মধুচন্দ্রিমা
সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়


“এই, শোনো, জানলাটা বন্ধ করে দাও না, প্লিজ!” অনুনয় করেছিল মিতুল। নবারুণ পাত্তা দেয়নি। মিতুলকে আপাদমস্তক বিবস্ত্র করতে করতে ঠাট্টার গলায় বলেছিল, “ধ্যুত, ছাড়ো তো! রাত দুপুরে এই বন-বাদাড়ে কে আর তোমার সোনা-অঙ্গ দেখার জন্যে জানলায় চোখ পেতে বসে আছে?”

কথাটা একেবারে মিথ্যে নয়। জায়গাটা যদিও মাডিকেরি থেকে খুব দূরে নয়, কিন্তু নিবিড় জঙ্গলের মধ্যে। আসার দিন কোলকাতা থেকে সকালের ফ্লাইট ধরে যখন ব্যাঙ্গালোরে নেমেছিল, ঘুণাক্ষরে আন্দাজ করতে পারেনি সন্ধে নাগাদ এই ঈশ্বর-পরিত্যক্ত বাংলোটায় পৌঁছোবে। ঝকঝকে দিন, তকতকে শহর, এয়ারপোর্টের বাইরে অনলাইনে ভাড়া করা গাড়ি, এসব ব্যবস্থাপনায় নবারুণের সাধারণত কোনও ত্রুটি থাকে না। শোলের রামগড় পেরিয়ে সোজা মাইসোর। লাঞ্চ সেরে কুর্গ পৌঁছোতে আরও ঘন্টা আড়াই। মাডিকেরিতে নেমে চায়ে-নাস্তা করে রওনা দিতে-দিতে আলো পড়ে এল, রিমঝিম বৃষ্টি নামল। পাহাড়ে সন্ধে নামে ঝুপ করে, অগ্রিম সতর্কবার্তা না দিয়েই। হেড লাইটের আলোয় ভাঙাচোরা সাইনবোর্ডটা দেখে ড্রাইভার নাক কুঁচকেছিল। মূল রাস্তার থেকে তিরিশ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে তেরচা হয়ে পড়ে থাকা খোয়া-ওঠা চড়াই পথটাতে গাড়ি নিতে দ্বিধা করছিল। এই বন-বাংলোয় মধুচন্দ্রিমা যাপনের আইডিয়াটা নবারুণের। মিতুলেরও সায় ছিল। ভেবেছিল নির্জনতার মধ্যে দু’জনের দু’জনকে খুঁজে নিতে সুবিধে হবে। নতুন সম্পর্কটাকেও। বিশেষ করে গুনতিতে যখন দু’জনেরই দ্বিতীয় মধুচন্দ্রিমা। তাই বলে ঠিকানাটা যে এই ধ্যাদ্ধেড়ে হাতি-চলা গোবিন্দপুরের হবে কল্পনাও করতে পারেনি।

বাংলোয় পৌঁছোনোর কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত গাড়ির ড্রাইভার আধা-হিন্দি-আধা-কন্নড়ে এই অঞ্চলের হাতিদের সঙ্গে ছোটবড় মোলাকাতের রোমাঞ্চকর কিস্যা শোনাচ্ছিল। বলছিল, এখানকার হাতিদের পারতপক্ষে লোকালয়-বোধ নেই। মাঝেমাঝেই হুট-হাট করে গেরস্ত বাড়ির খেত-খামার, দালান-দোরগোড়ায় এসে হাজির হয়। এই পাহাড় জঙ্গলের এক সময় ওরাই একছত্র অধিপতি ছিল, ভুলতে পারে না। কথায় বলে না, হাতির মতো স্মৃতিশক্তি… ওদের চলাচলের রাস্তায় মানুষ গ্রাম পত্তন করেছে, কফি, এলাচ, মরীচের চাষ করেছে, ওদের আর কী দোষ! একবার নাকি এই রাস্তাতেই রাত্তিরবেলা, অন্ধকারের থেকেও ভয়ঙ্কর একটা দাঁতাল গাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। সঙ্গে প্যাসেঞ্জার ছিল। তাড়া খেয়ে আড়াই-তিন কিলোমিটার রিভার্স গীয়ারে গাড়ি চালিয়ে শেষ অবধি নিষ্কৃতি পায়। তারপর সেই হাতিটা রণে ভঙ্গ দিয়েছিল, নাকি ড্রাইভারই কোনও কায়দা করে তাকে ফাঁকি দিয়েছিল, শোনা হয়নি। তার আগেই একটা কফি-বাগানকে পাশ কাটিয়ে, বন-বাংলোর ফেন্সের সামনে এসে গাড়ি দাঁড়িয়েছিল।

নবারুণ গাড়ি থেকে নেমে লোহার দরজায় ঠেলা দিতে গিয়েও, থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। টিমটিমে আলোয় নজর করে দেখেছিল, ফেন্সের গায়ে ঝোলানো একটা জং-ধরা লোহার প্লেট, তার ওপর হলুদ ত্রিকোণের মধ্যে আঁকা নীলচে বিদ্যুতের চেতাবনি। ফেন্সটা সম্ভবত ইলেকট্রিফায়েড, লোহার গেটটায় হাত দিলে শক লাগার সম্ভাবনা। চৌকিদারকে ফোন করেছিল নবারুণ। মিনিট পাঁচেক পরে একটা আধবুড়ো নিরীহ গোছের লোক টর্চ দোলাতে দোলাতে এসে দাঁড়িয়েছিল সামনে। জিজ্ঞেস করতে মাথা নাড়িয়েছিল, বলেছিল, ভালই করেছো সাহেব, গেটে হাত না দিয়ে। হাতির দলের দামালপনা ঠেকাতে বাংলোর পুরো চৌহদ্দিটাই ইলেকট্রিক ফেন্স দিয়ে ঘেরা। তাও মাঝ রাত্তিরে এসে মাতন করে, মাথা দিয়ে ঠেলা মারে। এখন অবশ্য ভয় নেই, তোমাদের নিতে আসার সময় ইলেকট্রিকের স্যুইচ অফ করে দিয়ে এসেছি।

