প্রেমপত্রের কালবদল
অগ্নি রায়

প্রেমপত্র হাতে ডাক পিওনের মতো হাঁটা শুরু আমার অকালশৈশবেই। তখন পেনে কালি ভরার রবিবার ছিল। আঙুল থেকে সেই কালি মুছতে দুপুরের মাংসভাত। মাসের শেষে পেস্ট ফুরিয়ে গেলে নুন তেল। দূরদর্শনে মুখ দেখাতে শুরু করেছে ভারতবর্ষ। শাদা কালোয় প্রতি বুধবার সন্ধ্যায় গোটা পাড়ায় প্রেম বিলিয়ে চলেছেন শ্রীমতি চিত্রহার।

তো, প্রেমপত্র হাতে আমার ডাকপিওনের মতো পথ চলার সেই তখনই শুরু। আমার অকালপক্ক দিদির হাতে গুঁজে দেওয়া মোটা একটি খাম (তাড়াহুড়োয় খাম না জুটলে ভাল করে ভাঁজ করে দেওয়া) নিয়ে। বাবার অফিস থেকে আনা বন্ড-কাগজে, কখনও ডায়েরির পাতা ছিঁড়ে। কিশোর যুবতীদের কাছে ডায়েরি ছিল এক মহার্ঘ্য মঞ্চ, তাকে যত্নে লুকিয়ে রাখা ছিল আর্ট বিশেষ।

সেই চিঠি হাতে আমি হাঁটতাম বাদাড়, ঝোপঝাড়, বাগান, পুকুর পাড়ের ধারের রাস্তা দিয়ে মালির মাঠের ধারে প্রেমাস্পদের হাতে (নাকি পত্রপিপাসু) তা তুলে দেওয়ার জন্য। এত যুগ পেরিয়ে আসার পর বলতে দ্বিধা নেই, এই যাত্রপথে অধীর কৌতুহলে সেই পত্রপাঠ কি করিনি কয়েকবার! কোনও নভেল বা সিনেমার চেয়ে অনেক বাস্তব, অনেক অর্গানিক ছিল সেই পাঠ প্রতিক্রিয়া, যা আমাকে সাহিত্যলেনের একটা অন্তত দরজা খুলে দিয়েছিল ওই কাঁচা বয়সে।

এ সেই আশির দশকের গোড়ার কথা যখন যোগাযোগ হাতের মুঠিতে নয়। একটি চিঠি (হাত) পাওয়ার জন্য অপেক্ষা নিরবধি। নিরাপদে সেই চিঠি প্রার্থিত হতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন ঘুষ দেওয়া নেওয়া। তা-ও যদি সে এক শহর বা কাছাকাছি পাড়া হয় তবেই। দুরত্বের প্রেমে যে কী পত্র-বিরহ তা ভাবলেও গায়ে কাঁটা দেয়! মধ্যবিত্ত রক্ষণশীলতা, গোপাল এবং গোপালী নামের সুবোধ বালক ও বালিকার সুনীতি চেতনা, পাড়ার নাগরিক কমিটি প্রণীত কোড অব কন্ডাক্টের সঙ্গে নিশিদিন এক গেরিলা যুদ্ধ লড়ে গিয়েছে সেই প্রেমপত্রগুলি। অক্ষরে যে কোনও পাপ থাকতে পারে না, প্রেম যে দুরন্ত এক্সপ্রেস — সেই অভিজ্ঞান পেতে তখনকার অভিভাবকদের কিছুটা দেরি। তবুও আটকানো যায়নি শহর, উপনগর, মফস্বল এবং গ্রামে গঞ্জের বাতাসে প্রজাপতির মতো উড়তে থাকা প্রেমপত্রদের।

সত্তর দশকের আগুনখোর সময়ে যার শুরু, আশির এক সার্বিক শান্তায়নের মাধ্যমে কিছুটা কি নিভে এসেছিল আঁচ? আমার সেই হন্টমান রুদ্ধশ্বাস পাঠ অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে সাধারণ নির্ণয় করা ঠিক হবে না। তবে সে সময়ের এই চিঠিগুলির মধ্যে লাজুক শ্বাস, ভীরুতা, দ্বিধা থাকলেও নির্ঘাত অবদমন ছিল। তখনও যৌনতা মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে উইং বরাবর ছুটছে মানস-বিদেশের মতো, কিন্তু গোল করতে পারছে না সমাজ ভট্টাচার্য অথবা নীতি বন্দ্যোপাধ্যায়দের অগ্নিচক্ষুকে এড়িয়ে। তাই ওই অবদমন চেলপার্কের নীল বা কালো হয়ে জড়িয়ে থাকত বন্ডের শাদায়।

