লাল নীল গল্প: সঙ্গীতা দাশগুপ্ত রায়
সুপ্রিয় লাহিড়ি

   
আমার মনে পড়েনা শেষ কবে, একটা বই শেষ করেই আবার পড়তে শুরু করেছি| তাও আবার ছোটদের জন্যে লেখা বই, তথাকথিত শিশু বা কিশোর সাহিত্য! সম্প্রতি ‘লাল নীল গল্প’ পড়তে গিয়ে তাই করলাম| একবার শেষ করেই আবার ধরলাম| ১৪৩ পৃষ্ঠার ছোট্ট বই, কোন অসুবিধে নেই| জিজ্ঞাসা করবেন, খুব ভালো লাগলেও এমন কেউ করে নাকি? কিছুদিন বাদে আবার বের করে পড়লেই তো হতো| তা হয়ত হতো, কিন্তু ছোটরা কি করে দেখেছেন? যে গল্পটা ওদের ভালো লাগে, সেটাই বারবার পড়তে চায়, শুনতে চায়| কি জানি, লাল নীল গল্প পড়তে পড়তে হয়তো একটু ছোটই হয়ে গিয়েছিলাম!একটু অংশ তুলে দিই|
“চোরবাজার কিছু চোরাই জিনিষের বাজার নয়| আসলে পাহাড়ের কোলে এমন একটা জায়গায় বাজারটা বসে, যে পাহাড়ে আসা পর্যটকেরা এখানে পৌঁছতে পারেনা| রাস্তা থেকে নেমে কিছুটা পায়ে চলা পথে হেঁটে পাথর টপকে জল ডিঙিয়ে গাছের ঝুরি ধরে হেঁটে হেঁটে এখানে আসতে হয়|লাটু জগাইকে (পোষা বনবেড়াল) কাঁধে বসিয়ে ঝুরি ধরে ঝুলে ঝুলে জল পেরোলো| বিল্টু জলে পা দিয়ে খানিক জলের ঘূর্ণি করলো, তারপর দুজনে হরিপদ গুণিনের কাছে পৌঁছল|  হরিপদ তো লাটুকে দেখেই তড়বড় করে এগিয়ে এলো, ‘একি আপনি?’  লাটু চমকে সরতে যাচ্ছিলো| ফলে জগাই কাঁধ থেকে মাটিতে পড়ল ঠাস করে| পরেই এক দৌড়ে সোজা বাইরে| বিল্টু আর লাটু কোনরকমে তাকে খুঁজে ধরে পাঁজাকোলা করে যতক্ষণে আবার ভেতরে নিয়ে গেছে ততক্ষণে হরিপদ দুটো মাটির ভাঁড়ে গুড়ের সরবত আর সুজির বিস্কুট সাজিয়ে বসে আছে|ওরা ঢুকতেই হরিপদ ঝপ করে নেপালি দারোয়ানের মত অর্ধেক কোমর ঝুঁকিয়ে সেলাম করলো| তারপর অর বিদঘুটে নোংরা চামচিকের গন্ধওয়ালা বিছানার নীচ থেকে একটা গোল মোড়া বার করে ঝেড়েঝুড়ে লাটুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘বসেন বড়কত্তা| চেহারাটা এমন ছোট দেখছে কেন?”সই সঙ্গীতা এই  জগৎটা সৃষ্টি করেছেন। সেখানে ছোটদের গরম, পূজো আর শীতের লম্বা লম্বা ছুটি থাকে। আর সেসব ছুটিতে তারা বেড়াতে যায়। নাঃ শিমলা, কাশ্মীর বা ইউরোপ আমেরিকা নয়, দুবরাজপুরে বড়দাদুর বাড়ি, বা নাম না বলা গ্রামের কোন ছোট্ট স্টেশনে জেঠুর বাড়ি। সেসব ছুটিতে তাদের নাচের ক্লাস, গানের ক্লাস, সুইমিং ক্লাসে, যেতে হয়না- তারা বাড়ির পেছনের গাছে ফিঙে পাখি কেমন করে পোকা ধরে, হাঁড়িচাচা কেমন করে কলতলায় রেখে যাওয়া বাসন ঠোকরায়, কাঠবিড়ালি কেমন করে সরু গাছের ডালে একবারও না