শ্রী দীপায়ন গোস্বামী

(এই সংখ্যার ‘আমচি মুম্বাই’ বিভাগে পরিচয় করিয়ে দেব মুম্বাই শহরের বিশিষ্ট চারজন অভিনেতা ও নাট্যকর্মীর সঙ্গে। নানান প্রতিকূলতার মধ্যেও যারা কয়েকযুগ ধরে এই শহরে বাংলা নাট্যচর্চার  পরিসরটিকে সজীব রেখেছেন। ওনাদের প্রত্যেককেই একই প্রশ্নমালা পাঠিয়ে অনুরোধ করেছিলাম সেগুলোর সংক্ষিপ্ত উত্তর লিখে পাঠাতে। ওনারা আমাকে বাধিত করেছেন। আমাদের উদ্দেশ্য হলো সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা বম্বেDuck-এর আগ্রহী পাঠকদের সঙ্গে এনাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং পাঠকদের মুম্বাই শহরে বাংলা নাট্যচর্চা সম্বন্ধে একটা ধারণা দেওয়া। )

আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিলেন   শ্রী  দীপায়ন গোস্বামী।

১) আপনার একক এবং আপনার নাট্যদলের নাট্যচর্চার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

বন্ধু অর্ঘ্য দত্ত এবং ‘বম্বে ডাক’-এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানাই। আমার আর শাশ্বতীর ভাবনাগুলো একসাথে ক’রে আমি দীপায়ন – আমার জবানীতেই লিখছি। 

