বাদবাংলার বিশিষ্ট কবি ও সম্পাদক সুকুমার চৌধুরীর সঙ্গে কথালাপ…
অর্ঘ্য দত্ত

সুকুমার চৌধুরী আশির দশকের উল্লেখযোগ্য কবি। নাগপুর থেকেই লাগাতার লেখালেখি করে যাচ্ছেন গত প্রায় চার দশক ধরে। নিজের লেখা ছাড়াও নিয়মিত সম্পাদনা করছেন ‘খনন’ পত্রিকা। সে পত্রিকাও পাঠকমহলে যথেষ্ট পরিচিত এবং সমাদৃত।

আমার‌ই বয়সী প্রায়। এবং দজনেই দীর্ঘ বছর এই মহারাষ্ট্রেই থাকাতে তার সঙ্গে বেশ একটা আত্মীয়তা অনুভব করি। তবে বড্ড মেজাজ! আমারও তো মেজাজ কম নয়, ফলে এই সাক্ষাতকার নেওয়ার সময়ে কথায় কথায় লেগে যেত বচসা। অবশেষে যেটুকু কথা হয়েছিল সেটুকুই এবার প্রকাশ করলাম পাঠকদের জন্য।

আচ্ছা সুকুমার, তুমি ঠিক কবে থেকে বহির্বঙ্গে আছো?

—  ১৯৮০ থেকে বাদবাংলায়। আরে অর্ঘ্য, একটা কথা বলো দেখি, তুমি বহির্বঙ্গ কেন বলছো? তুমি কি অন্তর্বঙ্গও বলো?

না, বলি না। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে বোঝাতে বহির্বঙ্গে বলি। বাদবাংলাও তো একটা ট্যাগ। তা, এই দুটো শব্দের মধ্যে তফাৎটা কি?

—  ওই যে তুমি বললে ‘বহির্বঙ্গে’, অথচ ‘অন্তর্বঙ্গ’ বললে না, বিভাজন করে ফেললে। বাংলা থেকে এক লহমায় বাদ দিয়ে ফেললে আমাদের, তাই বাদবাংলা। সাহিত্যকে ভুগোলের সীমারেখায় বাঁধাবাঁধি কেন ভাই? আমরা তো সেই বাংলা ভাষাতেই লেখালেখি করি। আসলে এটা অনুভুতির ব্যাপার, এর সাথে জুড়ে আছে একরাশ শুদ্ধ অভিমান।

কবে থেকে কবিতা লিখছো? কবে থেকে লেখালেখিকে গুরুত্ব দিতে শুরু করলে?

— ক্লাস সেভেন থেকে।  গুরু্ত্ব প্রথম থেকেই দিলেও, আমার মনে হয় হায়ার সেকেন্ডারির ফর্ম ফিলাপের পর, প্রস্তুতি পর্বের দীর্ঘ দিনগুলিতে সম্ভবত আমি লেখালেখিকে একটু বেশিই গুরুত্ব দিয়ে ফেলি। আশৈশব ফার্স্ট বয় আমি সবাইকে চমকে দিয়ে সসম্মানে হায়ার সেকেন্ডারি পাস করি থার্ড ডিভিশনে।

এত বছর বাদে এখনো কি লেখার জন্য একই রকম তাগিদ অনুভব করো?

  লেখালেখির জন্য তাগিদ কিন্তু আমার আশৈশব। প্রথম প্রথম অভিভাবকরা ভাবতেন বুঝি পডাশোনা থেকে ফাঁকি মারার অজুহাত! তারপর যখন তখনকার বিখ্যাত পত্রিকা ‘সন্দেশ’-এ লেখালেখি আর ছবি আঁকা শুরু হলো আর ওই পত্রিকার ‘হাত পাকাবার আসর’ থেকে খোদ সত্যজিৎ রায়ের হাতের লেখা চিঠি আসতে শুরু করলো আমাদের প্রাগৈতিহাসিক চৌধুরীবাটিতে ঝাইলদার সুকার নামে, তখন গার্জেনদের কানমলাটা একটু যেন কমেছিল। তবে তাগিদ তো আজও অব্যাহত, বরং দিনদিন বাড়ছেই। সারাদিনের শেষে বাডি ফিরে স্নান সেরে যখন লিখতে বসি নিজেকে আর দাস বা ক্রীড়নক নয়, সম্রাটের মতো মনে হয়। তখন আমার কাছে সিলেবাস বা সংবিধান থাকে না, কারো রক্তচক্ষু বা শোষণ আমাকে আর দিনযাপনের ছাপোষা কেরানি করে রাখে না, আমি কলম দিয়ে পিষে পিষে ধ্বংস করি আদিনরাত্তির অসুন্দর আর অবক্ষয়ের বিষ, প্রেমের কবিতা লিখি। এভাবেই আমার তাগিদ বেড়ে ওঠে প্রতিদিন, অস্থিরতাও।

