প্রাচীন সংস্কৃত শাস্ত্র ও সাহিত্যে কৃষি ও কৃষক প্রসঙ্গ : শিকড়ের অনুসন্ধান
ড. ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়


              
সাহিত্য সমাজের প্রতিচ্ছবি। সমাজ জীবনের বৃহত্তর ক্ষেত্র থেকে সাহিত্য তার উপাদান সংগ্রহ করে। সুপ্রাচীন কাল থেকে সামাজিক চিন্তা ভাবনা, রীতিনীতি, জীবনধারা  প্রতিফলিত হয়েছে সেই যুগে রচিত সাহিত্যে ও শাস্ত্রে।


ভারতবর্ষে কৃষির আদিমতম প্রমান নিঃসন্দেহে হরপ্পার শস্যাগার ধ্বংসাবশেষ। আর্য শব্দের মূলেও আছে অর্ ধাতু যার অর্থ চাষ করা।


ভারতে আর্যদের ইতিহাসের প্রধান উৎস বেদ, জনপ্রিয় ভারতীয় ধারণা অনুসারে বেদ অতি পবিত্র, সুপ্রাচীন সাহিত্য।  বেদ প্রথমে  ছিল শ্রুতি পরে তা লিখিত আকার পায়। রচনাকাল অনুসারে বৈদিক সাহিত্য কে দুভাগে ভাগ করা হয় –  আদি বৈদিক সাহিত্য  (খ্রিস্ট পূর্ব ১৫০০ অব্দ  থেকে খ্রিস্ট পূর্ব ১০০০  অব্দ) যে সময়ে ঋগ্বেদের অধিকাংশ স্তোত্র রচিত হয় এবং পরবর্তী বৈদিক সাহিত্য ( খ্রিস্ট পূর্ব  ১০০০  থেকে  ৬০০অব্দ)  যেখানে রয়েছে বাকি  বৈদিক সাহিত্য, স্মৃতি শাস্ত্র, বেদাঙ্গ, বেদান্ত , উপনিষদ ইত্যাদি।


আর্যরা ভারতে এসেছিলেন অর্ধ যাযাবর জনগোষ্ঠী হিসেবে। একদম সূচনায় তাঁরা ছিলেন শিকারী ও পশুপালক। বৈদিক কবিদের মন্ত্রগুলি তার প্রমাণ।  শুধু অলৌকিক শক্তি বা ভয়ানক প্রকৃতিকে দেব দেবী রূপে তাঁরা স্তব স্তুতি করেননি, বাসস্থান খাদ্য ও জীবন নির্বাহ নিয়েও মন্ত্র রচনা করেছেন। সর্বোপরি তাঁরা ছিলেন  অমৃতকামী ও জীবনরসের রসিক। তাঁরা উপলব্ধি করেছিলেন নিজেদের  স্থিতিশীলতার জন্য কৃষিই শ্রেষ্ঠ ও সম্মানজনক জীবিকা হতে পারে। ঋগ্বেদের দশম মন্ডলে অক্ষ সূত্রে এই মানসিকতার প্রমান পাওয়া যায়, পাশা খেলে যে ব্যক্তি সর্বস্বান্ত হয়েছে তাকে উপদেশ দিয়ে বলা হয়েছে
– অক্ষৈর্মা দীব্যঃ কৃষিমিৎ কৃষস্ব বিত্তে রমস্ব বহুমন্যমানঃ
তত্র গাবঃ কিতব তত্র ছায়া তন্মে বিচষ্টে সবিতায়ামর্যঃ।।
— হে দ্যূতকর পাশা খেলো না বরং কৃষিকর্ম করো তাতে যা লাভ হয়  তাই দিয়ে সন্তুষ্ট হও ও নিজেকে কৃতার্থ করো। তাতে পত্নী পাবে, গাভীও পাবে। এই যে প্রভু সূর্যদেব আমাকে একথা বিশেষ ভাবে  বলেছেন।


এই মন্ত্রের মধ্যে দিয়ে সামগ্রিক একটি সমাজচিত্র আমাদের চোখের সামনে ধরা দেয়, এক সচ্ছল কৃষকের  সাজানো সংসারের ছবি ফুটে ওঠে।