আমার বা শাশ্বতীর এককের কথা বলব না। খুব একটা কিছু উল্লেখযোগ্যও নয়। ঐ যেরকম টা স্কুল-কলেজে হয়ে থাকে। আমাদের যুগ্মজীবন আর নাট্যচর্চার শুরু একসাথে দ্বৈত ভাবে – বিশেষতঃ শ্রুতি অভিনয় পর্যায়ে বা আমাদের ঘিরে আমাদেরই তৈরি নাট্যদল “দিশারী”-র সঙ্গে।
“দিশারী” র জন্ম ১৯৮৬ তে। বেশ কিছু সমমনস্ক ছেলেপুলেও জুটে গেলো। তারপর ঐ যেমনটা হয় – পূজোয়, ১লা বৈশাখ, ২৫শে বৈশাখ হৈ হৈ করে নাটক করা নড়বড়ে মঞ্চে। মনে পড়ছে প্রথম সেভাবে বড় মঞ্চে নাটক করা ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে, রবীন্দ্র নাট্য মন্দির, প্রভাদেবীতে প্রয়াত শ্রী রতন দাশগুপ্তের সার্থক-রূপায়ন এর আমন্ত্রণে। ও বাবা! অত বড় মঞ্চ! অত আলোর ব্যবস্থা! আমরা তো হাঁ!! যাইহোক, একটু ধাতস্থ হ’য়ে দলের সকলকে বললাম – সুযোগ পেয়েছো … give your best! হোলো নাটক। দিনটা ছিল বোধহয় রোববার। আসল ঘটনাটা ঘটলো পরের বুধবার। সকালে সবে উঠে অফিস যাবার জন্য তৈরী হচ্ছি, এমন সময় বাইরের ঘর থেকে শাশ্বতীর হাঁকডাক! ঘাবড়ে গিয়ে বাইরের ঘরে এসে দেখি শাশ্বতী সেদিনের TOI – এর একটা পাতার ওপর একেবারে হামলে পড়েছে। আমাকে দেখে উত্তেজিত ভাবে কাগজ খানা আমায় দিয়ে বললো – ‘পড়ে দেখো।’ দেখি গত রোববারের রবীন্দ্র নাট্য মন্দিরের সেই সাংস্কৃতিক সন্ধ্যের একটি বিস্তৃত প্রতিবেদন রয়েছে এবং আমাদের অত্যন্ত সুখ্যাতি করা হয়েছে। সে সময় TOI – এর এই ধারাটা ছিল। গোটা কাগজটাই বিজ্ঞাপন সর্বস্ব ছিল না। যাই হোক, আনন্দে আত্মহারা হয়ে দুজনেই অফিস থেকে সিএল নিয়ে ফেললাম। বিকেলে দলের সকলকে ডেকে দেখালাম। সকলের উৎসাহ তখন তুঙ্গে। এ ভাবেই শুরু হোলো পথচলা।
কিন্তু এই অত্যুৎসাহে এর পরেই এলো বিপর্যয়! ১৯৮৭ তেই আমরা প্রথম যোগ দিলাম সার্থক- রূপায়নের একাঙ্ক নাট্য প্রতিযোগিতায়। সেই রবীন্দ্র নাট্যমন্দিরেই। একটা অত্যন্ত জটিল একাঙ্ক নাটক “স্ফিংক্স” মঞ্চস্থ করলাম এবং কোনোরকম পুরস্কার পাওয়া দূরে থাক, বিচারকমণ্ডলী নির্দেশক হিসেবে জানালেন তাদের অপছন্দের কথা।  পরের দিন আমার গৃহে দলীয় অধিবেশন এবং আলোচনা অন্তে ঠিক হোলো আমরা শুধুমাত্র বিনোদনমূলক নাটকই করবো না, যে নাটক কিছু বলে, মানুষকে ভাবায় এমন নাটকও করবো। শুরু হোলো নতুন উদ্যমে পথ চলা।
এরপর ১৯৮৮ থেকে একাদিক্রমে ১৯৯৩ পর্যন্ত সার্থক-রূপায়নের একাঙ্ক নাট্য প্রতিযোগিতায় দিশারী অংশগ্রহণ করেছে এবং প্রায় প্রতিবছর  কিছু না কিছু পুরস্কার অর্জন করেছে। এর মধ্যে ১৯৯১ আর ১৯৯২ পরপর দু’বছর শ্রেষ্ঠ প্রযোজনা, শ্রেষ্ঠ পরিচালনা, শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার  পেয়েছে দিশারী। সে সময় শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর  পুরস্কার তো শাশ্বতীর মোটামুটি একচেটিয়া ছিল। ১৯৯৫ থেকে আমরা যোগদান শুরু করলাম পুণার “দিশারী” র নাট্য মেলায় পুণেতে। খুব ভালো লাগলো। একটা বেশ খোলামেলা, ফুরফুরে আবহাওয়া। প্রতিযোগিতার মতো দম বন্ধ করা, দেখিয়ে দেব গোছের নয়। উপরন্তু যে performing arts এ দর্শকই সব, সেখানে তো নাট্যমেলাই ভালো। মাত্র দু’তিনজন বিচারকের নির্ণয় শেষ কথা হবে কেন? আরেকটা কারণও ছিল। দেখছিলাম ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতা মঞ্চ ছাপিয়ে জনজীবনেও ঢুকে পড়ছে! অতঃপর আমরা নাট্য প্রতিযোগিতায় যোগদান করা থেকে বিরত হলাম, অন্ততঃ মুম্বাইতে। এর মধ্যে পুণায় “দিশারী” নাট্যগোষ্ঠীর আমন্ত্রণে তাদের নাট্য মেলায় আমাদের যোগদান হয়ে গেছে একাদিক্রমে ন’বছর। পুণার নাট্যমোদী দর্শকের কাছে আমরা হয়ে উঠেছি অত্যন্ত প্রিয়। 