আমি নিজে প্রথম প্রেমপত্র পাই বা লিখি স্বাভাবিকভাবেই আরও অনেক পরে। তবে তখনও যোগযোগ-প্রযুক্তি সেই তিমিরেই। সত্তর বা তারও আগে থেকে নব্বই ছোঁওয়া পর্যন্ত প্রেমপত্র আসত গরুর গাড়ির গতিতে। ভালবাসাও ছিল মন্থর, বিলম্বিত লয়ের। কোচিং ক্লাস বা টিউটোরিয়াল ছিল ড্রপ বক্স এবং টেক অ্যাওয়ে পয়েন্ট। কত বসন্তে, কত না গোধুলিবেলায় মোটা নোটবুক অথবা টেস্টপেপারের গর্ভ আলো করে থাকত সেই পরমপ্রার্থীত তিন বা চার পাতা কাগজ। মধ্যরাতে অল্প আলোয় বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর বারংবার তা পাঠের রোমহর্ষ যাঁর ঘটেছে তিনিই জানবেন তার মাধুর্য। গোপনীয়তা তার ভূষণ। কাঁচা আবেগ যার সর্বস্ব। কাছে থেকে দূর রচনার মনখারাপিয়া কোটেশন যার অলংকার। সে সময়কার এই আন্ডারগ্রাউন্ড কোটেশন-ঋদ্ধ চিঠিপত্রে একটা বড় জায়গা নিতেন কবিকূল। আজ যেমন প্রযুক্তি, তখন তেমন অনেকটাই সাহিত্য-নির্ভরতা ছিল প্রেম এবং তার কমিউনিকেশনে। ‘ভ্রু পল্লবে ডাক দিলে দেখা হবে চন্দনের বনে’, অথবা, ‘তোমায় বকবো আড়ালে’র মতো পংক্তিগুলি ছিল সুপার হিট। আর গীতবিতান তো এসব ক্ষেত্রে অলটাইম ব্লকবাস্টার!

চিঠিগুলির সম্বোধন এবং ইতি রচনাও বদলেছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। স্থান ও পাত্রের সঙ্গেও। শহরে এক তো মফস্বলে আর এক। উত্তরে এক তো দক্ষিণ ভিন্ন। অ্যম্বিশাসের এক, কাঠ বেকারের আলাদা। ‘প্রিয়তম’ এবং ‘প্রিয়তমা’র ব্যবহার কবে কমল  এবং কেন কমল তা সমাজতাত্ত্বিকের গবেষণার বিষয় হতে পারে। সম্ভবত পঞ্চাশ বা ষাটের পর সত্তর দশক এসে এই মধুর সম্বোধনের কাঁথায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। কমরেড তখন প্রিয়তমা। চুম্বন যখন ব্যারিকেড।

আসলে দেশভাগের রক্তপাতে যে যার মতো মলম সংস্থান করে ধীরে ধীরে লড়ে নিচ্ছেন নিরাপদ এক নিজস্ব ভুবন, সেই পঞ্চাশের দশক জুড়ে উত্তম-সুচিত্রা শাদা-কালো এক ম্যাজিকের কাজ করে। ‘তুমি যে আমার’ আর ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই’- এর পেলবতা আবেশের মতো ছুঁয়ে থাকত প্রেমপত্রেও। রেডিও তরঙ্গে অনুরোধের আসরে সময় মেলানো থাকত বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ানোর। সেই আবেশ ধীরে ধীরে কাটা ঘুড়ির মতো মিলিয়ে গিয়েছে পুরনো শহরের দিগন্তে।

এসেছে বনলতা সেন পড়া মোটা ফ্রেম, অপর্না সেন দেখা সফিস্টিকেশন, অমর্ত্য সেন নকল করা বই বাগিস মন। এসেছে ‘সুচরিতাষু’, ‘প্রিয়মন্য’। আবার কখনও সরাসরি ‘তোমাকে’। সম্পূর্ণ নাম বদলও কতই না। যে নামে বিশ্বচরাচর চেনে যে নামে বাপ মা ইস্কুল কলেজ পাড়া — সে সবের বাইরে একটি গভীর গোপন নাম, কানে দেওয়া বীজমন্ত্রের মতো। বাইরের নয়, শুধুমাত্র প্রেম চিঠিতেই যা থাকবে। ‘যদি নাম ধরে তারে ডাকি যেন সবুজ পাতার আগে সাড়া দেয়…’