এই রকম কৃষিকেন্দ্রিক  এক একটি নিটোল পরিবার ছিল আর্য সমাজের মূল একক। এই সমাজের সংগঠন ছিল সুস্থ ও সাম্যভিত্তিক। ঋগ্বেদের আদিপর্বে যবের উল্লেখ আছে – পচ্যতে যবঃ ….। ভাজা যবের বহুবার উল্লেখ আছে। দুধ মেশানো রংবেরং সুস্বাদু খাবারের কথাও বলা আছে  কিন্তু ধানের উল্লেখ নেই। তবে ফসল কাটা, হবির জন্য পুরোডাশ তৈরির উল্লেখ ঋগ্বেদে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সক্তুমিব তিতউনা পুনন্তঃ ইত্যাদি ঋকে বলা হয়েছে উপলপ্রক্ষিণী নামে মহিলারা উদূখলে শস্য গুঁড়ো করে ছাতু বানাতেন। তবে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ   বিষয় হল ঋগ্বেদে চতুর্থ মন্ডলে চাষের জন্য প্রার্থনা মন্ত্র —  শুনং বাহাঃ শুনং নরঃ শুনং রুষতু  লাঙ্গলম্
এই মন্ত্রে বলা হয়েছে কৃষক, বলদ, লাঙ্গল, অষ্ট্রা অর্থাৎ গরু চালনার লাঠি  ও দড়াদড়ি সব যেন তাড়াতাড়ি কাজ করে। আশ্বলায়ন গৃহ্য সূত্রে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জমিতে হলকর্ষনের আগে এই মন্ত্র জপ করতে হবে অথবা উচ্চারণ করে হোম করতে হবে। সে সময় এই মন্ত্র  উচ্চারণ, জপ  বা হোম বিধি কোন বিশেষ ধর্মের ইঙ্গিত বহন করত না এগুলি তাদের প্রাত্যহিক কাজের মধ্যে পড়ত আর মন্ত্রপাঠ বা যাজ্ঞিক বিধি নিয়ে কেউ কারোর সাথে ঝগড়া  করত না। তবে গবাদি পশু দখল নিয়ে আর্যদের গোষ্ঠীগত লড়াই প্রায়ই হত, এই ধরণের গরু খোঁজার যুদ্ধের নাম ছিল গোবিষ্টি গোজিৎ, গবেষণা ইত্যাদি। এ সময় লাঙলের  নাম ছিল সীর, চাষযোগ্য জমিকে বলা হতো সিতা, শস্য কাটার কাস্তের নাম দাত্রে এবং জলচক্র ও ঘটিচক্রের সাহায্যে জলসেচ করা হতো। গরুকে বলা হতো গোধন, যে গোষ্ঠীর ছেলে গো চারণ করতো তাদের নাম ছিল গোত্র, গরু যাতে হারিয়ে না যায় সেজন্য  গরুর কানে সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করা হত।


প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম উভয় প্রকার জলসেচের ব্যবস্থা
ছিল —   খানিত্রিমা উতবা যাঃ স্বয়ংজাঃ…
খানিত্রিমা কৃত্রিম জলসচ ও স্বয়ংজা  প্রাকৃতিক
জলসচকে নির্দেশ করছে।


পরবর্তী সাম যজুঃ ও অথর্ব সংহিতার যুগে আর্যদের পারিবারিক বন্ধন আরো দৃঢ় হয়, তারা স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করে। এই সময় তাদের জীবনযাত্রায় অনেক পরিবর্তন দেখা দেয়। তাদের কাজের কেন্দ্রভূমি পঞ্জাব থেকে গঙ্গা যমুনার দোয়াব সহ উত্তরপ্রদেশের পশ্চিমাংশ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।