পুণার পত্রিকাতেও বারবার সুখ্যাতি অর্জন করেছি আমরা। যোগদান করতে শুরু করেছি সর্বভারতীয় স্তরে একাঙ্ক ও পূর্ণাঙ্গ নাট্য মেলায় ও প্রতিযোগিতায় – নাগপুরে, এলাহাবাদে, লক্ষ্ণৌতে, কটকে, দিল্লীতে। সব জায়গায়ই সমাদৃত হয়ে “দিশারী” পুরস্কারে বা দর্শকের সমাদরে বা স্হানীয় পত্র- পত্রিকার প্রতিবেদনে।বাংলা নাটকের পীঠস্থান ক’লকাতায় নাটক মঞ্চস্থ করার বাসনা বোধহয় সব নাট্যগোষ্ঠীই থাকে, বিশেষতঃ যারা বাংলা নাটক করেন। আমাদেরও ছিল। সেই স্বপ্ন সাকার হোলো ২০০০ ও ২০০৪ সালে দু’ দুবার ক’লকাতার “অনীক” নাট্যগোষ্ঠীর আমন্ত্রণে তাঁদের ‘গঙ্গা-যমুনা আন্তর্জাতিক নাট্য মেলায়’ ক’লকাতার রবীন্দ্রসদন, গিরীশ মঞ্চ ও সল্টলেকের EZCC মঞ্চে। প্রথমবার সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকায় অভিনয়ের সুখ্যাতি ও দ্বিতীয়বার রবীন্দ্রসদনে ‘চেতনা’ নাট্যগোষ্ঠীর স্বনামধন্য শ্রী অরূণ মুখোপাধ্যায়ের হাত থেকে সম্মান প্রাপ্তি। দুটোই ছিল আশাতীত প্রাপ্তি। আবার ক’লকাতায় – এবার ২০১৯ সালে ‘ শৈলিক’ নাট্যগোষ্ঠীর আমন্ত্রণে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের মঞ্চে। আবারও দর্শকের সমাদর ও ভালোবাসা আমাদের প্রাপ্তি।
এর মধ্যে প্রতি বছর নিউ মুম্বাইতে বার্ষিক অনুষ্ঠান হয়েছে। বার্ষিক অনুষ্ঠানের সংখ্যাও ৩৪। দু’দফায় তিনবার ক’রে নাট্য মেলার আয়োজন করা হয়েছে। ২০০৩ থেকে প্রতি বছর বার্ষিক অনুষ্ঠানে সাধ্যমতো সামাজিক দায়িত্ব পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ দিশারী আর্থিক অনুদান দিয়েছে বিভিন্ন সংস্থাকে। সে তালিকা দীর্ঘ ও পাঠকদের জন্য ক্লান্তিকর হবে, তাই তার অবতারণা না করাই শ্রেয়। “দিশারী” র একটি franchise: Disharee Kuala lumpur chapter উদ্বোধন করা হয়েছে ২০১৭ সালে। পরপর দু’বছর ২৯১৭ আর ২০১৮ তে মুম্বাই থেকে team নিয়ে গিয়ে নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছে এবং দু’বারই কুয়ালালামপুরের “রামকৃষ্ণ মিশন” কে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছে। প্রথম বার বিশেষ অতিথি ছিলেন রামকৃষ্ণ মিশন এর প্রধান স্বামীজী আর দ্বিতীয় বার Malaysia র Indian High Commissioner.২০০৮ থেকে “দিশারী” র আরেকটি সাংস্কৃতিক দিক যুক্ত হয় নাটকের সাথে – নৃত্য। ব্যালে ধর্মী নৃত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অভিসার’, ‘নটীর পূজা’ অবলম্বনে শ্রীমতী, abstract dance form এ  ‘রক্তে আমার পূর্ব নারী’ ও ‘Elements’ ভূয়সী জনপ্রিয় হয় এবং কিছু  call shows  ও করা হয়।
এবার ছোট্টো করে বলি আমাদের শ্রুতি-নাটকের কথা। ১৯৮৮ সালে পূজোয় ক’লকাতার একটি নামকরা প্যান্ডেলের মঞ্চে শ্রী জগন্নাথ বসু ও শ্রীমতী ঊর্মিলা বসুর শ্রুতি- নাটক শুনে আমি আর শাশ্বতী অনুপ্রাণিত হই এবং মুম্বাই ফিরে শ্রুতি- নাটক শুরু করি ১৯৮৮ তেই। সে সময় শ্রুতি- নাটকের বই এখনকার মতো ঢালাও বই-বাজারে পাওয়া যেতো না আর এখনকার মতো যে কেউ বইও লিখতেন না। আমরা ওনাদের ক্যাসেট শুনে লিখে নিয়ে করতাম। পরে একবার ওনাদের পাইকপাড়ার বাড়িতে আড্ডা মারার সময়ে এ ব্যাপারটা ওনাদের বলাতে খুব হেসেছিলেন ওনারা। আসলে সব নাটকই শ্রুতি- নাটক নয়, ঠিক যেমন সব শ্রুতি নাটকই মঞ্চ-নাটক নয়। 