বাংলো-সংলগ্ন এলাকাটা খুব ছোট নয়। গেট থেকে বারান্দায় ওঠার সিঁড়িটাই প্রায় আধ কিলোমিটার। বুকিং করার সময় নেটে পড়েছিল, পিছনের দরজা খুলে মিনিট পাঁচ-সাত হেঁটে গেলে গাছপালার ফাঁক দিয়ে দূরে ব্যাক ওয়াটারও দেখা যায়। একটা কফি প্ল্যান্টেশানও নাকি আছে বাংলোর লাগোয়া জমিতে। চৌকিদারের আস্তানাটা বাংলোর পাশেই। সেই সপরিবারে বাংলোর যাবতীয় কাজকর্ম দেখাশোনা করে, জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ পর্যন্ত… বাংলোর হাতার মধ্যে বেড়ে ওঠা আগাছা ওপড়ানো থেকে শুরু করে ভেতরের সাফ-সাফাই, অতিথি অভ্যাগতদের পরিচর্যা, রান্নাবান্না… কাজ কম নয়, চৌকিদার নিজেই জানিয়েছিল। তাছাড়া আর উপায় কী? আশেপাশে তেমন লোকবসতি, দোকানপাট নেই। সব থেকে কাছের গ্রামটাও পাঁচ সাত কিলোমিটার দূরে। আনাজপাতি সেখান থেকেই সংগ্রহ করতে হয়। আমিষের মধ্যে চিকেন, তাও একদিন আগে বললে ব্যবস্থা হতে পারে। নইলে শুদ্ধ, সাত্বিক শাকাহার, ইডলি-ধোসা-সম্বরম।

ওদের নামিয়ে দিয়ে সেই রাত্তিরেই গাড়িটা মাডিকেরি ফিরে গিয়েছিল। ড্রাইভার বলেছিল টুকটাক মেরামত করানোর দরকার। পরের দিন সকাল-সকাল চলে আসবে। ড্রাইভারের কান বাঁচিয়ে নবারুণ ফুট কেটেছিল, সারাদিন ড্রাইভ করে বেচারার আলজিভ পর্যন্ত শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে। মালের ঠেক খুঁজে না পেলে আজ রাত্তিরেই আত্মহত্যা করবে। ক্লান্তি ওদের চোখেও লেগে ছিল। ডিনারের পর নবারুণ সামান্য খুনসুটি করার চেষ্টা করেছিল। মিতুল বলেছিল, আজ নয় গো, আজ খুব টায়ার্ড… নবারুণ মেনে নিয়েছিল। যতই মধুচন্দ্রিমা হোক দুজনের কেউই আর কচি খোকা খুকু নেই। পরের দিন সকালে ড্রাইভার ফোন করে জানিয়েছিল, ছোটখাটো নয়, মেরামতিটা বেশ বড়সড়োই। সময় লাগবে, এসব অঞ্চলে স্পেয়ার দুর্লভ। আজ হলে ভাল, না হলে সেই কালকে…। সাতদিন ছুটির একটা দিনের ঘোরাঘুরি বাতিল। মিতুল সামান্য বিমর্ষ হয়েছিল। নবারুণ অবশ্য পড়ে পাওয়া সময়টার সদব্যবহার করতে উদ্যোগী হয়েছিল। মিতুল চোখ রাঙিয়েছিল, “এখন নয়, রাত্তিরে…”“না, তবু…” মিতুল সেদিন রাতে একগুঁয়ে বাচ্চা মেয়ের মতো জেদ খেটেছিল, “বন্ধ করে দাও জানলাটা। আমার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে।”
“আচ্ছা, আচ্ছা…” নবারুণ হাল ছেড়ে উঠে গিয়ে জানলাটা ভেজিয়ে দিয়ে এসেছিল, বলেছিল, “এবার শান্তি?” বলেই বুকের ওপর হামলে পড়েছিল।

তখনও বাংলোটা তেমন করে চেনা হয়নি। আনাচ-কানাচে রহস্য লেগে ছিল। কোনও নতুন জায়গার গেলে একটা গা ছমছমে ভাব থাকেই। তার ওপর এই বন-বাংলোটায় পা দেবার পর থেকেই মিতুলের কেন জানি মনে হচ্ছিল দুটো অদৃশ্য চোখ সর্বদা তার ওপর নজর রাখছে। ঘোরে, ফেরে, যেখানেই যায়, চোখ দুটো পিঠে আটকে থাকে। ঘাড়ের কাছে, চটচটে আঠার মতো। হাতের পাতার ঘষা দিলেও যায় না। অথচ পিছন ফিরলে, কেউ নেই। রাত্তিরে ওই খোলা জানলার পাল্লার পাশে দাঁড়িয়ে কে যেন উঁকি দিচ্ছিল। অথচ ঘরের লাইট নিভিয়ে বাইরে তাকালে মনে হয় যেন অন্ধ হয়ে গেছে। এক বিন্দু আলো নেই কোথাও। শুধু ঝিঁঝিঁর ডাক আর বৃষ্টির ফিসফিস শব্দ। এ সময় কার দায় পড়েছে জানলা ধরে দাঁড়াবার!