বহির্বঙ্গে বা তোমার ভাষায় বাদবাংলায় থাকার জন্য তোমার কি কখনো মনে হয়েছে যে কোলকাতা কেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্যের মূল স্রোত থেকে পিছিয়ে পড়ছো? বা উপযুক্ত স্বীকৃতি পাচ্ছো না?

— মোটেই না। আসলে আগাগোড়াই আমি খুব প্রত্যাশাহীন। আমার সবসময় কেন জানি মনে  হয়েছে যা কিছু প্রত্যাশাবিহীন তাই আসলে শিল্প। কোনো প্রত্যাশা নিয়ে আমি কলম ধরিনি, কোনো প্রতিযোগিতাও আমাকে কখনো উদ্বেলিত করেনি। দিল্লিতে মধ্যরাতে, সেই যে ক বছর আগে, দিলীপ ফৌজদারদা, তুমি, পীযূষ বিশ্বাস আর সব্যসাচী সান্যাল, স্বতঃস্ফূর্ত সকলকে এই কথাটাই বলতে চেয়েছিলাম। মনে আছে সব্যসাচী আমাকে জড়িয়ে ধরে গোলমার্কেটের আধো অন্ধকারে বলেছিল, তোমার সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণা ছিল, তুমি আজ সব মুছিয়ে দিলে গুরু।

সুতরাং কোলকাতা বলো, স্রোত বলো, স্বীকৃতি বলো আমার কিছুই এসে যায় না। আমি আসলে মনের আনন্দে লিখি… । এ সব তত্ত্ব আমাকে শুনিও না বস্, ও সব আমার জন্য নয়।

তোমার লেখাকে, সে গল্প – কবিতা যাই হোক, বহির্বঙ্গের জীবন যাপন কতটা প্রভাবিত করেছে?

— পুরোটাই প্রভাবিত করেছে। আমাকে অনেকে কবি বলেন, আবার রবিদা সেদিন বললেন তুমি হচ্ছ এই সময়কার শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক। হা হা, উপন্যাস আর আমি, ও গড্ …

সে যাই হোক, আমি কিন্তু যাই লিখি, গদ্য বা পদ্য, এক লাইনও বানাতে পারি না, জানো? যা দেখি, তাই লিখি। পুরোটা হয়তো পারি না, কেই বা পারে… তবে যতটা পারি…যতটুকু পারি… অবিকল আমার পরিপার্শ্ব…আমার জীবন…আমার বাদবাংলা…৩৬ বছর ধরে দেখা বিদর্ভ-মারাঠা।

দাঁড়াও, স্মৃতি থেকে আমারই একটা কবিতার অংশ তোমাকে শোনাচ্ছি, তাহলে তুমি বুঝতে পারবে– এটা বিপ্লব চক্রবর্তীর লোকাভরণ নিয়ে লেখা বইটাতেও নিয়েছেন…

সবটা পারিনা আমি

অল্প অল্প ভাঙি

যতটুকু ভাঙি

তারও অণু

মৃদু

মিত

অণুকণাগুলো

শুধু অনুদিত হয়…

তোমার কবিতায় গত তিরিশ বছরে কি কোনো সচেতন পরিবর্তন  এসেছে, আ্ঙ্গিকে বা ভাষায়? এলে সে বিষয়ে কিছু বলো।

