বিদর্ভ-বন্ধুর স্মরণে দুচার কথা
সমরেন্দ্র বিশ্বাস

সেদিনটা ১৯শে জানুয়ারী ২০২১! খবরটা ফেসবুক ও টেলিফোনে জানতে পারলাম।সুকুমার চৌধুরী আর নেই! আমাদের থেকে ও তো বয়সে ছোট!  অবিশ্বাস্য ও অকল্পনীয় এই খবরটা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম! নাগপুর ও বিদর্ভ অঞ্চলের বাংলা সাহিত্য চর্চার এসময়কার প্রধান নায়ক সুকুমার চৌধুরী এতো তাড়াতাড়ি চলে গেলো!

সম্প্রতি সুকুমারের লেখা বইপত্রগুলোর পাতা উল্টাতে উল্টাতে দেখলাম, ও নিজের মৃত্যুর অনেক আগেই লিখে রেখেছিল নিজের এপিটাফ –

‘পৃথিবীর ওপর শুইয়ে দিও আমার ঘুমন্ত মৃতদেহ

আর আমার আদিগন্ত ঠান্ডা শরীরের ওপর

একসময়ে ভা্লোবাসার মতো ঝরে পড়বে বৃষ্টি

যা আমি তোমাদের কাছে চেয়েছিলা    হে মানুষ হে মানুষী’  [এপিটাফ]।

ভিলাই ছত্তিশগড়ে চাকুরী করতে আসার সুবাদে সুকুমার চৌধুরীর সাথে নাগপুরে আমার প্রথম আলাপ বিগত আটের দশকের শেষদিকে। বেশ অনেকবার আমাদের দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে। গড়ে উঠেছিল একটা আন্তরিক সম্বন্ধও। তাই ওকে নিয়ে আমার এই স্মৃতি তর্পণ!

সুকুমার চৌধুরীর জন্ম ১৪ই জানুয়ারী-১৯৬২, পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলাস্থ ঝালদা অঞ্চলের বলরামপুর গ্রামে। তার শৈশবও কেটেছে পাহাড়, নদী আর জঙ্গল ঘেরা ঝালদায়। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে চলে আসতে হয়েছে বিদর্ভ অঞ্চলে  নাগপুরে। এখানে এসে সে চেষ্টা করতে থাকে কি করে একটা বাংলা ম্যাগাজিন বের করা যায়। বহির্বঙ্গে বসে ব্যাপারটা সহজ সাধ্য ছিল না। ঘটনাচক্রে সঙ্গী হিসেবে সুকুমার পেয়ে যায় সুব্রত পালকে। এই দুজনের সম্পাদনায় ১৯৮৬তে প্রথম প্রকাশিত হয় ‘খনন’ পত্রিকাটি। এটা ছিল ওই অঞ্চলের প্রথম বাংলা লিটিল ম্যাগাজিন।

এই খনন পত্রিকাকে ঘিরে নাগপুরে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির পালে একটা নতুন উদ্দীপনার হাওয়া লাগে। সুকুমারের সাথে আরো অনেকেই ধীরে ধীরে সক্রিয় ভূমিকায় যোগ দেন। নাগপুরে চাকুরীর সূত্রে অনেকেই এসেছে, আবার নাগপুর ছেড়ে অনেকেই চলে গেছে। যেমন সুব্রত পাল ১৯৯০ এ নবদ্বীপে ফিরে গেলে খননএর সম্পাদনার সমগ্র দায়িত্ব সুকুমার চৌধুরীকেই নিতে হয়েছে। ২০১৯ পর্যন্ত এই পত্রিকাটি সুকুমার নিয়মিত বের করে গেছে, বছরে একটা বা দুটো করে সংখ্যা। করোনার কারণে ২০২০তে কোনো সংখ্যা বের করা যায় নি। আমৃত্যু সুকুমার চৌধুরীর সম্পাদনায় খনন পত্রিকাটি বেরিয়ে এসেছে। আরো একটা উল্লেখযোগ্য বিষয়,  নিয়মিত ভাবে খননের যে আড্ডা বুলেটিন বের হতো, তার সম্পাদনা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অনেককেই নিতে হয়েছে। মূল বাংলায় প্রকাশিত খনন পত্রিকায় থাকতো ইংরেজী সাপ্লিমেন্ট, যার জন্যে কিছু অবাঙালী বন্ধুবান্ধবও তারা সহযোগী হিসেবে পেয়ে গেছিল। সঙ্গত কারণেই ‘খনন’ পত্রিকাটার পরিচিতি পশ্চিমবঙ্গ, ভারতের অন্যান্য প্রদেশ, বাংলাদেশ ও বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনের দরবারে পৌঁছে গেছিল। আর এসবই সম্ভব হয়েছিল সুকুমারের পরিশ্রম, দক্ষ পরিচালনা ও বাংলার প্রতি তার একনিষ্ঠ ভালোবাসার কারণে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, ২০০৫ সালে জলপাইগুড়ি বইমেলায় ‘খনন’ পত্রিকাটা ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ লিটিল ম্যাগাজিন হিসেবে ‘মুন্সি প্রেমচাঁদ পুরস্কার’ পাবার গৌরব অর্জন করে। কয়েক বছর আগেই সন্দীপ দত্তের কলিকাতা লিটিল ম্যাগাজিন লাইব্রেরী ও গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক খনন বছরের শ্রেষ্ঠ লিটল ম্যাগাজিন হিসেবে পুরস্কৃত হয়।