সকালেও যেমন, চান করে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়াতেই একটা ছায়া চট করে সরে গিয়েছিল। দরজার কাছে গিয়ে কাউকে দেখতে পায়নি। অন্য ঘরগুলোতেও খুঁজেছিল। আড়াইখানা মোটে ঘর, বেডরুম, লিভিং-কাম-ডাইনিং আর একটা স্টোরেজ মতন। কিচেনটা টানা বারান্দার একপ্রান্তে, লুকোবার জায়গাই বা কোথায়? কারো পায়ের শব্দ পেল কি? নাকি পুরোটাই ওর মনের ভুল? একবার সন্দেহ হয়েছিল, বাংলোয় ভূত-টুত নেই তো! বিকেলবেলা চা খেতে খেতে নবারুণকে বলেও ছিল সে কথা। হো-হো করে হেসে উঠেছিল নবারুণ। মিতুল রাগ দেখিয়েছিল, কপট রাগ, নবারুণ রাগ ভাঙাবার অজুহাত পেয়েছিল। কিন্তু সমস্যাটার আদৌ সমাধান হয়নি।

এখন অবশ্য পরিস্থিতি বদলে গেছে, মিতুল জানে ওই চোখ দুটোর মালিকিন কে। নবারুণও সম্ভবত।
সাতদিনের ছুটি কাটাতে এসে সাঁইতিরিশ-দিনের বসবাস হয়ে গেলে যা হয়। আর ভাল লাগছে না। বিরক্ত লাগছে। লুডো আর তাস খেলে-খেলে হাতে ব্যথা হয়ে গেছে। এই নবারুণ, এসো না! একটা অন্য খেলা খেলি, কানা মাছি ভোঁ-ভোঁ, যাকে পাবি তাকে ছোঁ… নবারুণ, নবারুণ তুমি কোথায়? এখন মিতুলের চোখে কালো কাপড় বেঁধে দিলেও সে টেবিল চেয়ারে ধাক্কা না খেয়ে এ-ঘর ও-ঘর করতে পারবে। অনায়াসে বলে দিতে পারবে বারান্দার সিঁড়ির কটা ধাপ, রেলিঙের জাফরির প্যাটার্ন… ক’পা হেঁটে গেলে লনে রোজউড গাছের নিচে পাথরের বেঞ্চটায় গিয়ে ধুপ করে বসে পড়া যায়। এমনকি চৌকিদারের বাপ-চোদ্দপুরুষের বসত-বেত্তান্তও তার মুখস্ত হয়ে গেছে। সে জেনে গেছে চৌকিদারের বৌ এক কানে কালা, চৌকিদারের চড় খেয়ে তার বাঁ-কানের পর্দা ফেটে যায় বছর দশেক আগে, পাল্‌স পোলিও খাওয়ানো সত্ত্বেও চৌকিদারের ছোট মেয়েটার এক পায়ে পোলিও, লাঠি নিয়ে পা টেনে টেনে চলে আর সাপের মতো হিলহিলে চেহারার বড় মেয়েটাকে তার স্বামী ঘরে নেয় না। না জানলেই কি পরিত্রাণ ছিল?


বারান্দায় বেতের দোলনা চেয়ারে বসে মিতুল মেয়েকে ফোন করছিল। তুলতুলিকে সাতদিনের জন্য মায়ের কাছে ছেড়ে রেখে এসেছিল। দিদানের কাছে ভালই থাকে তুলতুলি। স্কুলটাও কাছে, অসুবিধে নেই, মা-ই ছেড়ে আসত, নিয়ে আসত। অবশ্য স্কুল এখন অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ। মাস পেরিয়ে গেল, ঘরে বসে বসে মেয়েটা অস্থির হয়ে পড়ছে। মেয়েটার মুখটা ক’দিন ধরে খুব মনে পড়ছে। কবে ফিরবে, কবে আবার মেয়েটাকে দেখতে পাবে, কে জানে? তুলতুলি জিজ্ঞেস করছিল, “তুমি ভাল আছ তো মা? আঙ্কেল কেমন আছে?”

মিতুল ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল নবারুণ লিভিংরুমের টেলিভিশানের পর্দায় চোখ আটকে বসে আছে। সাকুল্যে গোটা আট-দশ কেব্‌ল টিভির চ্যানেল ধরে, তার মধ্যে একমাত্র দূরদর্শন ছাড়া বাকি সব লোকাল, কন্নড় ভাষায়। নবারুণকে এখনও আঙ্কেল বলে ডাকে তুলতুলি। অনেকবার বলেও বাবা ডাকটা রপ্ত করাতে পারেনি। ওই জায়গাটা তুলতুলি অন্য কাউকে দিতে চায় না বোধ হয়, এমনকি সায়ন্তন পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবার পরেও। নবারুণের ব্যাপারটা অন্য। ওর বৌ মানসিক অবসাদে ভুগছিল অনেকদিন ধরে। অ্যাসাইলামেও ভর্তি ছিল বেশ কয়েকবার। বছর তিনেক আগে আইন মেনে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।


