প্রতিবিম্ব
ভাস্বর জ্যোতি ঘোষ

আমার বক্সিং এ আসাটা আসলে একটা দুর্ঘটনা। বাবার চাকরির সুবাদে, মোটামুটি পয়সাওয়ালা বাড়ির ছেলে ছিলাম। আমার বাবা বাঙালি আর মা ছিলেন পাঞ্জাবি। যদিও, আমার মার কথাবার্তায় সেটা একদমই ধরা যেত না। শরীরে পাঞ্জাবি রক্ত ছিল বলেই বোধহয়, গড়পড়তা বাঙালি ছেলের থেকে আমার উচ্চতা, শক্তি এবং সাহস তিনটিই বেশি ছিল। ভয় ব্যাপারটাই আমার মধ্যে তেমন একটা ছিল না। আমার থেকে বয়সে বড় ছেলেদের সাথে আমি প্রায়ই মারপিটে জড়িয়ে পড়তাম। মারপিটের প্রতি আমার একটা স্বভাবিক আকর্ষণ ছিল।

 তখন আমি ক্লাস টেনে পড়ি, বাংলা টিউশন থেকে ফিরছিলাম। আমার সঙ্গে ছিল হিয়া। মুকুল ফার্মেসির পেছনটা দিয়ে শর্টকাট হয়। আমি জানতাম না, ঐ রাস্তাটার পাশেই শংকরের ঠেক। বাইশ তেইশ বছরের শংকর তখন উঠতি মস্তান। আমাদের দেখেই ঠেক থেকে বেরিয়ে এসেছিল। ‘বাঃ! মালটা তো হেভি’ বলেই, হিয়ার হাত ধরে টান দিয়েছিল। সঙ্গে কিছু অশ্লীল কটুক্তি। টেনে নিয়ে যেতে চেয়েছিল নিজেদের আড্ডাঘরে। আমি ব্যাপারটা সহ্য করতে পারিনি। আমার ডানহাতটা সোজা চালিয়ে দিয়েছিলাম। একটা হাতুড়ির মত আমার ঘুঁষিটা গিয়ে পড়েছিল ওর চোয়ালে। রাস্তায় ছিটকে পড়েছিল শংকর। শংকর দুর্বল মানুষ নয়। রীতিমত জিম করা চেহারা। বিস্ময়ের প্রথম ধাক্কাটা কাটতেই ও উঠে দাঁড়ায়। ‘শুয়োরের বাচ্চা’,  বলেই ওর ডান পাটা আমার মাথা লক্ষ্য করে চালিয়ে দেয়। কেউ আমায় শেখায়নি, কিন্তু চকিতে ডাক করে, এক স্টেপ এগিয়ে আমি শংকরের শরীরের কাছে পৌঁছে যাই। বাঁ হাতটা মুখের সামনে গার্ড রেখে আমার ডান হাত পরপর দুবার আছড়ে পড়ে ওর চোয়ালে। ওর লাথিটা আমি পুরোপুরি এড়াতে পারিনি, ডান ভুরুর উপরটা কেটে গেছিল। আমি ভ্রুক্ষেপ করিনি। আমার সহ্য ক্ষমতা আর পাঁচজনের তুলনায় খানিকটা বেশিই ছিল। ঘুষি খাওয়ার পরে, শংকরের ওঠার ক্ষমতা ছিল না। সম্ভবত একটা দাঁত ভেঙে গেছিল ওর। হিয়ার চিৎকারে, লোকজন ছুটে এসেছিল।  কেউ পুলিশে ফোন করেছিল। পুলিশ এসে শংকরকে তুলে নিয়ে যায়। আমাকেও নিয়ে গেছিল। কিন্তু আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ না লিখেই পুলিশ আমাকে থানা থেকে ছেড়ে দেয়। আমার ধারণা, বাবা এই ব্যাপারে নিজস্ব কোন প্রভাব খাটিয়ে থাকবেন। আমি যে পালিয়ে আসিনি, এই ব্যাপারটায় আমার বাবা মা দুজনেই খুব খুশি হয়েছিলেন। সেইদিন রাতেই, ডি’মেলো স্যর আমাদের বাড়িতে আসেন। অ্যান্থনি ডি’মেলো, বিখ্যাত বক্সিং কোচ। ওনার নিজের একটা বক্সিং কোচিং সেন্টার আছে। দীর্ঘদিন এই লাইনে আছেন উনি। প্রচুর বক্সার তৈরি করেছেন। ব্যান্টামওয়েট আর লাইট হেভিওয়েটে দুজন ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন ওনার হাত থেকে বেরিয়েছে। এটা ওনার একটা ভীষণ গর্বের জায়গা ছিল। বোধহয় এইদিকে কোন কাজে এসেছিলেন। বাবার সঙ্গে কথা বলে উনি আমার ঘরে ঢোকেন। ওনাকে দেখে আমি উঠে দাঁড়াই। ‘ইউ আর আ ন্যাচারাল বক্সার, বয়। মিট মি টুমরো ইন মাই কোচিং।’ আমার পিঠে আলতো করে চাপ দিয়ে উনি বেরিয়ে যান। এর একমাস পড়েই আমরা ফ্ল্যাট চেঞ্জ করি। ক্ষীরোদাসুন্দরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের হিয়ার সাথে আমার আর দেখা হয়নি। 