পশুচারণ অর্থনীতি প্রতি বর্গ মাইল জমিতে  যত সংখ্যক মানুষকে ভরণ-পোষণ দিতে পারে তার অন্ততঃ দশ গুণ লোককে জীবন দিতে পারে কৃষি, এই উপলব্ধি তাদের হয়েছিল। চাষবাস মূল জীবিকা হলেও বানিজ্য তাদের সহায়ক জীবিকা হয়েছিল। উত্তর কালের সংহিতা গুলিতে ব্যবসা বানিজ্যের ও বিশেষ উল্লেখ পাওয়া যায়। মোটামুটিভাবে বলা যায় ঋগ্বেদের পরবর্তী সময়ে সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে কৃষি ও বানিজ্যে অনেক বেশী সুবিন্যাস ও স্বাচ্ছল্য এসেছিল। সেই কারণেই আর্যরা উচ্চাঙ্গ শিল্প ও সঙ্গীতের সাধনায় আত্মস্থ হবার অবকাশ  পেয়েছিলেন। সামবেদের মধুর গান গুলি তার তুলনাহীন প্রমান। এই সামবেদের গানে  পূর্বার্চিকে ইন্দ্রের কাছে তাঁরা অন্নবল প্রার্থনা করেছেন তারও প্রমাণ পাওয়া —
ত্বামিদ্ধি হবামহে সাতৌ বাজস্য কারবঃ।


ঋগ্বেদের প্রথম দিকে ধানের প্রচলন না থাকলেও পরবর্তী কালে ধানই প্রধান শস্য রূপে পরিগণিত হয়    – বপন্তো বীজমিব ধান্যাকৃতঃ
কৃষিকাজ জলের উপর যেহেতু নির্ভরশীল  তাই দেবতাদের কাছে জল প্রার্থনা করে তাঁরা মন্ত্র উচ্চারণ করেছেন তার প্রচুর উদাহরণ পাওয়া যায়। অথর্ব বেদে এমন একটি অনুষ্ঠানের বর্ণনা পাওয়া যায়  যেখানে নদী থেকে জল নিয়ে চাষের জন্য নতুন খালে  ফেলা হচ্ছে। খরা বা অতিবৃষ্টি নিবারণের মন্ত্রও এখানে পাওয়া গেছে। ধান ও যবের সাথে মটরশুঁটি ও তিল চাষের বিশেষ উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। গবাদি পশু ছিল এই সময়ের অস্থাবর সম্পত্তি। কৃষি প্রধান জীবিকা ছিল বলে জমির উপর ব্যক্তিগত মালিকানার ধারণা এই সময় থেকে ক্রমশঃ দানা বাঁধতে থাকে। মনুসংহিতায় কৃষি কাজের গুরুত্ব, বীজ বপনের নিয়ম ও জমির গুণাগুণ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা ‌লিপিবদ্ধ আছে। রাজার আদর্শ  আবাসভূমি বলতে শস্যযুক্ত স্থান কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। মনুসংহিতার দশম অধ্যায়ে কৃষি প্রসঙ্গে মনুর একটি তুলনা অবশ্য পাঠকের শুভ বোধকে আহত করে, তিনি বলেছেন চাষ করার ক্ষেত্র যেন সন্তানের জননী আর তাঁর আইনসিদ্ধ পতি যেন ক্ষেত্রিন। পিতৃতন্ত্রের প্রবল সমর্থক শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত করলেন অক্ষেত্রে বীজ এবং বীজ ছাড়া ক্ষেত্র নিষ্ফল, সুক্ষেত্রে বীজ অধিক ফলন দেয় এবং সেই ক্ষেত্র বেশি প্রশংসনীয় – তস্মাৎ বীজং প্রশস্যতে। এছাড়া কৃষি পরাশর বইটি ও কৃষিভিত্তিক লোকবিজ্ঞানের ভালো একটি সংগ্রহ বলা যেতে পারে। শতপথ ব্রাহ্মণে লাঙল চালানোর সঙ্গে যুক্ত অনুষ্ঠান ও কৃষির নানা প্রক্রিয়ার  বিস্তৃত যে বিবরণ পাওয়া যায় তার থেকে কৃষকেরা সে সময় আনন্দের সঙ্গেই জীবিকা ও জীবনকে মিলিয়েছিলেন তা বোঝা যায়। ছয় আট বারো এমন কি চব্বিশ টি বলদ লাঙল টানছে এই তথ্য ইঙ্গিত করে যে তখন গভীর ভাবে মৃত্তিকা কর্ষণ করা হতো। লোহার প্রযুক্তি র উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গে লোহার যন্ত্রপাতি চাষের কাজে আর বন পরিষ্কারের কাজে ব্যবহার করা হত। চাষের জন্য বন পরিষ্কারে শাস্ত্রের অনুমোদন ছিল। তবে যুদ্ধে ঐ সমস্ত অস্ত্র ব্যবহার হত এমন কোন মন্ত্র পাওয়া যায় না। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে ব্যাকরণ প্রণেতা পানিনি লিখেছেন জমিতে দুই বা‌ তিন বার  লাঙল দেওয়া হত এবং উৎপন্ন শস্য অনুসারে জমির শ্রেণী বিভাগ করা হতো। ঐতিহাসিকেরা  বলেন যে  পরবর্তী বৈদিক যুগে চাষবাস ক্রমশঃ  উল্লেখজনক ভাবে বাড়তে থাকে ও বহু বসতি স্থাপন হয়। পাঁচশ পঞ্চাশটিরও বেশি প্রত্নস্থল থেকে উৎখনন  বা অনুসন্ধানের মধ্যে দিয়ে একধরনের কালো রঙের মসৃণ মৃৎপাত্র  আবিষ্কৃত হয়েছে  যা কৃষিসমৃদ্ধি ও বসতি বিস্তারের সূচক।


কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র ও মেগাস্থিনিসের ইন্ডিকা থেকে জানা যায় যে মৌর্য যুগে কৃষি ব্যবস্থা ও জলসেচ ব্যবস্থার উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। কৌটিল্য এই সময় রাজকীয় দায়িত্বের কথা বিশেষভাবে  উল্লেখ করেছেন। রাজকীয় সহায়তায় কৃষির জন্য ও প্রজাদের মঙ্গলের জন্য জলসেচ ও বাঁধ তৈরির যে উদ্যোগ তার বড়  প্রমাণ কাথিয়াবাড়ের সুদর্শন হ্রদ। কৃষির উন্নতি ও বিস্তার দেখাশোনা করার জন্য রাজা একজন কর্মচারী  নিয়োগ করেছিলেন তার উপাধি ছিল সীতাধ্যক্ষ। তবু ও দুর্ভাগ্যজনক ভাবে মৌর্য যুগে দুর্ভিক্ষ এড়ানো যায়নি।


উপনিষদের  সামাজিক পটভূমি বৈদিক সংহিতার, ব্রাহ্মণের ও স্মৃতি শাস্ত্রের  সামাজিক পটভূমি থেকে  অনেক আলাদা। এ সময় কৃষিপ্রধান গ্রামীন জীবনযাত্রার পাশে পাশে নাগরিক সভ্যতার সূচনা লক্ষ্য করা যায়। সমৃদ্ধ শালী হিন্দু সমাজ গড়ে উঠছে ও চার বর্ণের ভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে পার্থিব সমৃদ্ধি অন্যদিকে আধ্যাত্মিক চিন্তা দুয়ের চরম বিকাশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উপনিষদের ঋষিরা অমৃতের সাধনা করলেও  বাস্তবকে অস্বীকার করেন নি। সব উচ্চতর জিজ্ঞাসা ও মহত্তর সাধনার মূল এই স্থূল দেহ আর দেহের প্রাণশক্তির উৎস হল অন্ন,  খালি পেটে যে ধর্ম হয় না এই কঠিন সত্যকে  স্বীকার  করে উপনিষদের ঋষিরা  উচ্চারণ করেন
– – অন্নং বহু কুর্বীত। তদ্ ব্রতম্। পৃথিবী  বা অন্নম্।
অন্নং বর্ধিত করে পর্যাপ্ত কর। সেটা তোমার ব্রত। পৃথিবী অন্ন এবং আকাশ হল অন্নের ভোক্তা।    পরবর্তী বেদাঙ্গের যুগে কৃষি প্রধান জীবিকা হলেও বিভিন্ন জিনিসের ব্যাবসার উল্লেখ পাওয়া যায়। চাষবাসের ক্ষেত্রে নিজের জমিতে চাষ ও ভাগ চাষ দুরকমের ব্যবস্থা ছিল, কৃষির শস্য থেকে ভূমির মালিক কে তাঁরা  কর দিতেন এক ষষ্ঠাংশ‌।