মেয়েকে বলল, “ঠিক আছে… ঠিকই আছে। তুই কেমন আছিস? খাওয়া-দাওয়া করছিস ঠিক মতো? বায়না করছিস না তো? লক্ষ্মী হয়ে থাকিস, দিদানকে জ্বালাস না।”
তুলতুলি বলল, “ধ্যুর! কী যে বলো! দিদান তো আমার বন্ধু, রোজ দিদানের পাশে শুয়ে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমোই,” একটু থেমে জিজ্ঞেস করল, “তোমরা কবে ফিরবে মা?”
মিতুল একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, “জানি না রে, কবে যে এই লকডাউন উঠবে, ফ্লাইট চালু হবে, নিদেন পক্ষে ট্রেন…”
তুলতুলি বলল, “গাড়ি করে চলে এসো।”

সে চেষ্টাও যে নবারুণ করেনি তা নয়। তারও অনেক হ্যাপা। ইন্টারস্টেট পারমিটের জন্য আবেদন করে বসে আছে প্রায় কুড়ি-পঁচিশ দিন হয়ে গেল। কতৃপক্ষের কোনও উচ্চবাচ্য নেই। সস্তা হবে বলে তিন মাস আগে থেকে নবারুণ আসা-যাওয়ার টিকিট কেটে রেখেছিল। কোলকাতা থেকে বেরোনোর আগেই অনিশ্চয়তার ছায়া দীর্ঘ হচ্ছিল। বিয়েটা হয়েছিল নিতান্তই সই-সাবুদ করে, কোনও অনুষ্ঠান করেনি ওরা, কিছুটা সঙ্কোচে, কিছুটা অনাবশ্যক ভেবে। বিয়ের দিনটাই খালি নবারুণ ছুটি নিয়েছিল, পরের দিন থেকে অফিসে ইয়ার-এন্ডিঙের চাপ সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। মিতুলও স্কুল, ক্লাস টেস্টের খাতা দেখা নিয়ে নাজেহাল ছিল। বিয়ের আগে অবরে-সবরে চটজলদি দু’জনে মিলিত হয়নি এমন নয়, বিয়ের পরেও তুলতুলি ঘুমিয়ে পড়লে, সুযোগ খুঁজে, দু’-চারবার, নেহাতই জৈব প্রয়োজনে… তবে পরস্পরের শরীরের ভৌগোলিক বৈচিত্র আবিষ্কারের উত্তেজনাটা দু’জনেই এই ছুটিটার জন্য তুলে রেখেছিল।

আসার আগে দোনামোনা একটা ছিলই, কিন্তু ছুটিটা একেবারে বাতিল করে দেবার কথা ভাবেনি। ভেবেছিল যা হয় দেখা যাবে। ইন্টারন্যাশানাল ফ্লাইট বন্ধ হলেও ডোমেস্টিক ফ্লাইট নিশ্চয়ই চালু থাকবে। এইভাবে একটা গোটা দেশ অন্তরীণ হয়ে যাবে, যানবাহনের সমস্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। গোদের ওপর বিষফোঁড়া ওদের গাড়িটা। দু’-তিন দিন আশকথা পাশকতা বলার পর ড্রাইভারটা ফোন নেওয়া ছেড়ে দিয়েছিল। সম্ভবত আঁচ পেয়েছিল রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যাবে, ওদের না জানিয়েই মাডিকেরি ছেড়ে নেমে গিয়েছিল। যে এজেন্সি থেকে গাড়ি বুক করেছিল, নবারুণ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তারা সোজাসুজি হাত তুলে দিয়েছিল। বলেছিল গাড়ির ড্রাইভার লা-পতা। অন্য কোনও গাড়ি এখন আর পাঠানো যাবে না।

অন্তর্দেশীয় বিমান চলাচল বন্ধ হওয়ার ঘোষণা হবার পর, আকাশছোঁয়া দামে টিকিট কাটার চেষ্টা করেও পায়নি নবারুণ। বার বার লিঙ্ক ফেলিওর, যখন লিঙ্ক পেয়েছিল টিকিট শেষ। ট্রেনের টিকিট জুটেছিল ওয়েট লিস্টে। ব্যাঙ্গালোর পর্যন্ত যাবার জন্য চৌকিদারকে বলে ডবল ভাড়া কবুল করে লোকাল গাড়ির বন্দোবস্ত করেছিল একটা। কিন্তু যাবার দিন সকালে জেনেছিল পঞ্চায়েত প্রধানের অসুখ ধরা পড়ায় গাড়িটা তাকে নিয়ে মাইসোর চলে গেছে। তারপর তো সব বন্ধই হয়ে গেল। তখনও আশা ছাড়েনি নবারুণ, বলেছিল, ভেবো না, কতদিন আর? চালু হয়ে যাবে সব। টালমাটালে সময় চলে গিয়েছিল, কিচ্ছু চালু হয়নি। উল্টে লকডাউনের মেয়াদ বেড়ে গিয়েছিল। ভাগ্যিস বেশি করে ক্যাশ নিয়ে এসেছিল সঙ্গে। নাহলে পেটে গামছা জড়িয়ে থাকতে হত। চৌকিদার অবশ্য আশ্বাস দিয়েছিল, “সাহেব। আমাদের দু’-মুঠো জুটলে, আপনারাও ভুখা থাকবেন না।”