এবারে কিছুটা আসা যাক সুকুমারের কবিতার বিষয়ে।

সুকুমারের প্রথম কবিতার বই ‘মানুষ হে’, বইটা কতকাল আগে পড়েছি। বইএর কিছু কিছু কবিতা আমার ছবির মতো মনে আছে। চোখ বুঝলেই দেখতে পাই কবিতায় লেখা দরিদ্র পরিবারের ছবি, তাদের জীবনযাপন! সুকুমারের পুরুলিয়ার প্রথম জীবনকে বুঝতে গেলে এই কবিতাগুলো অবশ্যই পড়া দরকার। ‘মানুষ হে’ কবিতার ভূমিকার পাতায় লেখা আছে –

‘অই আমার উপবাসক্লিষ্ট মা    মলিন বসন

তুলসীতলার নীচে নতজানু সন্তর্পণে প্রদীপ জ্বালান

কল্যাণ কামনা করেন আমাদের … ’

কিশোর কবির জীবনযাপনে কি এক নিদারুণ যুদ্ধ ছিল, তা সে লিখে রাখে ‘প্রতিদিন’ কবিতায় –

‘চোরের মতো লুকিয়ে লুকিয়ে আমি

নিয়ে আসতাম জিআরের ভাঙ্গা গম, খুদকুড়ো, বাজরার দানা ……

… খালি পকেটে হাত ঢুকিয়ে

আমার ভীষণ লজ্জা কোরতো

ধিকিধিকি আগুনের মতো বেড়ে উঠতো অপমানবোধ’

কিংবা তার ‘ধান’ কবিতা। যেখানে এক ধনী বন্ধুর সামনে কিশোর সুকুমারের জীবনযাপনের লজ্জা উঠে আসে, পুরো কবিতাটাই তুলে দিচ্ছি – 

‘আর একেকদিন হুট কোরে সুজয় এসে পড়তো

সে ছিল এক জোতদারের ব্যাটা, সহজ সুন্দর    আর বোকা সোকা

ভারী বন্ধু ছিল আমার, আর আমাদের    এই অসম বন্ধুত্বে

যাতে চির না ধরে, তার জন্যে আমার মা

গিরিধারীর দোকান থেকে ধার কোরে আনতেন    বিস্কুট আর চানাচুর

আমার দিদি ছেঁড়াখোঁড়া শাড়ি দিয়ে ঢেকে ফেলতো     ঠোঙ্গার পাহাড়

আর ভাইবোনদের লুব্দ্ধ দৃষ্টির সামনে    বিস্কুট চিবুতে চিবুতে

সে এক সময় বলে উঠতো :

ও গুলো কি ঢেকে রেখেছিস রে?  ধান নাকি??’ 

দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ সুকুমারের মনে ছাপ ফেলে! জানুয়ারী ১৯৮০তে লেখা তার কিছু কথা উঠে আসে ‘দিনলিপি’ কবিতায় –

‘ভোটের আগুন ক্রমে নিভে আসে, দিকে দিকে ইন্দিরার জয়গান

ক্রমশঃ ভাবিয়ে তোলে শীতার্ত মানুষদের …… ’

কেউ কেউ বলতে পারে সংবাদ বা দিনলিপির বর্ণনা কাব্য নয়। তাদের এই সব শঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে ‘মানুষ হে’ বইতে সুকুমার আমাদেরকে উপহার দেয় অসাধারণ সব কাব্যিক লাইন –

‘দীর্ঘসূত্রী বিষাদের শেষ লগ্নে শুয়েছিল সুখ’  [ সুখ]   অথবা

‘যেন সমুদ্র পাথার অই নীল চোখে ভেসে গ্যাছে আমার মনীষা’ [রুমা] ।

‘মাংস ও মনীষা’ সুকুমারের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ, তখন তার ভেতরে প্রথম যৌবনের কুহক আচ্ছন্নতা। তাই তার এই বইএর বেশ কিছু কবিতায় খেলে বেড়ায় কামনা, প্রেম, যৌনভাবনা। কবি বুঝে নিতে চায় শরীর আর সম্মোহন। যেমন –

‘তার মাংসল প্রতিভাখানি খেলে ভালো উধাও শাড়িতে’ [ উত্তরণ]

অথবা তার ‘শিল্পজ নীলা’ কবিতার কয়েকটি লাইন-

‘কামান্ধ মাছির মতো    সে চাইলো

চেটেপুটে খেয়ে নিতে আলোর শরীর ……

শ্বেতবর্ণ যোনি ফেঁড়ে ফেঁড়ে প্রলয় ঝড়ের মতো ছুঁড়ে দেয় মায়াবী রোদ্দুর অহো

চেয়ে দ্যাখো তেতোচোখ শিল্পজ নীলার ঐ নীল বিচ্ছুরণ

যোনিজ আলোর ঐ বিস্ফোট অসুখে নীল মাছি মুহূর্তেই  হয়ে গেল মুগ্ধ ময়ূরী’।

সুকুমার ‘ফেরাতে পারি না (একটি ভোর ও কৃষ্ণাকে)’ কবিতায় লেখে –

‘আমি জানি

তুমি তো স্বৈরিণী নও, বেশ্যা নও,    খেলুড়ে রমণী নও দূর পৃথিবীর

তুমি তোমাদের রুটি, লালপানি, বিলাসব্যাসন

অথচ অনিবার্যতার কাছে তুমি হেরে যাও    ক্রমাগত হেরে যেতে থাকো

আমি তোমাকে ফেরাতে পারি না’

এবার আসি তার আরো অন্য একটি কবিতাতে –

‘৭ই জানুয়ারী, ১৯৮৫

ভিলাই-এ এবারে স্বাতী নেই। শুধু

সোনালী রোদ্দুর মাখা ঝুল বারান্দায় স্মৃতিহিম আলো।

গোলাপের ডালে কেন ফেলে গেছ মাংস গন্ধ

কালো ব্রেসিয়ার’ [উলঙ্গ ডায়েরী থেকে]।

কবি প্রেমের জন্যে উন্মাদ। সমুদ্রের মতো কোনো রমনীর উদ্দেশ্যে তার তীব্র উচ্চারণ প্রেমজ হাহাকারের মতোই তীব্র –

‘আমাকেও নষ্ট করো এইবার, নাও

আসংকোচে বলি ফের প্রকৃত যুবতী তুমি

একবার দ্বিচারিণী হও, ………

শরীরের সমগ্র জিহ্বায় তোলো স্বর, আমাকে আমূল

নাও, নষ্ট করো, খাও

আর অসংকোচে বলি আজ সাগর বালিকা তুমি

ওগো ডুবজল, সন্ন্যাসে যাওয়ার আগে

শেষবার তৃপ্ত হোতে চাই      [সমুদ্ররমনী]।

সুকুমারের এক এক করে অনেকগুলো কবিতার বই বেরিয়েছে। ১৯৯৬এ প্রকাশিত ‘আমাদের পর্যটন’ কবিতার বইটি ও আমাকে উপহার দিয়েছিলো। এই বইটি পড়েছি। এখন আবার নতুন করে পড়ছি।  সুকুমারকে যতটা পড়ছি ততই আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছি! এই বইএর কয়েকটা কবিতা পাঠকদের দরবারে তুলে দিতে চাই।

