং-ও করেছি। উর্মিমালা বসুর কাছে শ্রুতি নাটকের প্রশিক্ষণের সাথে সাথে চলছে আবৃত্তি চর্চার প্রশিক্ষণ সৌমী রাজলক্ষ্মীর কাছে। অনলাইনে প্রবাসী শিশুদের বাংলা শেখানোর কাজ করছি। এখনতো অনেক নন-বেঙ্গলীরাও শিখছেন বাংলাভাষা। বাংলা ভাষা শিক্ষা সম্প্রসারণের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।

প্রথম নিজস্ব দলের নাম ছিলো ‘নিবেদন’। এয়ার ইন্ডিয়ার আর্থিক সহায়তায় বহু নাটক পরিবেশনা করেছিলাম। বহু পুরস্কারের প্রাপ্তি হয়েছিলো। বর্তমান দলের নাম ‘রূপাঙ্গন’। বহু নাটক পরিবেশনা করা হয়েছে। ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা আয়োজিত ২০তম ভারত রঙ্গ মহোৎসবের ( ভারতের আর্ন্তজাতিক থিয়েটার উৎসবে ) এবং পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমির আয়োজনে ১৬তম নাট্যমেলায় আমাদের বহু চর্চিত নাটক ‘দ্বিজশ্রেষ্ঠ’ মঞ্চস্থ হয়েছে। কালাঘোড়া আর্ট ফেষ্টিভালে প্রথম বাঙ্গলা নাটক মঞ্চস্থ করার সাফল্য অর্জন করেছিলো ‘আমার মেয়েবেলা’। নাটকের মহরার সাথে সাথে চলে অভিনয়-প্রশিক্ষণ। মঞ্চের বিভিন্ন ক্ষেত্র, তার প্রয়োগ, আবেগ ও বাচিক প্রয়োগ, আলো, আবহ মিউজিকের ব্যবহার, মঞ্চে চলাফেরা ইত্যাদি। এই মহামারীর প্রাক্কালে আমরা কাজ বন্ধ রাখি নি। অনলাইনে ১৯টি স্বল্প দৈর্ঘের ছবি (নিজেদেরই এডিটিং করা ) ও ৮টি শ্রুতি নাটক উপস্থাপনা করেছি।

২) নিজেকে মূলত একজন অভিনেতা না নাট্যশিল্পী, কী ভাবে দেখেন?

নিজেকে একজন নাট্যকর্মী হিসাবে ভাবি। অভিনয়ের সাথে পরিচালনা করতে করতে মঞ্চ-আলো ও আবহ মিউজিকের প্রক্ষেপণ করি এবং করতে ভালোবাসি।

৩) নাটক আপনার কাছে কী? বিনোদন? প্যাশন? না কি  অন্যতর কিছু ?

নাটক আমার কাছে সমাজ-দর্পণ। সামাজিক বা পারিবারিক দ্বন্দ্ব নিয়েই কাজ করতে ভালোবাসি এবং করার চেষ্টা করি। নাটক আমার কাছে প্যাশন বা প্রণয়।

৪) মুম্বাইয়ে বসে বাংলা নাটক করতে গিয়ে কোন অসুবিধাগুলোকে সব থেকে বড় সমস্যা বলে মনে করেন?

মূলতঃ অর্থনৈতিক সংকট। আমাদের মতো ছোট দলগুলি মাথা উঠে দাঁড়াতে পারছে না সীমিত দর্শকের কারণে এবং স্বল্প মূল্যের প্রবেশ মূল্যের জন্যে। স্বল্প মূল্যের প্রবেশ মূল্য রেখেও পূর্ণ হয় না প্রেক্ষাগৃহ। হয়তো ব্যবসায়িক বুদ্ধির অপক্কতা। যেখানে কলকাতায় আমাদের নাটক একই দর্শক বারবার দেখেছেন। বাকী রইলো মহড়ার জন্য উপযুক্ত স্থান। সংগ্রাম দীর্ঘজীবি হোক।

৫) আপনার নাট্যদলের উল্লেখযোগ্য প্রযোজনাগুলো কী?  দু একটি প্রিয় কাজ সম্বন্ধে একটু  বিস্তারিত বলুন।

থিয়েটার-ষ্টুডিও নাটক হিসেবে ‘ তিন বান্দর ’। কলকাতা, মুম্বা্ই, পুনের দর্শকের উচ্ছ প্রশংসিত নাটক।

একাঙ্ক নাটক হিসেবে ‘ আমার মেয়েবেলা ’ আগেই এর সম্বন্ধে বলেছি।

পূর্ণাঙ্গ নাটক হিসেবে ‘ দ্বিজশ্রেষ্ঠ ’ আগেই এর সম্বন্ধে বলেছি। কলকাতা, মুম্বাই, পুনে, বেনারসের দর্শকের আশীর্বাদ ধন্য নাটক। বিভিন্ন বাঙ্গলা ও হিন্দী কাগজ থেকে পাওয়া গেছে অভিনন্দন।

আরেকটি পূর্ণাঙ্গ নাটক ‘ হরমিতান ’ নাটকটি সাফল্য পেয়েছে কলকাতায়। বিভিন্ন কাগজে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছিলো। নাটকটির প্রেক্ষাপট পুরুলিয়া ছিলো বলে হয়তো কলকাতার দর্শক সাদরে গ্রহণ করেছিলো।

৬) আপনার নাট্যদল কি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছে? পেলে, কী ?

সঙ্গীত নাটক আকাদেমী, দিল্লী থেকে পাওয়া গেছে নাট্য উৎসবের আর্থিক সহায়তা। মহামারীর কারণে মঞ্চে করা সম্ভব হয়নি। অনলাইনে করতে হয়েছে। সম্প্রতি Ministry of Culture ( Govt of India ) নব্য নাট্যদল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাকী কথা আজ থাক।

৭) নাটক নিয়ে কোনো স্বপ্ন দেখেন? জানতে চাই কী সেই স্বপ্ন।

স্বপ্ন অনেক থাকলেও বাস্তবয়তার পর্যায় নিয়ে যাওয়া এক কঠিন কাজ। পুরানো ধ্যান ধারনা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন নতুন পরীক্ষামূলক কাজ করার ইচ্ছে, সেখানে থাকুক আমাদের সমাজের কথা, আমাদের সবার কথা।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...