২) নিজেকে মূলতঃ একজন অভিনেতা না নাট্যশিল্পী, কি ভাবে দেখেন? 

মঞ্চে অভিনয় করি যখন, অভিনেতা-অভিনেত্রী তো বটেই। নাটক একটি performing arts সুতরাং নাট্যশিল্পী ও বটে। আসলে এই field টা তে তো evaluation টা qualitative – আমরা দু’জনে নাট্যকর্মী বললেই সবচেয়ে ভালো হবে।

৩) নাটক আপনার কাছে কী? বিনোদন? প্যাশন? না কি  অন্যতর কিছু ?

অবশ্যই passion. অন্যতর বললে – বেঁচে থাকার রসদ।

৪) মুম্বাইয়ে বসে বাংলা নাটক করতে গিয়ে কোন অসুবিধাগুলোকে সব থেকে বড় সমস্যা বলে মনে করেন?

প্রথম – সাধারণ দর্শক বিনোদন মূলক পরিবেশনা ভালোবাসেন।  বিষয়-ধর্মী নাটক যা ভাবায়, তার জন্য দর্শক তৈরী করতে হয়। নিউ মুম্বাইতে বিগত ৩৪ বছরে দিশারী সেটা করতে সমর্থ হয়েছে। এখন এখানে দিশারী’র একটা নিজস্ব দর্শকমণ্ডলী আছে। কিন্তু মুম্বাইতে কিছু কিছু নাট্য মেলায় দেখেছি দর্শকসংখ্যা নিতান্তই কম। দ্বিতীয়ত, মুম্বাইয়ে একটি নাটক মঞ্চস্থ করা খুবই আর্থিক চাপের ব্যাপার। প্রবেশ মূল্য ব্যয় করে স্হানীয় নাটক দেখায় দর্শকদের নিরাসক্তি। অথচ  ক’লকাতার কোনো নামী, অর্ধনামী নাট্যদলের পরিবেশনায় যত বেশী প্রবেশ মূল্য ততই আসন পূর্ণ। তৃতীয় – ওই দ্বিতীয়র ন্যাজা ধরেই বলি – মুম্বাইতে আমাদের সাংস্কৃতিক হীনমন্যতা। “আমরা আর কি? হুঁ হু বাওয়া এ হচ্ছে ক’লকেতার!!” এবং এই কারণেই ক’লকাতার কাছে দিল্লীর তুলনায় মুম্বাই-এর সাংস্কৃতিক জগৎ এখনও অপাংক্তেয়। এবং ওখানকার বেশ নামী, অর্ধনামী শিল্পীরা যাঁরা ক’লকাতায় খুবই নামমাত্র অর্থের বিনিময়ে অনুষ্ঠান করেন তাঁরাই মুম্বাইতে এলে ওরে বাবা!! ছোঁয়াই দায়। ছ্যাঁকা লাগে!

৫) আপনার নাট্যদলের উল্লেখযোগ্য প্রযোজনাগুলো কী?  দু একটি প্রিয় কাজ সম্বন্ধে একটু  বিস্তারিত বলুন।

