শ্রী লাকি মুখার্জি

(এই সংখ্যার ‘আমচি মুম্বাই’ বিভাগে পরিচয় করিয়ে দেব মুম্বাই শহরের বিশিষ্ট চারজন অভিনেতা ও নাট্যকর্মীর সঙ্গে। নানান প্রতিকূলতার মধ্যেও যারা কয়েকযুগ ধরে এই শহরে বাংলা নাট্যচর্চার  পরিসরটিকে সজীব রেখেছেন। ওনাদের প্রত্যেককেই একই প্রশ্নমালা পাঠিয়ে অনুরোধ করেছিলাম সেগুলোর সংক্ষিপ্ত উত্তর লিখে পাঠাতে। ওনারা আমাকে বাধিত করেছেন। আমাদের উদ্দেশ্য হলো সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা বম্বেDuck-এর আগ্রহী পাঠকদের সঙ্গে এনাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং পাঠকদের মুম্বাই শহরে বাংলা নাট্যচর্চা সম্বন্ধে একটা ধারণা দেওয়া। )

আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিলেন  শ্রী লাকি মুখার্জি।

১) আপনার একক এবং আপনার নাট্যদলের নাট্যচর্চার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

 মা আনন্দময়ীর আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে – তাঁকে স্মরণে রেখে ১৯৭৯ সালে মনিলাল গঙ্গোপাধ্যায় এর “কংকালের টংকার” নামের ছোটদের একটি হাসির গল্পের নাট্যরূপ দিয়ে – ঐ নামেই মঞ্চস্থ করার মাধ্যমেই আনন্দমের পথ চলা শুরু। একটি  জীবন্ত মানুষ কে নিয়ে দশটি ভূতের নাচ গান দর্শককে মাতিয়ে তুলেছিল। বিএসসি পাশ করা পর্যন্ত কোন দিন নাটক করিনি। বম্বের সুবিখ্যাত VJTI তে Engineering পড়া কালে কলেজের হোস্টেলে থাকা কয়েকটি বাঙ্গালী ছাত্রদের উদ্যোগেই জীবনের প্রথম মঞ্চাভিনয়। তখন Bombay University তে Inter Collegiate All Language Drama Competition  হতো খুব উদ্দীপনার সঙ্গে। প্রথম দু বছর Certificate of Merit for Acting পাওয়ার পর তৃতীয় বছরে আমাদের কলেজের নাটক 3 rd হয় এবং  Anton Chekovএর “The Proposal” অবলম্বনে রমেন লাহিড়ীর “রাজযোটক” নাটকে একটি বিয়ে পাগল বোকা হেঁপো রুগীর  চরিত্রে অভিনয়ের জন্যে Bombay University’ র Best Actorএর পুরষ্কার টি কপালে জোটে ১৯৬৬ সালে।  সেই সময় দূর্গাপূজা উপলক্ষে শিবাজী পার্কে পূর্ণাঙ্গ বাংলা নাটকের প্রতিযোগিতা হতো। আমি তখন দাদারের “লিটল পাইওনিয়ারস “এ অভিনয়ের ডাক পেতাম মাঝে মধ্যে। ১৯৭২’সালে পরিচালকের অভাবে আমার ডাক পড়ে শ্রদ্ধেয় বাদল সরকারের” বাকি ইতিহাস ” নাটকটি পরিচালনা করার। সে বছর আমাদের নাটকটি শ্রেষ্ঠ নাটকের পুরষ্কার পায় এবং ব্যাক্তিগত ভাবে সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচালক ও সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরষ্কারে আমাকে ভূষিত করেন।

এই সব থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে নাটক দেখা শুরু করলাম। অফিসের কাজে কলকাতায় গেলেই খুব নাটক দেখতাম আরও শেখার আশায়।

২) নিজেকে মূলত একজন অভিনেতা না নাট্যশিল্পী, কী ভাবে দেখেন?

নিজেকে একজন একনিষ্ঠ নাট্য কর্মী হিসেবেই দেখি । এখনো অনেক শেখার আছে ।

৩) নাটক আপনার কাছে কী? বিনোদন? প্যাশন? না কি  অন্যতর কিছু?

 নাটক আমার প্যাসন।  বিশেষ ভালবাসার বিষয়। তবে বিনোদনকেও অস্বীকার করা যায় না। জ্ঞান দেবার মতো জ্ঞান আমার নেই। ভাল গল্পকে সুন্দর করে মঞ্চস্থ করতে পারলে দর্শকদের  সমর্থন পাওয়া যায়।  বিশ্বাস করি – দর্শক বাদ দিয়ে নাটক নয়।‌‌

৪) মুম্বাইয়ে বসে বাংলা নাটক করতে গিয়ে কোন অসুবিধাগুলোকে সব থেকে বড় সমস্যা বলে মনে করেন?