পড়ে গিয়ে দৌড়োয়, এসব শেখে, রান্নার মাসির বাচ্চা মেয়েটার সঙ্গে ঝোপজঙ্গলে ঘুরে ঘুরে মৌমাছি, প্রজাপতি কি কি করে তাও শেখে। সে জগতে, মার অনেক কাজ থাকে বলে, জেঠিমা কোলে বসিয়ে খাইয়ে দেন,  চানুর শহুরে রোগাপটকা চেহারা দেখে গ্রামের বাড়িতে থাকা বড়জেঠু তার খাওয়া দাওয়ার এমন লিস্টি বানান, শুনেই বুক কাঁপতে থাকে। আবার, ছোটমামু যদি ফ্যাক্টরি থেকে চাকরি চলে যাওয়া দিবাকর কাকাকে অন্যায়ভাবে বড়মামার হীরের আংটি চুরির জন্যে দোষী ঠাওরান তাহলে ছোট হলেও মোহর ছোটমামুকে ছেড়ে কথা বলেনা|      সেখানে মোহর, ইন্দু, টাপুর, বিন্তি, মানিক, গেনু, নুটু, বুলিদের রোজ রোজই দারুণ মজার মজার সব খাওয়া হয়। না না পিজ্জা, রোল, বার্গার এসব হাবিজাবি নয়। সেসব খাবেই বা কেন ওরা? এখানে তো মা কাকিমা, জেঠিমা, ঠাকুমা, মামীমারা চোখের নিমেষে, নারকেল দেওয়া মুগের ডাল, পোস্তদানা ছড়ানো আলুপটল ভাজা, মাংসের ঝোল, ছানার পাতুড়ি, প্যারাকিয়া, ক্ষীরের গজা, নিমকি, ছোট ছোট তিনকোনা পরোটা, আলুকপি ভাজা, মালপোয়া, এসব বানিয়ে দেন।
শিশু কিশোরদের এই গল্পে কিন্তু দত্যি দানো, রাক্ষস, খোক্কসরা নেই। পরিণত বয়েসে সেসব পড়লে আর মনে দাগ কাটবেনা- মনে হয় আজকের দিনের শিশু কিশোরদের মনেও কাটবেনা। তারা জানে, এসব নেহাতই গালগল্প। আমি বলছি, এমন শৈশব, কৈশোরের কথা যা বাস্তব কিন্তু লাল নীল রঙে উজ্জ্বল। যেখানে গাছপালা, ঝোপঝাড় আছে, পাখপাখালি, জীবজন্তুরা আছে, খেলাধূলো আছে, হাসি, ঠাট্টা মজা আছে, ছোটদের ঝগড়াঝাঁটি আছে,  বড়দের আদর ভালোবাসা আছে,  আবার হোমটাস্কও আছে, তাঁদের শাসনও আছে। প্রতিটি শিশুই তো এইসব অনুভূতির মধ্যে দিয়ে যায়, বেড়ে ওঠে। 
দেখে ভালো লাগে, রোমাঞ্চের প্রয়োজনে সই সঙ্গীতা আরো অনেক লব্ধপ্রতিষ্ঠ লেখকদের রাস্তায় হাঁটেননি- রাজ্যের খুনে, স্মাগলার, আন্তর্জাতিক অপরাধী, বন্দুক বোমা, পিস্তলের আমদানী করেননি।তা বলে রহস্য রোমাঞ্চ কি কম মানিক গেনু, মোহর, বুটুদের জগতে? সেখানে দুধসাদা লক্ষী পেঁচা নিশুতি রাতে নিঃশব্দে মোহরদের চিলেকোঠায় উড়ে আসে, পাথর খুঁজতে খুঁজতে ছোটমামী দানো গুহায় ঢুকে পড়েন, পাঁচমুড়ির ফিঙেপাখির ছা খুকু থ্রিল খুঁজতে কলকাতা শহরে গিয়ে পড়ে, বর্ষাভাসা পুকুর সাঁতরে বুনো চলে যায় পরি দিদির থানে, লাটুর একশো আঠের বছরের দাদামশাই চারপেয়ে জানোয়ার ধরে মানুষ বানানোর গোপন এক্সপেরিমেন্ট করেন। তবে? আলাদা করে বলতে হবে যে, লেখিকা ছোটদের এই জগতে,  আমাদের কাজের