বিপদে-আপদেই মানুষের মুখ চেনা যায়।

বেরনোর উপায় নেই, সারাদিন বাংলো-চত্বরে ঘোরাঘুরি। দিনের আলোয় এক চক্কর দিলে বোঝা যায় বাংলোটা একটা টিলার ওপরে দাঁড়িয়ে। কফি বাগানটা সামনের ঢালে। বুনো হাতির পাল সেদিক থেকেই আসে। মাঝ রাত্তিরে তাদের রক্ত জল করা চিৎকার শোনা যায়। প্রথম প্রথম আতঙ্কে বিছানায় উঠে বসত মিতুল। এখন সয়ে গেছে। বাংলোর পিছন দিকে জমি দুরস্ত করে চৌকিদার বেগুন, ঢেঁড়স, টোম্যাটোর চারা লাগিয়েছে। সেসব পেরিয়ে খানিকক্ষণ হেঁটে গেলে সত্যিই ব্যাক ওয়াটার চোখে পড়ে। ফেন্স পেরিয়ে টিলাটা যেন জলের ওপর ঝুঁকে পড়ে মুখ দেখছে। ওই দিকে তাকালে মনে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি আসে। বর্তমান সময়টাকে তুচ্ছ করে দেওয়া যায়। মিতুল গিয়ে ফেন্সের ধারে একটা পাথরের ওপর বসে। নবারুণ অধৈর্য্য হয়ে বলে, “বসলে কেন? ফিরি চল।”

ফিরে গিয়ে তো সেই শরীর, শরীর…। তাছাড়া কীই বা করার আছে? টেলিভিশানে রামায়ন, মহাভারত, পুরনো সিরিয়াল। খবরটা মন দিয়ে দেখে নবারুণ, আজব অসুখটার হাল হকিকত জানার চেষ্টা করে। আন্দাজ করার চেষ্টা করে কবে আবার সব স্বাভাবিক হবে। ফাঁক পেলে মোবাইল ঘেঁটে পর্নোগ্রাফিক ভিডিও দেখে। কী যে সন্তোষ পায়! এক প্যাকেট তাস এনেছিল আর লুডোর বোর্ড, ঘুটি… দু’জনে যদিও খেলা জমে না, মিতুল তাও জোর করে নবারুণকে টেনে নিয়ে খেলতে বসে। কোনও কোনও দিন চৌকিদারের ছোট মেয়েটাকে ডাকে খেলার জন্য। বড় মেয়েটা আসে না, দূরে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত দিয়ে দেখে। সন্ধে হতে পারে না, নবারুণ লিভিংরুমের সেন্টার টেবিলে গেলাস সাজিয়ে বসে। সঙ্গে করে নিয়ে আসা তরল তলানিতে এসে ঠেকেছে। এর পর কী করবে কে জানে? মিতুল কাজ খুঁজে পায় না। কী করি… কী করি? একদিন লিভিংরুমের বুক-কেস থেকে মলাট ছেঁড়া বইগুলো নামিয়েছিল। নবারুণ বিরক্ত হয়েছিল, “এখানে এসেও বই মুখে দিয়ে বসে থাকবে?”
“আর কী করব?”
“যা করার জন্যে এসেছি,” নবারুণ মজা করেই বলেছিল হয়তো। মিতুলের মনে হয়েছিল নবারুণের ঠোঁটের পাশে কষ বেয়ে লালা ঝরে পড়ছে। মনে হয়েছিল মানুষটাকে যৌনতৃপ্তি দেবার ক্ষমতা বোধ হয় তার ফুরিয়ে যাচ্ছে। বিছানায় রোজদিন সকাল-বিকেল নতুনত্ব চায় নবারুণ, রতির নতুন নতুন অবতার। পর্নো-ক্লীপের মেয়েদের মতো। মিতুল পারে না। বয়স বেড়ে গেছে, চুলে রঙ করা হয় না অনেকদিন, রগের কাছে ইতিমধ্যেই রূপোলী রেখা ফুটে উঠতে শুরু করেছে। বিয়ের আগে বোঝেনি। কোলকাতায় থাকতে নবারুণ এমন জবরদস্তি করত না কখনও। এখানে অন্তরাল নেই বলে মুখোশ খসে পড়ছে? নাকি সব দোষের ভাগী এই লকডাউন? সময় যেন বুকের ওপর পাথর হয়ে চেপে বসে আছে। হাঁপ ধরছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে জলের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। ডুবে যেতে যেতে মানুষ যেমন হাতের কাছে খড়কুটো যা পায় তাই ধরে ভেসে থাকে নবারুণও কি তেমনি অতিরিক্ত যৌনতা আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করছে?

আজকাল আর জানলা বন্ধ করার কথা বলে না মিতুল। যার দেখার ইচ্ছা হয় দেখুক। দিন দিন খিদে বাড়ছে নবারুনের, অতৃপ্তিও। মিতুলের অরুচি হয়। মুখে কিছু বলে না। দিন রাতের হিসেব থাকে না, নবারুণ ওর শরীর নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। অধিকাংশ সময়েই মিতুল সে খেলায় যোগ দেয় না। সম্ভোগের সময়ও তার চোখ খোলা থাকে, চোখের কোণে জল জমে। নবারুনের কাঁধের ওপর দিয়ে তাকিয়ে দেখে খোলা জানলার ধারে চৌকিদারের বড় মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। কী যেন নাম মেয়েটার? কৃষ্ণসার হরিণের মতো চোখ, দু’-চোখ ভরে দেখছে ওদের উথাল-পাথাল নগ্ন শরীর, যৌথক্রিয়া। জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট চেটে নিচ্ছে, শুষে নিচ্ছে ওদের পার্থিব স্বেদ-মন্থন… সঙ্গম-দৃশ্য। এক-এক জনের হয় না, চোখ-সর্বস্ব মুখ, মেয়েটাকে একবার দেখলে চোখদুটোই মাথার মধ্যে বিঁধে থাকে। যদি আর কোনোদিন ওই চোখদুটো মাথার থেকে না বেরোয়! চিরকালের মতো গেঁথে থাকে! এফোঁড় ওফোঁড় হতে হতে মিতুল একবার কেঁপে উঠল। রমণের উত্তেজনায় নবারুণ খেয়াল করল না।