‘অন্ধকার সিঁড়িতে থমকে রইলো অভিমান

আর আমি ঘৃণার শেকল টেনে

লোভ ও পাপের যতো লঘুসিঁড়ি মাড়িয়ে মাড়িয়ে

নেমে এলাম ঠান্ডা হিম শ্মশান ভূমিতে

যেখানে চুল্লিচিতায় পোড়ে দাউ দাউ আমার পৌরুষ

আর উঠে আসে পরিত্রাণ হোমধোঁয়া

              কান্না ও কোরাস’      [ ঈশ্বর হে]। 

অথবা

‘পাপড়ি খোলার মতো থরোথরো খুলছিল তার লজ্জা

মুহূর্ত কি শুধুই অলীক তাকে মূল্য দিতে

পদ্মকোরকের মতো খুলে গেলো দ্বিধাগ্রন্থি ব্রেসিয়ার আমূল সংস্কার! [সাবমেরিন]

অথবা

‘আমি বললাম শুদ্ধতার দিকে হেঁটে যাক

আমাদের ছদ্মজীবন’ [ জীবন]

কিংবা

‘ওষ্ঠে বারুদগন্ধ চুলে রাত্রিজট

             নিমন্ত্রণের মতো উড়ছে আচল’  [পাপকল্প]।

মাভূমি ঝালদাকে নিয়ে পুরুলিয়ার আঞ্চলিক ভাষায় লেখা সুকুমারের ‘লাল লীল হইলদা তিন দিকে ঝাইলদা’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে, প্রকাশ কর্মকার এই বইটির অলঙ্করণ করেছিলো। বইটা সে সময় বেশ সাড়া জাগিয়েছে।

সুকুমারের লেখালেখি সময়ের সাথে সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটে। ২০১৪ তে প্রকাশিত ওর কাব্যগ্রন্থ ‘পাউচ সভ্যতা’। তাতে ও লিখছে-

‘পাউচ সভ্যতা নিয়ে কোনদিন লেখা হবে    স্যাশে কবিতা

খুব দেরী নেই

রচনাবলীর দিন শেষ হয়ে এলো’। [পাউচ সভ্যতা]

সত্যি তো আমাদের জীবন ভরে উঠেছে মাইক্রো চিপসে, শ্যাম্পু – টুথপেষ্ট – আচার কুরকুরে নীল কন্ডোমের যাবতীয় পাউচে! বিশাল বা ব্যাপক ভাবে মানবীয় কিছু ভাববার দিন কি ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসছে?

‘চক্রান্ত’ কবিতায় দেখি কবির কি নিদারুণ পর্যবেক্ষণ –

‘চক্রান্তের গন্ধ ভেসে আসে। নিষিদ্ধ

মাংসের ঘ্রাণ, সুরা ও সিম্ফনি। ……

চক্রান্তের গন্ধ ভেসে আসে। উষার 

প্রতীক্ষা করি। খুব দ্রোহহীন। কেন না

আমি জানি

মধ্য রাত্রের সমস্ত চিয়ার্স

সূর্যালোকে ম্লান হয়ে যায়’।

কবিতা নিয়ে এই আলোচনা শেষ করবার আগে আসি সুকুমারের  ১৪২৮ দীপাবলীতে প্রকাশিত ‘কবিতাপাঠ’ গ্রন্থ থেকে দুটো লাইন তুলে দিতে চাই

‘একদিন আমারও আধার কার্ড আসে ক্যুরিয়ারে।

আর আমিও হারিয়ে যাই আম জনতার মাঝে।’     [আধার কার্ড]

সামাজিক অবস্থার কারণে মানুষ কি করে তার নিজের বিশেষত্ব হারিয়ে ফেলে, মানুষ কি ভাবে একটা মাত্র সংখ্যা দিয়ে নির্দিষ্ট হয়, একথা এখানে কবি খুব সুন্দর ভাবে সবাইকে বুঝিয়ে দেয়। এজন্যেই বলছি, বহির্বঙ্গে বসবাসকারী সুকুমার চৌধুরী সময়ের সাথে জুড়ে থাকা ভারতবর্ষের একজন বিশিষ্ট বাংলা ভাষাভাষী কবি প্রতিভা।