লোকেরা যাঁরা, প্রত্যেক পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ-  ঠাকুর, চাকর, মালী, রান্নার মাসীদের এঁকেছেন এক অদ্ভুত দক্ষতায়। তাদের কাউকেই মাইনে করা কাজের লোক বলে মনে হয়না- তারা সবাই দাদা, কাকা, মাসী বা দিদির মতোই ব্যবহার করে আর বাড়ির বড়োরাও তাদের তেমন ভাবেই ট্রিট করেন। অনুভূতিপ্রবণ, বাড়তে থাকা মনগুলোর জন্যে এ একরকম শিক্ষাও বটে। 

আপনি উপেন রায়চৌধুরী পড়েছেন? অবন ঠাকুর? লীলা মজুমদার? সত্যজিৎ রায় তো নিশ্চয়ই পড়েছেন। পড়ে থাকলে খুব ভালো আর না পড়ে থাকলেও সই সঙ্গীতা দাশগুপ্ত রায়ের ‘লাল নীল গল্প’ পড়ে তেমনই আনন্দ পাবেন।এই চারজনের কথা মাথায় এলো এইজন্য যে ছোটদের জন্যে, ছোটদের মত করে লেখাটা মহা শক্ত কাজ। আবার সেই ছোটদের জন্যে লেখা যখন বড়দেরও এক নিমেষে তাদের ছোটবেলায় এমন পাঠান পাঠায়, যে সে বড় বেচারার সেখান থেকে বেরোতেই ইচ্ছে করেনা- তখনই সে লেখা সার্থক শিশু- কিশোর সাহিত্য হয়ে ওঠে। ওই ওপরে লেখা চারজনই কিন্তু সেটা পারতেন। আর বহুদিন বাদে, এক মন বিস্ময়, মুগ্ধতা আর একটু একটু মন-খারাপ নিয়ে দেখলাম, সই সঙ্গীতা দাশগুপ্ত রায়ের ‘লাল নীল গল্প’ও ঠিক সেটাই পেরেছে। 
বারোটা গল্পের প্রত্যেকটাই সুন্দর, তবু তার মধ্যেও অনিন্দ্যসুন্দর ‘পাঁচমুড়ির খুকু’, ‘রাজকন্যা’ আর ম্যাজিকের খোঁজে’।মজার ব্যাপার হলো, বারোটা গল্পই এক পর্দায় বাঁধা কিন্তু প্রতিটির সুর একে অন্যের থেকে একদম আলাদা।বইটির ছাপা সুন্দর, ছাপার ভুল প্রায় নেই বললেই চলে আর প্রত্যেক গল্পের সঙ্গে সাদা কালো আঁচড়ে আঁকা ছবিগুলো এ বইয়ের অমূল্য সম্পদ। রঙিন প্রচ্ছদটিও অপূর্ব- নিমেষেই লাল নীল গল্পের মুডটা চারিয়ে দেয় পাঠকের মনে| এর জন্যে প্রকাশক, মুদ্রক ও শিল্পীকে বাহবা দিতে হয়।
কোন জিনিষেরই সব কিছু ভালো হয়না। আর সেগুলোর উল্লেখ না করলে পাঠ প্রতিক্রিয়াও সম্পূর্ণ হয়না। এ বইয়ের একমাত্র খুঁত যা আমার চোখে পড়েছে তা হলো- গল্প মাত্র বারোটাই। ছেলেবেলাটা চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেই মিলিয়ে গেলো। তবুও অল্প সময়ের জন্যে হলেও ছেলেবেলাটা ফিরিয়ে দেবার জন্যে সই সঙ্গীতাকে অনেক ধন্যবাদ| সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর ওপারে না থাকলে একটা ফাইভ স্টার কিম্বা আমার গুড় কটকটির থেকে ভেঙে একটু দিয়েই ফেলতাম হয়তো। 

( সুচেতনা প্রকাশন| বইমেলা 2022 )

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...