হাতিগুলো দিন দিন অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। রোজ রাতে এসে ফেন্স ঠেলে, বিদ্যুতের ঝটকা খেয়ে ফিরে যায়। সকালবেলা চৌকিদার মুখ ভার করে ঘোরে। মিতুল দেখে নবারুণও ইদানীং লক্ষ করছে চৌকিদারের বড় মেয়েটাকে। চৌকিদারের দুই মেয়ের নামের বাহার খুব। বড় মেয়েটার নাম মোহিনী, ওর বোনের নাম আহিরি। মোহিনী যখন নিজেদের ঘরের সামনে কোমর নিচু করে কাজ করে, চাটাইয়ের ওপর শুকনো লঙ্কা বিছোয়, আচার রোদে দেয়, নবারুণ বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। এক বেলা না দেখলে আহিরির কাছে দিদির খোঁজ নেয়। মোহিনীও আজকাল আশ্চর্য রকমের গায়ে পড়া হয়েছে। আগে কাছ ঘেঁষত না, এখন না ডাকতেই আশেপাশে ঘুরঘুর করে। ও কি জানে মিতুল জানলার আড়ালে ওকে দেখতে পেয়েছিল? বিকেলবেলা নবারুণ আর মিতুল বারান্দায় বসে চা খায়। চায়ের সরঞ্জাম সামনে নামিয়ে দিয়েও যেতে চায় না মোহিনী, বারান্দার রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মিতুল একদিন জিজ্ঞেস করল, “কিছু বলবে?”
মোহিনী মিতুলের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “দিদি, তোমার কাজল পেন্সিলের রংটা খুব গাঢ়। আমায় ধার দেবে ক’দিনের জন্যে? আবার ফেরত দিয়ে দেব।”
শখ তো মন্দ নয়, মিতুল বলল, “আচ্ছা, যাব যখন তোমায় দিয়ে যাব, এখন যাও।”
মোহিনী চলে গেল। নবারুণ বলল, “আহা, ভাগিয়ে দিলে কেন? তোমার গায়ের গন্ধ শোঁকার জন্যে দাঁড়িয়ে ছিল।”

সিকের একটা ফ্লোরাল পারফিউম মিতুলের বিশেষ পছন্দের। সাধারণত সেটাই লাগায় প্রতিদিন। নবারুণ নাক সিঁটকোয়, খোঁটা দিতে ছাড়ে না। বলে, ওই গন্ধটা পেলেই মনে হয় পুজোর ঘরে গিয়ে বসেছি। অন্যদিন চুপ করে থাকে, আজ নবারুণের কথায় মিতুলের রাগ হল, বলল, “আমার গায়ের গন্ধ নেবার জন্যে দাঁড়িয়ে ছিল, না তোমার?”
নবারুণ একটু অপ্রস্তুত হল, আমতা-আমতা করে বলল, “মানে?”
“মানেটা তুমিই ভাল জানো,” মিতুল মুখ ঘুরিয়ে নিল। নবারুণ চায়ের পেয়ালা শেষ না করেই উঠে গেল। চৌকিদারের ঘরের সামনে গিয়ে হাঁক পাড়ল। তার কোলকাতা থেকে বয়ে নিয়ে আসা পানীয়র স্টক শেষ। আজকাল সে চৌকিদারকে দিয়ে লোকাল কুর্গি হোমমেড ওয়াইনের বোতল আনায়। নবারুণ জোর করায় একবার এক সিপ নিয়েছিল মিতুল। অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসার উপক্রম হয়েছিল। মিতুল গজগজ করে বলে চৌকিদারের ঘরের সামনেই খোলা হাওয়ায় একটা খাটিয়া টেনে নবারুণ ওয়াইন পান করে। চৌকিদারও ভাগ পায়। মোহিনী স্টিলের প্লেটে কলা-চিপ্স ভেজে এনে দেয়। খাটিয়ার নিচে, মাটিতে বসে থাকে কখন কী দরকার পড়ে। সন্ধের আঁধার নামলে ব্যাটারি লাইট এনে পাশে নামিয়ে রাখে। ক’দিন পরেই বুদ্ধ-পূর্ণিমা। আকাশে মেঘ না থাকলে পাতার ফাঁক দিয়ে চিলির-বিলির চাঁদের আলো এসে পড়ে ওদের গায়ে মাথায়, মধ্যবর্তী অন্ধকারে। চাঁদ মাথায় ওঠে, আলোর প্রশ্রয় পেয়ে ধীরে ধীরে অন্ধকার ছোট হয়ে আসে। মিতুলের ভয় করে, কান্না পায়, আর কতদিন? সাড়ে আটটা বাজলে, চৌকিদারের বৌ ডাইনিং টেবিলে ডিনার সাজিয়ে ডাক দেয়। তখন টলতে টলতে উঠে আসে নবারুণ। যা খায় তার থেকে বেশি ছড়ায়।