সুকুমার চাকরী করতো নিকো কোম্পানীতে। এই চাকরীর সাথে সাথে সে অবিচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে গেছে নিজস্ব সাহিত্য চর্চা ও লেখালেখি। খনন পত্রিকার প্রকাশ আর নিজেদের ধারাবাহিক আড্ডা তো ছিলই। সুকুমার মূলত কবি, কাব্যগ্রন্থের তালিকা যথেষ্ট লম্বা। কবিতার সাথে সাথে কিছু গল্প ও গদ্যও লিখেছে। গল্প লেখার জন্যে ১৯৯৮তে সে পেয়েছিল ‘মায়ামেঘ’ পুরস্কার। তার বেশ কিছু কবিতা অন্যান্য ভাষায় অনুদিত হয়েছে। ইংরেজীতে অনুদিত কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে একটা বই – Bohemian Songs ,  সেটা ১৯৯৯ এর কথা। 

সুকুমার চৌধুরী আরো বেশ কিছু সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। যেমন ১৯৯৭এ শ্রেষ্ঠ কবিতার জন্যে পেয়েছে ‘এখন কবিতা পুরস্কার’, ২০০০ সালে শ্রেষ্ঠ সম্পাদনার জন্যে ‘মহাদিগন্ত পুরস্কার’। ২০০৫ সালে ‘সদ্ভাবনা পুরস্কার’, ২০১১ সালে বিশিষ্ট কবি ও সম্পাদক হিসেবে পে্যেছে ‘কল্যানী হালদার মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’।

সুকুমার খুব ভালো একজন শিল্পী। খনন-এর প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদ করেছিল সুকুমার নিজেই। এদিক ওদিকে ছড়িয়ে আচ্ছে তার বিভিন্ন শিল্প প্রচেষ্টা!

সুকুমারের প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে আছে – মানুষ হে(১৯৮৬), মাংস ও মনীষা (১৯৮৭), মায়ের বাপের বাড়ি (১৯৮৯/২০০৬), আমাদের পর্যটন (১৯৯৬), ছন্নমতির কুহু (১৯৯৭), লাল লীল হইলদা তিন দিকে ঝাইলদা (১৯৯৮), ফনিমনসার উলু (২০০০), লিবিডোর হাড়মালা (২০০০), পদ্য প্রতিবেশী (২০০১), গদ্য প্রতিবেশী (২০০২), রজনীর নীল (২০০৪), আমার কাটিয়ে ওঠা (২০০৪), আমার সনেট (২০১২), আমার লাগে না (২০১৩), পাউচ সভ্যতা (২০১৪), কবিতা পাঠ (দীপাবলী – ১৪২৪) ইত্যাদি।

অনেকেই বলে সুকুমার চূড়ান্ত বোহেমিয়ান। আমার মনে হয়, ওর অন্তরটা চূড়ান্ত ব্যবস্থিত ও সুস্থির। তা নইলে একটা প্রাইভেট অফিসের চাকুরী করে নিজের সুদীর্ঘ সাহিত্যকর্ম চালিয়ে যাওয়া, একটা সুন্দর পত্রিকা সম্পাদনা একজনের পক্ষে কি করে সম্ভব?  নাগপুরের ওয়াড়ি লাভা রোডের কাছে নিজের বাড়ি। তার বাড়ির সামনের রাস্তাটার নাম ওদিককার পোষ্টম্যানেরা জানে – ‘খনন সরনি’ – নামটা সুকুমারেই দেয়া।

স্লিপডিস্ক, কর্কটরোগ, তার সাথে করোনা – এসব কারণে মৃত্যু বড়ো তাড়াতাড়ি ছিনিয়ে নিয়ে গেলো আমাদের বিদর্ভের বন্ধু সুকুমারকে।

মৃত্যুর পর ওর এককালের বন্ধু ও প্রথম দিককার খনন পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক সুব্রত পাল সুকুমার চৌধুরী সম্পর্কে লিখেছে – ‘ওর মৃত্যুর পর নাগপুরে বাঙালি সংস্কৃতির সেই জায়গাটা হারিয়ে গেল বলেই মনে হয়। যারা থাকলেন বা পরবর্তী কালেও যারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকবেন (খোদ পশ্চিমবঙ্গেই যেখানে বাঙালির অনীহা ও হিন্দি ভাষা সংস্কৃতির চাপে এখন ক্রমশ এসব চাপা পড়ার মুখে) তাদের কারও পক্ষে আর সকলকে গুছিয়ে গ্রন্থিবাঁধা সম্ভব হবে কিনা বলা মুশকিল। অবশ্য কালীবাড়ি থাকবে, দূর্গাপূজোও থাকবে একরকম। তবে সেখানে বাঙালিত্ব থাকবে কিনা সেটা আলাদা প্রশ্ন।’

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...