  ১৯৮৬ সালে আমার প্রথম কবিতার বই ‘মানুষ হে’ প্রাকাশিত হয়। তারপর আমি আরও ১৪ খানি গ্রন্থ নির্মান করেছি। ঝালদার আঞ্চুলিক ভাষায় একটি, দুটি অনুবাদ গ্রন্থ। সমালোচকেরা হয়তো ঠিকই বলে, আমার প্রতিটি গ্রন্থ তোমার মনে হতেই পারে ভিন্ন ভিন্ন সুকুমারের লেখা। কারণ আমার ঘটনাবহুল জীবন, বৈচিত্র এবং উবুশ্রান্ত ভ্রমণ। আসলে এ এক অবিরল যাপনচিত্র, ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকায়, পটভূমিতে, আঙ্গিকে ও ব্যাঞ্জনায়। সিঁড়ির এক একটা ধাপ, লিখেছিলেন অরুণাভ, হবেও বা। তাহলে আমিও কি বদলেছি অনেকটা? সে সব তোমরা বলতে পারবে। তবে আমার প্রযত্ন সবসময় সরলতর হয়ে ওঠা। আরো স্বচ্ছ, ট্রান্সপারেন্ট, আরো বেশি অবিকল হয়ে ওঠা।

আসলে কি মনে হয় জানো অর্ঘ্য, একসময়  সরল হয়ে আসেই সারল্যই অন্তিম। অবশেষ উত্তরণ। এছাড়া যেন পরিত্রাণ নেই।

দীর্ঘবছর ধরে ‘খনন’  সম্পাদনা করে চলেছ– বহির্বঙ্গ থেকে খুব কম  বাংলা সাহিত্য পত্রিকা এতবছর ধরে নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে। একা হাতে কী করে অসাধ্য সাধন করলে?

—একা কেন? এখানেও অনেক সৃজনশীল মানুষজন আছেন। তারা সব আড্ডায় আসেন, কফিহাউসে গল্প হয়, বিদেশ থেকে, তোমার বহির্বঙ্গ থেকে কত সংবেদনশীল সুজনের পায়ের ধুলো পড়ে এই খনন সরণিতে। এমনি এমনিতে কিছু হয়ে ওঠে নাকি!

আমি শুধু একটু রাতজাগা দিই, একটু দৌড়ঝাপ করি। লেখকদের তাতিয়ে দিই, মারাঠি কবি সাহিত্যিকদের সঙ্গে ইনটারাক্ট করি। একটু ধৈর্য ধরো, একদিন হয়তো এক মলাটের মধ্যে খুঁজে পাবে বাদবাংলার একটি ক্ষুদ্র পত্রের গড়ে ওঠার রোজনামচা।

বহির্বঙ্গের কবি কবিতা চর্চা নিয়ে কিছু বলো। আবহমানের বাংলা কবিতায় তাদের কোনো অবদান কি আছে বা থাকবে?

— বাদবাংলার কবি ও কবিতা চর্চা নিয়ে বিভিন্ন কাগজপত্রে অনেকবার লিখতে হয়েছে। বলতে হয়েছে অনেক অনুষ্ঠানেও। হয়তো মারাঠায় থাকার কারণেই অথবা খননের মতো স্বতন্ত্র ক্যাননের কাগজ করি বলেই। তুমিও যখন জানতে চাইলেই তখন আবারও বলি শুধু কবিতা নয়, বাংলাভাষা ও সাহিত্য সেই আদ্যিকাল থেকেই বাদবাংলার প্রবাসী লেখার উৎকর্ষেই সম্পন্ন ও স্বরাট। তুমি মুম্বাই আছো অনেকদিন অথচ বাদবাংলার অবদান প্রসঙ্গে তোমার এই সংশয় আমাকে অবাক করলো। সবাই জানেন বাঙালি হৃদয় হলো কবির, নির্মাতার। সে যে মাটিতে পা রাখে সেখানেই উবুড় করে নেমে আসে তার শুভবোধ। তার কবিতা। তার লেখা। এইসব সুন্দর, এইসব নির্মাণ নিয়েই তো আমাদের আবহমান বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস। তাতে যেমন চিরভাস্বর সেদিনের বনফুল, কেদারনাথ, সঞ্জীবচন্দ্র, সতীনাথ, বিভূতিভূষণ, শরদিন্দু, জগদীশ, রাজলক্ষ্মী প্রমুখ তেমনি অপরিহার্য এ কালের কমল, মলয়, সুবিমল, বারীণ, রবীন্দ্র, অজিত, বাপী, কাজল, দীপঙ্কর, মন্দিরা আরও কতশত নাম। তোমার তো অজানা থাকার কথা নয়! ঢের হলো, আর প্রশ্ন নয়। বরং চলো একটু খানাপিনা করা যাক।

( বম্বেduck পত্রিকায় পূর্ব-প্রকাশিত )

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...