ইদানীং হাতির অত্যাচার ভয়ানক বেড়ে যাচ্ছে। তারা বোধ হয় বুঝতে পেরেছে মানুষ ক্রমাগত কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। ক’দিন পর সন্ধের মুখে চৌকিদার এসে চিন্তিত মুখে জানায় গত রাতে ঠেলা মেরে তারা ফেন্সের দুটো শালের খুঁটি উপড়ে ফেলেছে। নেহাত কাঁটাতার আর বিদ্যুতের ছোবল তাদের আটকে দিয়েছে। বলে, রাত্তিরে সতর্ক থাকতে, কোনওভাবেই বাংলোর বাইরে না বেরোতে। ওদের নিয়ে গিয়ে বাংলোর পিছনে, মিটার-ঘরের দেওয়ালে ফেন্সের ইলেকট্রিক স্যুইচ চিনিয়ে দেয়। বলে, ভুল করেও যেন রাত্তিরে ওই স্যুইচ অফ না করে। অনেক সময় হাতিদের দাপাদাপিতে শর্ট সার্কিট হয়ে ফিউজ উড়ে যায়। স্যুইচের লাইট-ইন্ডিকেটর না জ্বললে যেন চৌকিদারকে অতি অবশ্যই খবর দেয়। নবারুণ থমথমে মুখ করে শোনে। ওর মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি উঠেছে। সাত দিন কামায় না, বললে বলে, এখানে কে আর দেখছে? ঘষা লেগে মিতুলের গলা, বুকের নরম মাংস ছড়ে যায়।

একটা কাঠের ট্রের ওপর পেয়ালা সাজিয়ে মোহিনী চা নিয়ে আসে। তার হাঁটার ভঙ্গিতে একটা তির্য্যক উচ্ছলতা আছে, বর্ষার নদীর বাঁকের মতো। সে ঝুঁকে পড়ে সামনের টেবিলের ওপর ট্রে নামিয়ে রাখে। নবারুণ নির্লজ্জের মতো তার ভরা বুকের দিকে তাকিয়ে থাকে। মিতুল যে জলজ্যান্ত সামনে বসে আছে তার পরোয়া করে না। মেয়েটাও বোঝে, যাবার সময় শরীর দিয়ে ঈষৎ ছুঁয়ে যায় নবারুণকে। নবারুণের চোখে হাসি ঝিলিক দিয়ে ওঠে। মিতুল টের পায়, শীত পড়লে যেমন পর্ণমোচী গাছের পাতা ঝরে যায়, নবারুণের আচার-আচরণ থেকে আজন্মলালিত সহবৎগুলো একে একে ঝরে যাচ্ছে। এমনকি সাধারণ সতর্কতাও। নিষ্পত্র শাখার মতো বেঁচে থাকার লিপ্সা পড়ে রয়েছে কেবল। হয়তো এক্ষুণি নবারুনের স্পৃহা জেগে উঠবে। মধুচন্দ্রিমার একান্নতম সন্ধ্যায় মিতুলকে অন্য একজন নারীর প্রক্সি দিতে হবে। আর কতদিন? আর কত নারীর হয়ে…? এর কি কোনও শেষ নেই?

একান্ন নাকি বাহান্নতম, মিতুলের হিসেবে ভুল হয়ে যাচ্ছে, আজ কি বুদ্ধ-পূর্ণিমা? নাকি গত কাল ছিল? রাত্তিরে বিছানায় উঠে নিজেকে উন্মোচিত করতে করতে নবারুণ দেখল জানলায় মোহিনী দাঁড়িয়ে আছে। খুব যে আশ্চর্য হল তা নয়। মোহিনীও সম্ভবত নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেনি। নবারুণ মিতুলের গায়ে নাড়া দিয়ে দেখাল। মিতুল পায়ের কাছে পড়ে থাকা চাদরটা বুকের কাছে টেনে নিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলল, মোহিনী, এখানে দাঁড়িয়ে কী করছিস? ভান করল যেন আগে কখনও দেখেনি। নবারুণ মিতুলকে থামাল। মোহিনীকে হাতছানি দিয়ে ডাকল, আয়, ভেতরে আয়। মোহিনী ঘাড় নাড়ল, এল না। জানলা থেকে সরে গেল।
নবারুণ উঠে গিয়ে দেখল জানলার বাইরে থালার মতো চাঁদ উঠেছে। হালকা হলুদ আলোর মধ্যে মোহিনী আঁচল এলিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। গিয়ে ওদের ঘরের সামনে পেতে রাখা খাটিয়াটায় পা তুলে বসল। হাঁটু মুড়ে বুকের কাছে টেনে নিয়ে গুনগুন করে নিজের ভাষায় গান ধরল। দুলে-দুলে গান গাইছে মোহিনী, নিচু গলায়, যাতে কারও ঘুম না ভাঙে। নবারুণ জানলার থেকে ফিরে এল। বিছানায় এল না অবশ্য। মেঝেয় পড়ে থাকা পাজামাটা পায়ে গলিয়ে দড়ি বাঁধতে-বাঁধতে দরজার দিকে এগোল। মিতুল জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাচ্ছ, যদিও জানে কোথায় যাচ্ছে ও। নবারুণ জবাব দিল না। ফিরেও এল না।