এই সাড়া দেওয়ার প্যাটার্নও কি আর এক থাকে। সেই যে একটি স্কুটারের আবেদন করে বসে থাকার দিন, সেই যে প্রতিবেশী বাড়ি মাদুর পেতে একত্রে দেখা শিনাবেরের সিনেমার রাত, অন্যের বাড়ি টেলিফোন এলে ডাক, এই দীর্ঘমেয়াদী আশির দশক জুড়ে জেগে থাকা প্যাটার্নে একটি বড়সড় ঢিল মেরে গেল নব্বই। দিল্লিতে তখন ব্যাটিং শুরু করেছেন পিভি নরসিংহ রাও আর মনমোহন সিংহ। সমস্ত শহরগুলো বদলাতে শুরু করেছে একটু একটু করে। স্যাটেলাইট চ্যানেল আর মারুতি দেখা গিয়েছে ভাগ্যাকাশে। শাহরুখ খানকে দেখে একটু একটু করে ‘কুল’ হতে শিখছেন প্রেমিকরা। কাজলকে দেখে ক্রমশ সেনসুয়াস হচ্ছেন তাঁদের প্রেমিকারা। পাড়ায় পড়ায় ছত্রাকের মতো গজিয়ে উঠছে এসটিডি লেখা বুথ। প্রেমপত্র কিন্তু তখনও ঠিক হারাচ্ছে না, কিন্তু বদলে যাচ্ছে তার পারপাস এবং প্রাসঙ্গিকতা। যেটুকু কথা ফোনে বলা গেল না পিছনে বীনা কাকিমাদের ড্যাবডেবে চোখের সামনে অথবা পকেটে রেঁস্তোর অভাবে (চোখের সামনে যেখানে লালরংয়ের বাক্সে মিটার উঠছে মিনিটে মিনিটে), সেই কথাটুকু বলার জন্য রয়ে গেল চিঠি। তাতে কিছুটা এলো ডায়েরিধর্মীতা, কেজো কথা এবং অনেকটা স্বপ্ন। রুদ্ধ অবদমনও অনেকটা খুলে যেতে লাগল নব্বইয়ের প্রেমপত্রে। নির্ভুল বাংলা ইংরেজি লিখতে পারা ব্যক্তিদের চাহিদা তখন প্রেমবাজারে তুঙ্গে। এক প্যাকেট সিগারেট অথবা মোগলাইয়ের বদলে প্রেমপত্র লিখে দেওয়া হচ্ছে, এ তো হামেশাই ঘটত। একই ব্যক্তি, যাকে বলে মিউচুয়ালি এক্সক্লুসিভ ভাবে একই জুটির জন্য লিখছে — এমনটাও তো হয়েছে! অর্থাত সে নিজেই লিখছে, এবং নিজেই সেই চিঠির উত্তর দিচ্ছে!

ক্রমশ সুলভ হয়ে ওঠা ফোন বুথ চার্জ, পেজার, থান ইঁটের মতো মোটা আদি মোবাইল ফোন, মিসড কলের সঙ্গে লড়াই করেছে প্রেমপত্র গোটা নব্বই দশ জুড়ে। শুধু ওই বাড়তি মনের কথাটুকু বলার জন্য।

এরপর কী হইতে কী হইয়া গেল তা শ্যামলালেরা অর্থাত গত পনেরো বিশ বছরের ইতিহাস প্রাজ্ঞরা জানেন, নবীন প্রজন্মও গুগল ম্যাপিং-এ পেয়ে যাবেন। ওই বাড়তি মনের কথাটুকু, ওই সারপ্লাস ভাবনাটুকু যা মুখে বলা যায় না, তা অবশ্যই এখনও রয়েছে। কিন্তু তার প্রকাশ ক্রমশ সংকেতময় হয়ে উঠেছে স্মার্ট ফোনে। অসংখ্য ইমেজ, ইমোটিকন, সিম্বল মুড়ে সেই না-বলা বাণীর চালাচালি আজও ঘটে চলেছে। প্রেমপত্র মরছে না শুধু কাগজের ব্যবহারটাই উঠে গিয়েছে।সে তো ভালোই! একটি গাছের মৃত্যুতে খাতার কতগুলি পাতা হয়, সেই হিসাবটুকু মনে করলেই আর তো কোনও আফশোষ থাকে না!

6 Comments

  • Shyamali Sengupta

    Reply June 28, 2021 |

    দারুণ
    দারুণ
    ডাকপিওন এর পার্টটা বেশি ভালো।

  • রোশনি কুহু চক্রবর্ত্তী

    Reply June 28, 2021 |

    অপূর্ব ❤️

  • শমীক বসু

    Reply June 29, 2021 |

    অসাধারণ লাগলো, আসলে বদলে যাওয়া সময়ের কাব্য, খুব ভালো….

  • Sebanti Ghosh

    Reply June 29, 2021 |

    চমৎকার লেখা

  • Ela Bose

    Reply June 29, 2021 |

    দারুণ

  • Kaushik Sen

    Reply July 1, 2021 |

    অসম্ভব ভালো লেখা। পড়তে পড়তে সময়ের সাথে পা মেলালাম।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...