উপযুক্ত চরিত্রের জন্য উপযুক্ত অভিনেতা বা অভিনেত্রী পাওয়া। নাটককে যাঁরা ভালোবাসেন তাঁরা বম্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রিহার্সালে আসেন সম্পূর্ণ নিজের খরচা ও সময় ব্যায়  করে। এ ছাড়া বাংলা জানা Light Technician এর অভাবে কলকাতা থেকে তাদের আনা, থাকা খাওয়ার ব্যাবস্থা করা এবং  পারিশ্রমিক দেওয়া যথেষ্টই ব্যায় সাপেক্ষ ব্যাপার। ভালো Hall এর ভাড়া কলকাতার তুলনায় কয়েকগুন বেশি।

৫) আপনার নাট্যদলের উল্লেখযোগ্য প্রযোজনাগুলো কী?  দু একটি প্রিয় কাজ সম্বন্ধে একটু  বিস্তারিত বলুন।

 “আনন্দম” এর সর্বতোভাবে শ্রেষ্ঠ নাটক – ” ঠাকুরের আলোয় নটী বিনোদিনী”। দর্শকদের অন্য অনুভূতির জগতে নিয়ে যায়। বম্বের রামকৃষ্ণ মিশন ছাড়াও নাটকটি দক্ষিনেশ্বরে মা ভবতারিণীর মন্দির প্রাঙ্গণে মঞ্চস্থ করার সৌভাগ্য আমাদের হয়েছে। এ এক বিরল ঐশ্বরিক অভিজ্ঞতা।‌ নাটকটি ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ১৫ বার অভিনীত হয়েছে।

কলকাতায় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে আনন্দম এর মঞ্চস্থ করা সঙ্গীতবহুল পূর্ণাঙ্গ নাটক “‘কথায় গানে রবীন্দ্রনাথ” – অপর একটি বিশেষ প্রশংসনীয় নাটক।

অনেক রিসার্চ ভিত্তিক অনেক অজানা কাহিনীর সমন্বয়ে রচিত – ” অন্য বিবেকানন্দ”

অপর একটি উল্লেখযোগ্য নাটক। নাটকের প্রয়োজনে অভিনয় করেন – কানাডা, আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের ৩ জন বিদেশী অভিনেতা ও অভিনেত্রী । আনন্দমের হাস্যমধুর ৪ টি পূর্ণাঙ্গ নাটক – বনফুল-এর “ভীমপলশ্রী ” অবলম্বনে ” অঘটন”, সমরেশ বসূর -” ছুটির ফাঁদে”, “নাটের গুরু” , একটি জনপ্রিয় মারাঠি নাটকের বাংলা রূপান্তর – ” দুষ্টূ প্রজাপতি” । প্রান মাতানো হাসির নাটকগুলি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এরই পাশাপাশি আর্থার মিলারের মৃত্যুরহস্যঘন নাটক  All My Sons অবলম্বনে “মৃত্যুবান”, ত্রিকোন প্রেমের রহস্য ঘন স্বরচিত -“মুখোশ” ছাড়াও ক্ষীরোদ প্রসাদ বিদ্যাবিনোদের নৃত্য গীতে ভরপুর -” আলিবাবা” নাটকও দর্শকবৃন্দের  প্রভূত প্রশংসা পেয়েছে । সেই সঙ্গে রয়েছে বহু উচ্চ প্রশংসিত একাঙ্ক নাটক ।

৬) আপনার নাট্যদল কি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছে? পেলে, কী? 

নানান  অসুবিধার কারনে আনন্দম সাধারণত কোন নাট্য প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহন করে না ।‌

 ৭) নাটক নিয়ে কোনো স্বপ্ন দেখেন? জানতে চাই কী সেই স্বপ্ন।

সময় আমার কমে আসছে। নাটকের মাধ্যমে কিছু সামাজিক কাজে তাই আনন্দম তৎপর।‌ তারই ফলে গত ১২ বছরে  নাটক থেকে সংগৃহীত অর্থ ১ কোটি ৩ লক্ষ টাকা আনন্দম দিতে পেরেছে দু:স্থ ক্যানসার রোগাক্রান্তদের সাহায্যার্থে এবং কলকাতার বারবনিতাদের অবাঞ্ছিত দশটি ছেলে মেয়েকে School Final পাস করা পর্যন্ত যাবতীয় খরচা বহন করতে।‌