মিতুল বাংলোর সদর দরজার ছিটকিনি খোলার আওয়াজ পেল। যেন ওই আওয়াজটার জন্যই কান পেতে বসে ছিল। উঠল, ধীরে-সুস্থে পোষাক চড়াল গায়ে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে একটু চিরুনি বোলাল। লিপস্টিক বার করে ঠোঁটে ঘষল। চোখের কোণে কাজলের হালকা টান দিল। এই কাজলটাই চেয়েছিল মোহিনী। মিতুল আয়নার মধ্যে নিজের দিকে তাকিয়ে ভঙ্গুর হাসল। তাড়াহুড়ো নেই, হাতে এখনও যথেষ্ট সময় আছে। ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে সিকের পারফ্যুমটা বের করে বাহুমূলে, কানের পিছনে হালকা স্প্রে করল। টিপের পাতা থেকে একটা টিপ তুলে দুই ভুরুর মাঝখানে গেঁথে দিল। নিজেকে আয়নায় দেখে বেশ পরিতোষ হল। এবার যাওয়া যেতে পারে।

লিভিং-কাম-ডাইনিঙের শেষ মাথায় বাংলোর পিছনে যাবার দরজা। মিতুল বাইরে এসে দাঁড়াল। এক ফালি উঠোন থইথই করছে জ্যোৎস্নায়। নামতেই গোড়ালি পর্যন্ত ডুবে গেল। এক পাশে মিটার-ঘর। দরজা খোলাই থাকে, হাতের ঠেলা দিতেই ঝুল পড়া বাল্বের বিষণ্ণ আলো। মিতুল চৌকিদারের দেখিয়ে দেওয়া স্যুইচটা খুঁজল। এই তো এখানে… নিভিয়ে দিতে গিয়ে মিতুলের হাতটা কি একবার কাঁপল? যাক, কাজ মিটল। ভয় ছিল খুঁজে পাবে না। ভয় ছিল শেষ মুহূর্তে স্যুইচটায় আঙুল ছোঁয়ানোর সাহস পাবে না। মিটার-ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল মিতুল। ফিরে গিয়ে আবার একবার পরখ করে দেখল… ইন্ডিকেটর লাইটটা আর জ্বলছে না।

চৌকিদারের বেগুন খেত পার হয়ে শান্ত পায়ে হাঁটছিল মিতুল। চতুর্দিকে নরম আলোর সর পড়ে আছে। ওর পা ডিঙিয়ে সরসর করে একটা গিরগিটি চলে গেল। অন্য সময় হলে ভয় পেত, আজ নয়। একটা পাপিহা থেকে-থেকে তীব্র চিৎকার করে উঠছে, খুব কাছ থেকে। ওই ডাকটা শুনলেই মাথার মধ্যে ঝনঝন করে ওঠে। মনে হয় জ্বর আসছে। মিতুলের পায়ের নিচের মাটি কেঁপে উঠল একবার, দু’-বার…। হাতির পাল আসছে। আজ আর বিদ্যুতের বারণ নেই। কাঁটাতার উপড়ে তারা অনায়াসে ঢুকে পড়তে পারবে বাংলোর চৌহদ্দিতে। কাল সকালে আর চেনা যাবে না জায়গাটাকে। বুনো হাতির দল সামনে যা পাবে মাড়িয়ে-চাড়িয়ে তছনছ করে রাখবে। তার মধ্যে দুটো নগ্ন দলিত শরীর কি আদৌ খুঁজে পাবে চৌকিদার? আর তৃতীয় শরীরটা? আর একটু এগোলেই সেই পাথরটার কাছে পৌঁছে যাবে মিতুল, যার ওপর বসে জলের দিকে চেয়ে থাকা যায়। চলার গতি বাড়াল মিতুল, হাতির পাল বাংলোয় ঢোকার আগেই তার সেখানে পৌঁছে যাওয়া দরকার। কে না জানে, জ্যোৎস্না রাতে নিঃসঙ্গ জলের ধারে পরি নামে। তুলতুলিটাকে একদম পরির মতো দেখতে। কতদিন কোনও পরি দেখেনি মিতুল।

8 Comments

  • Soumi Acharya

    Reply January 1, 2022 |

    তুলতুলিটার জন‍্য বড্ড ব‍্যথা হল মনে।সুন্দর গল্প।

  • Indranil

    Reply January 1, 2022 |

    অনবদ্য! শেষের দিকে এক আশ্চর্য যাদুময়তা ঘিরে ধরল।

  • ময়ূখ দত্ত

    Reply January 2, 2022 |

    আলো-অন্ধকারে মাখামাখি বাস্তবতার অপ্রেম কাহিনী!! খুব ভাল লাগল!!

  • Gautam Bandyopadhyay

    Reply January 2, 2022 |

    অনবদ্য… আর কোনো কিছু বলে আমার মুগ্ধতা প্রকাশ করতে পারবো না

  • দেবলীনা

    Reply January 2, 2022 |

    মুগ্ধ বিষন্নতা !!

    • Tanima Hazra

      Reply January 3, 2022 |

      মানব চরিত্রের অপূর্ব বিন্যাস

  • Reply January 2, 2022 |

    সত্যি কি হাতিরা আসবে আজকে? বন্দেশী খেয়ালের ” মন মাতঙ্গ, মতুয়া রহি ডোলে।”
    শ্বাস বন্ধ করে, বাইনোকুলার নিয়ে বসে থাকলাম পাথরের ধারে।

  • যুগান্তর মিত্র

    Reply January 17, 2022 |

    আপনি মারাত্মক রকমের ভালো লেখেন। পড়ে চুপ হয়ে থাকি।

Leave a Reply to Soumi Acharya Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...