এরপরে রামায়ন ও  মহাভারতের যুগ, অরণ্য ও কৃষি সভ্যতা এবং জনপদ ও অরণ্যজীবনের মিলনের যুগ। ভক্তিমূলক মহাকাব্য রামায়ণে বিশেষজ্ঞরা রূপকের ছায়া খুঁজে পেয়েছেন। রাম ও সীতা যেন দুটি শুধু নাম মাত্র নয়, অর্থবহ প্রতীক। রাম হলেন জলের দেবতা বা ইন্দ্র আর সীতা হলেন কর্ষিত ক্ষেত্রের প্রতীক। সীতা শব্দের অর্থ  লাঙল পদ্ধতি বা লাঙল রেখা। রাম ও সীতার সম্পর্ক জলের সঙ্গে কৃষির অপরিহার্য যোগাযোগের  ঈঙ্গিত বহন করে। কবিগুরু বলেছেন রাম হলেন কর্ষণ জীবি  সভ্যতার  ও  কৃষিজীবি মানুষের প্রতীক এবং রাবণ শোষণজীবি সভ্যতার প্রতীক।


রামায়ণের মতো মহাভারতেও  সমাজ ছিল কৃষিনির্ভর। দরিদ্র প্রজারা কৃষির জন্য রাজার কাছ থেকে বিনামূল্যে বীজ পেত, আর্থিক সাহায্য ও পেত প্রজাদের মধ্যে কৃষি ঋণ বিতরণের ব্যবস্থা ছিল। বিপন্ন প্রজার ঋণ মকুব করে দিতেন আদর্শ রাজা। শুধু কৃষি নয় গবাদি পশু ও তাদের বড় সম্পদ ছিল।
রামায়ণ ও মহাভারত উভয় যুগেই এক একটি গ্রামের চারপ্রান্তে কৃষির জমি বিস্তৃত ছিল। বৃষ্টির উপর নির্ভর করে যে চাষ হতো তাকে বলা হতো দেবমাতৃক আর জলসেচ করে  জমি সিঞ্চিত করে যখন চাষ করা হতো সেই চাষ কে বলা হতো অদেবমাতৃক। বৃষচালিত লাঙল ছিল একমাত্র ভূমি কর্ষণের যন্ত্র। তবে সে সময়কার জনসংখ্যার পক্ষে পর্যাপ্ত ফসল উৎপন্ন হত। কৃষি ও  পশুপালন ছাড়া কুটিরশিল্প ও বানিজ্যের উন্নতির ও প্রমান পাওয়া যায়।


মহাকাব্যের পর ভারতবর্ষের সামাজিক জীবনের ইতিহাস, রাজার বংশানুক্রমিক ইতিহাস ও  দেশের সাধারণ মানুষদের আচার আচরণের নিখুঁত দলিল হল পুরাণ সাহিত্য। মোটামুটিভাবে ২০০ খৃষ্টাব্দ থেকে ১০০০ খৃষ্টাব্দ এই পুরাণ গুলির রচনাকাল। এ যুগে  কৃষি  ও হস্তশিল্প  ছিল সাধারণ মানুষের জীবিকা। ব্যবসার ও প্রচলন ছিল। কৃষিজীবীরা রাজাকে রাজস্ব বা রেভিনিউ দিত আর ব্যবসায়ীরা কর বা ট্যাক্স দিত। তিল, চীনক, মাস, মসুর, চণক ছিল গ্রামের  উৎপাদিত ফসল আর প্রধান ফসল ছিল ধান।