এই রে! আমাদের কাছে তো আমাদের নাট্যদলের এখনও পর্যন্ত প্রযোজিত ৩২টি একাঙ্ক, ১২টি পূর্নাঙ্গ আর গোটা ৩০ শ্রুতি-নাটক সবই উল্লেখযোগ্য! কি করি! আচ্ছা বেশ, দেখি চেষ্টা করে কেটেছেঁটে কি দাঁড়ায়! সফোক্লিসের ‘আন্তিগোনে’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ প্রানের প্রহরী’, মনোজ মিত্রের ‘দর্পণে শরৎশশী’ ও ‘চাক ভাঙ্গা   , শম্ভু মিত্রের ‘ ‘কাঞ্চনরঙ্গ’, আগাথা ক্রিষ্টির ‘ ‘মাউসট্র্যাপ’, মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের ‘ রিং’, বাদল সরকারের ‘ শেষ নেই’, ‘সারারাত্তির’ ইত্যাদি ইত্যাদি এবং ইত্যাদি।এবার হোলো- প্রিয় কাজ। এটাও বেশ খটমট প্রশ্ন! যাই হোক, প্রথমে উল্লেখ করি ১৯৮৯ তে একটা একাঙ্ক নাটক শ্যামলতনু দাশগুপ্তের ‘চোরেদের লজ্জা হোলো’। এটা প্রিয় এইজন্য যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মুম্বাই-এর নাট্যদলের কোন একটি নাটক বার তিন-চারেকের বেশি মঞ্চস্থ করার সুযোগ হয়না। সে ক্ষেত্রে এই নাটকটি আমরা মুম্বাই ও সর্বভারতীয় স্তরে ২০০০ সাল পর্যন্ত ২০ বার মঞ্চস্থ করেছি। অবশ্য আরও কিছু নাটক অনেকবার মঞ্চস্থ করেছে দিশারী। যেমন-পণপ্রথার বিরুদ্ধে ‘সরমা’ ৭ বার, রহস্য নাটক ‘ গোপন সত্য’ ৬ বার ইত্যাদি। আরেকটি প্রিয় কাজ আমাদের শ্রুতি নাটকের কথা আগেই বলেছি। ১৯৯৯ সালে প্রথমবার একটি শ্রুতি-নাটক সমীর দাশগুপ্তের ‘যাদুঘর’ মঞ্চস্থ করি শ্রুতি-দৃশ্য-কল্প নাটকের মাধ্যমে অনেকটা লাল কেল্লার light &sound এর মতো। কলকাতার  museum এ যে মমি টি রয়েছে, সেটি ঘিরে এক কল্প কাহিনী। এমনকি এই দুরূহ প্রযোজনা টিও দিশারী পুণাসমেত চারবার মঞ্চস্থ করেছে। ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল। এখনও কিছু দর্শক অনুরোধ করেন আবার মঞ্চস্থ করতে। কিন্তু যথেষ্ট খরচসাধ্য বলে করা হয়ে ওঠে না। তবে ইচ্ছে আছে।
আরেকটি প্রিয় কাজ। – সফোক্লিস এর ‘ আন্তিগোনে’ নাটক ২০১০ সালে। অপেশাদারি নাট্যদল সাধারণতঃ এই নাটকটি মঞ্চস্থ করেন না বিভিন্ন কারণে। যেমন – জটিল নাটক, বেশভূষা, রূপসজ্জা বেশ খরচ সাপেক্ষ ইত্যাদি। মনে পড়ে encyclopedia আর google ঘেঁটে বেশভূষা design করে ঘরে দর্জিকে দিয়ে রীতিমতো trial দিয়ে ১৩  জন অভিনেতা অভিনেত্রীর বেশভূষা তৈরী করা হয়েছিল।আরেকটি প্রিয় কাজ। – মনোজ মিত্রের ‘ দর্পণে শরৎশশী’ আর ‘ চাক ভাঙা মধু’। এই দুটি নাটক ও অপেশাদারি নাট্যদল সাধারণতঃ মঞ্চস্থ করেন না। ‘দর্পণে শরৎশশী’ র নির্দেশনা শাশ্বতীর। ২১ জন অভিনেতা-অভিনেত্রী নিয়ে সেকালের কলকাতার একটি চালচিত্র এই নাটক। দুবার মঞ্চস্থ হয়েছে। দ্বিতীয় বার পু.লা.দেশপান্ডে প্রেক্ষাগৃহে প্রভাদেবীতে। 
আরেকটি বড়ই প্রিয় কাজের কথা বলে এই প্রসঙ্গে ইতি টানবো। -‘রক্তকরবী’। এর প্রযোজক শাশ্বতী। যদিও এই অডিও ডিভিডি-তে বেতার নাটকের মতো চরিত্র কন্ঠদানে দিশারী র সকলেই রয়েছে। শুধু শান্তিনিকেতন থেকে শ্রদ্ধেয় শ্রী শম্ভু মিত্রের ছাত্র শ্রী পুলক রায় আছেন একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রায়নে। শাশ্বতীর আর আমার মনে হয়েছিল, যদিও রক্তকরবী নাটকের নির্যাস নিয়ে, তাকে ভেঙে চুরে অনেক স্বনামধন্য মানুষের কাজ রয়েছে, কিন্তু বোধহয় মূল ‘রক্তকরবী’ নাটকটি অডিও ক্যাসেটে ‘বহুরূপী’র প্রযোজনায় শম্ভু মিত্র- তৃপ্তি মিত্রর পরে আর নেই। ১৯২৩-২৪ এ শিলং-এ লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই নাটকটি এতটাই সর্বকালীন, আমাদের মনে হয়েছিল যে মূল অখন্ডিত নাটকটি আবার অন্ততঃ অডিওতে ফিরে আসুক। আর সেই কারণেই, ২০১৯ এ “রক্তকরবী” র প্রযোজনা ও প্রকাশ অডিও ডিভিডি-তে মুম্বাইতে, পুণেতে আর ক’লকাতার অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে।