তবুও নতুন কিছু বৈচিত্র্যময় নাটক করার বা করানোর চেষ্টায় রত হয়ে ভারতের প্রথম Melody Queen তথা 1 st Superstar of Indian Films- কানন দেবীর অসাধারণ জীবন কাহিনীর ওপর অনেক রিসার্চ করে নাটকটি সাজিয়েছি – নাম  ” কানন বালা থেকে কানন দেবী” ।  সঙ্গীতবহুল এই নাটকটিতে অভিনয় করছেন বম্বের ৫৪ জন শিল্পী। মঞ্চস্থ হয়েছে ২৪ শে এপ্রিল ‘২২, রবিবার নবী মুম্বাই এর বিষ্নুদাস  ভাবে নাট্যগৃহে।  স্বপ্ন দেখি এই নাটকটিকে ঘিরে।

3 Comments

  • সুপ্রিয় লাহিড়ী

    Reply May 20, 2022 |

    দারুণ লাগলো। আমি আনন্দমের সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হয়ে ও কাননবালা থেকে কাননদেবী নাটকের সূত্রধারের দায়িত্ব পালন করতে পেরে ধন্য হয়েছি।
    শিল্পসাধনা ছাড়াও সমাজসেবায় আনন্দমের এই যোগদান এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত।

  • Shubhasish Kanjilal

    Reply May 22, 2022 |

    লাকিদার সাথ প্রথম আলাপ হলো সেই কবি সত্যে্দ্রনাথ দত্ত গান ” শান্ত নদীটির পথে আঁকা ছবিটি গান দিয়ে বান্দ্রা ওপেন এয়ার থিয়েটার রিহার্সাল।
    নাটক ছাড়া লাকীদা কিছু গানের অনু্ঠান করতেন। আমাদের কোম্পানি ফ্ল্যাট ছিল 16 Road সন্তাক্রুজ ওয়েস্ট , আর পড়ে BKC ফ্ল্যাট তে রিহার্সাল হত। সব সময় হাসি খুশি , আমরাও তখন খুব কলকাতা স্টাইল এ চেংড়া মি মারতাম। বিবেকানন্দ ক্লাবের গানের অনু্ঠানে ওপেন এয়ার থিয়েটার এই গানটা ফাটিয়ে গেয়েছিলাম। তারপর আবার তরুণ ব্যানার্জীর কাজল নদীর জলে রবীন্দ্র নাট্য মন্দির। দুটোই ভালো , আমার পছন্দের গান। তখন কার ওনার নাটকের টিম ছিল ফাটা ফাটি। দত্ত বৌদি , সত্যেন দা , বাচ্চু , তপনদা , অশোকদা সব এক সে বরকার এক। অসাধারণ নাটকের দল ।
    লাকিদা বোম্বে তে সত্যি সত্যি সংস্কৃতি ধরে রেখেছেন , আর বাচ্চু হটাত চলে যাবার পর , লাকী দা আজ অবধি অনেক সমাজ মূলক কাজ করে যাচ্ছেন। শুভাশীষ

  • গোরা চক্রবর্তী

    Reply May 22, 2022 |

    এখন পর্যন্ত মুম্বাই শহরের সর্বশ্রেষ্ঠ নাট্যকর্মী হলেন শ্রী লাকি মুখার্জী। সবচেয়ে বড় কথা তিনি নিজে সবার সাথে অমায়িক ভাবে মেশেন। দর্শকদের নিয়ে ভাবেন, অতীত অভিনয় জগতের নাট্যজগতের ব্যক্তিত্বদের নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেন। কেন নাটক করেন, সে কথা কিন্তু সঠিক করে বলেন নি। তিনি নাটক করেন ১) নাটককে ভালোবেসে, ২) নাটকের কুশীলবদের সাথে সুখ দুঃখ ভাগ করে, অন্য ব্যক্তিত্বকে সঠিক করে জানতে, ৩) তাঁর স্বপ্ন ছিল মুম্বাইয়ে নাট্যজগতের উন্নতি সাধন এবং স্বনির্ভরতা। ৪) মুম্বাইয়ের অন্যভাষার নাট্যজগতের সাথে আদান প্রদান, ৫) সমাজ সেবায় মুম্বাই শহরে আগত বিপন্ন ক্যান্সার রোগীদের আর্থিক সাহায্য। এবং ৬) সবচেয়ে বড় কথা, তিনি দর্শককে কোন সময় উৎপীড়ন করেন না অথচ সর্বদা দর্শক মনের মননের রসদ যোগাতে সচেষ্ট। এবম্বিধ নাট্য-ব্যক্তিত্বকে সম্মান জানিয়ে বোম্বেডাক পত্রিকা মুম্বাই শহরের পাঠক মানসে শ্লাঘার পাত্র হয়ে উঠলো।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...