পরবর্তী যুগে অর্থাৎ আলংকারিক বা অর্ণামেন্টেড মহাকাব্যের যুগে কালিদাস ছিলেন একক, অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও তুলনাবিহীন  কবি ও নাট্যকার। কালিদাস গুপ্তযুগের সমৃদ্ধি, সাচ্ছল্য, বিলাসিতা ও  সম্ভোগের যে রূপ দেখেছিলেন  সেই ছবি কাব্য ও নাটকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, একই সঙ্গে তপোবনের শান্ত পরিবেশে মুনি ঋষিদের জীবনচর্যাও  তাঁর কাব্য ও নাটকে জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে। এসময় রাজারা প্রজাদের কাছ থেকে উৎপন্ন শস্যের এক ষষ্ঠাংশ কর রূপে নিতেন। কিন্তু  মুনি ঋষিদের থেকে কোন কর নিতেন না কারণ তাঁরা মনে করতেন ঋষিরা   রাজার নামে যে যজ্ঞ করেন তার থেকে যে পুণ্য সঞ্চিত হয় তা পবিত্র ও অক্ষয়। সে সময় তপোবনে নীবার নামক এক ধরণের ধানের চাষ হত সেই ধানের বীজ পুঁতলেই ফসল হয় আর হলকর্ষন করতে হয় না, একে বলা হতো আরণ্য বীজ। রঘুবংশম কাব্যে কলম ধান ও  শালি ধানের উল্লেখ বিশেষ ভাবে লক্ষণীয়। ঐতিহাসিকেরা বলেন যে গুপ্তযুগে ও তার পরবর্তী কালে বলপূর্বক খাটানো বিষ্টি কর ও জবরদস্তি মূলক প্রণয় কর আদায় কৃষকদের অবস্থা শোচনীয় করে তোলে। ভূমিদান প্রথার ফলে চাষের জমি বর্ধিত ও বিস্তৃত হলেও  এর ফলে সামন্ত্রতন্ত্রের  সূচনা হয়  ক্রমে তার থেকে সামাজিক সংঘাতের সৃষ্টি হয়। সাহিত্য ও  শিল্পের দিক দিয়ে গুপ্তযুগ সুবর্ণ যুগ হলেও  ঐতিহাসিক ডি এন ঝা বলেছেন যে উচ্চবর্ণের মানুষেরা সুখে থাকলেও শ্রমজীবী মাঠে ঘাটে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ কষ্টেই দিন কাটাতো , উচ্চবর্ণের মানুষের জন্য ইতিহাসের সব যুগ ই স্বর্ণ যুগ আর আম জনতার জন্য কোনটাই নয়।


মনুসংহিতায় নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল চাষের মতো পরিশ্রমসাধ্য কাজ বৈশ্য ও শূদ্ররা করবে উচ্চবর্ণের মানুষেরা এই কাজ করবে না। তখন থেকেই উচ্চ ও নিম্ন বর্ণের মধ্যে একটা ভেদ তৈরি হয়ে যায়। পরবর্তী কালে তা ধীরে ধীরে ব্যাপক আকার পেতে থাকে।  আরো পরবর্তী কালের অর্বাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে, বাংলা , হিন্দি ও আঞ্চলিক সাহিত্যে আমরা শস্যের কারিগরদের মর্মযাপনের নানা ধরনের ছবি দেখতে পাই, স্বল্প পরিসরে তার রূপায়ন সম্ভব নয়।


তবে আমাদের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য বার বার তাদের সম্মানীয় অস্তিত্বের কথাই  স্মরণ করিয়ে দিয়েছে —
ইয়ং বৈ পূষা, ইয়ং হীদং সর্বং পূষ্যতি  যদিদং কিঞ্চ..
(বৃহদারণ্যক)
অর্থাৎ শ্রমজীবী মানুষ হল পূষা  বা জগৎ পোষক সূর্য কারণ তাবৎ জগৎ সংসারকে সে নিজে পোষণ করছে।  তাই সভ্যতা সংস্কৃতি ভরণ পোষণ পালনের হাল যাদের হাতে তাদের কথা প্রাচীন যুগের মানুষেরা  প্রথম থেকেই ভেবেছে, সমাদর ও করেছে।


পরিশেষে বলা যেতে পারে প্রাচীন সংস্কৃত শাস্ত্র ও সাহিত্যে কৃষি ও কৃষকের প্রসঙ্গ বিষয়ে এই  সংক্ষিপ্ত আলোচনা প্রাচীন ইতিহাসের পুনর্চর্চা বা শিকড়ের অনুসন্ধান বলা যেতে পারে। বাস্তবিকই অতীতের পুনর্মূল্যায়নের মধ্যে দিয়ে ই ভাবী নির্মান হয়ে ওঠে সুন্দর থেকে সুন্দরতর।  শুধু তাই নয় এই দেশের শস্যশ্যামলা মাটির সঙ্গে ও কৃষির সঙ্গে কৃষকের সম্পর্ক আত্মিক ও চিরায়ত তাই এই আলোচনা আজও সমান ভাবে প্রাসঙ্গিক।

1 Comment

  • Dr. Mahua Bandhu (Chatterjee)

    Reply March 20, 2021 |

    অনবদ্য অন্বেষণ…..অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক প্রবন্ধ। বিনম্র শ্রদ্ধা ও অনেক ধন্যবাদ জানাই ড. ইন্দ্রানী বন্দোপাধ্যায় মহাশয়াকে।।🙏

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...