৬) আপনার নাট্যদল কি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছে? পেলে, কী ?

কি জানি! যখন যেখানে নাটক বা শ্রুতি- নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে, দর্শক-শ্রোতাদের আন্তরিক করতালি আর অভিবাদনকেই স্বীকৃতি হিসেবে নিয়েছি। ঐটাই পাথেয় করে আজ ৩৬ বছর হোলো পথ চলছি। নাটকের পুরস্কার, পত্রিকায় সুখ্যাতি, ‘দেশ’ সাপ্তাহিক পত্রিকায় অভিনয়ের সুখ্যাতি, বিশ্ববাংলা নাট্যকোষ’-এ দিশারী-র উদ্ধৃতি ও সম্মাননা – এ সবই আমাদের চলার পথের অমূল্য স্বীকৃতি। জানি না প্রশ্নের সঠিক মূল্যায়ণ করতে পারলাম কিনা।

৭) নাটক নিয়ে কোনো স্বপ্ন দেখেন? জানতে চাই কী সেই স্বপ্ন।

হ্যাঁ দেখি তো! স্বপ্ন দেখি – নাটক রক্তবীজের মতো হয়ে গেছে! হিন্দু ধর্মগ্রন্থ দেবী ভাগবত পুরাণ আর মার্কেন্ডেয় পুরাণে বর্ণিত রক্তবীজ মহাদেবের আশীর্বাদ পেয়েছিল – তার নিজের শোণিত ধরনীতলে পড়লে প্রতিটি শোণিত বিন্দু থেকে এক একটি রক্তবীজ সৃষ্ট হবে। উপমাটি অসুরের সাথে হলেও স্বপ্ন দেখি – প্রতিটি নাটক লেখা ও মঞ্চায়ণের সাথে জন্ম নিচ্ছে আরো আরো নাটক, মঞ্চস্থ হচ্ছে আরো নাটক। নতুন প্রজন্ম হাত ধরেছে নাটকের অন্ততঃ প্রবাসে এই মুম্বাইতে। নতুন প্রজন্মকে দোষ দিই না। তারা বড় ব্যস্ত। তবে তার মধ্যেও হিন্দী, ইংরেজি বা তাদের মাতৃভাষায় নতুন প্রজন্ম নাটক করছে। স্বপ্ন দেখি বাংলাভাষার এই অসীম ভান্ডারে যদি আমাদের উত্তরসূরীরা উৎসাহিত হয় এবং তারা মঞ্চায়নের সময় না পেলেও যদি অন্ততঃ বাংলা নাটক দেখে, পড়ে, ভাবে। বাংলা নাটক যেন বেঁচে থাকে – অন্ততঃ প্রবাসে এই মুম্বাইতে।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...