 স্টেট লেভেলে মোটামুটি নাম হয় আমার। কিন্তু ন্যাশনাল লড়তে গিয়ে টের পাই, আয়্যাম নট আ চ্যাম্পিয়ন মেটেরিয়াল। ধীরে ধীরে বক্সিং থেকে আমার উৎসাহ ক্রমশ কমে আসতে থাকে।  সি.এ পড়তে শুরু করে আমি বক্সিং ছেড়ে দিই। ডি’মেলো স্যর, আমার কোচ, খুবই দুঃখ পেয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘মোহিত, দেশে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট অনেক আছে, অনেক হবেও। ভালো বক্সার কিন্তু হাতে গোনা। তোমার ফুটওয়ার্ক তো চমৎকার। চেষ্টা করলে, অ্যাট লিস্ট এশিয়ান গেমস লেভেল পর্যন্ত তুমি উঠতে পারতে। আ বক্সার শুড’ন্ট লীভ রিং লাইক দ্যাট।’ কিন্তু একটা ন্যাশনাল মিটে, কোয়ার্টার ফাইনালে  হরিয়ানার মনিন্দার সিং এর কাছে পয়েন্টে হেরে যাওয়ার পরেই বুঝতে পারি বক্সিং ইজ নট মাই কাপ অফ টি। আসলে আমার বাঁ দিকটা দুর্বল। আর আমি অনেক চেষ্টা করেও এই দুর্বলতাকে কাটিয়ে উঠতে পারিনি। আমার স্পারিং পার্টনার কুমুদ আমার বলতো, ‘আচ্ছা, মোহিতদা তুমি সবসময় ডান পাটা আগে ফেলো কেন বলত? শুধু রিঙে না, এমনিতেও।’ এটাই কিড়আমার দুর্বলতা ? কে জানে হতেও পারে। আমি লক্ষ করে দেখেছি, আমার ডান পাটাই সবসময় আগে পড়ে। মনিন্দার এশিয়ান গেমসে লাইটওয়েটে সিলভার মেডেলিস্ট। আমি যথেষ্ট লড়েছিলাম। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। আমার বক্সিং এ ক্যারিয়ার তৈরির চেষ্টায় ওখানেই ইতি।

 আমার বাবা ছিলেন মিনিস্ট্রি অফ কমার্সের উচ্চপদস্থ আধিকারিক, ক্ষমতাবান মানুষ। তাই সি.এ পাশ করার পর পরই বাবার সুপারিশেই একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি পেয়ে যাই আমি। ভালো চাকরি, মাইনে পত্র আর পার্কস মিলিয়ে আমার উপার্জন যথেষ্টই ভালো। বাবা এখন দিল্লীতে পোস্টেড, মাও সেখানে। সুতরাং কলকাতার ফ্ল্যাটে আমি এখন সম্পূর্ণ স্বাধীন। ঠাকুর্দার আমলের পুরোন ফ্ল্যাটটা বিক্রি করে,  বাবা এই আধুনিক ফ্ল্যাটটা কিনেছিলেন। ওই ফ্ল্যাট যখন ছেড়ে আসি আমার বয়স তখন পনেরো। এখন আমার বয়স ছাব্বিশ। এগারো বছর আগে ছেড়ে আসা ওই ফ্ল্যাটটা মাঝে মাঝেই কেন যে আমার স্মৃতিতে ঝলক দিয়ে ওঠে, ঠিক বুঝতে পারি না। যদিও  ফ্ল্যাটটা নিয়ে কোনরকম নস্ট্যালজিয়া আমার মধ্যে কাজ করে না। আমি নিয়মিত জিম করি। অফিস, আড্ডা, মাঝে মাঝে পার্টি, আর পরিমিত মদ্যপান। নিয়ন্ত্রিত জীবন আমার। বেশ ভালো আছি আমি এখন। বক্সিং ছেড়ে দেওয়ার জন্য আমার তেমন কোন আফশোস নেই। তবে হ্যাঁ, ডি’মেলো স্যারের কথা আমার মাঝে মাঝে মনে পড়ে। খুব ভালোবাসতেন উনি আমায়। ‘ট্রাই টু ইমপ্রুভ ইয়োর লেফট।’ স্যরের কথাটা আমার এখনও মনে আছে। চাকরিতে মোটামুটি একটা দায়িত্বশীল পদে আছি। দায়িত্ব আছে বটে, তবে তেমন একটা চাপও আমার নেই। মহিলাদের বিষয়ে আমি এখনও তেমন কোন উৎসাহ বোধ করিনা। তবে হিয়ার মুখটা এত বছর পরেও আমি স্পষ্ট মনে করতে পারি। বিশেষ করে ওর ডান চিবুকের নিচের কালো তিলটা আর বাঁদিকে সিঁথিকাটা চুল। ব্যাপারটা আমাকে যথেষ্টই অবাক করে।

 দিনটা ছিল শুক্রবার। আমার সিনিয়ার বিক্রমের বাড়িতে একটা পার্টি ছিল। উইক এন্ড পার্টি বলা যায়। পরদিন সেকেন্ড স্যাটারডে। অফিস ছুটি। বিক্রমের নেপালী কুকের স্পেশাল কাবাব আর সঙ্গে খাঁটি স্কচ। বিক্রমের এই উইক এন্ড পার্টি আমি সত্যিই খুব এনজয় করি।  আমি আর বিক্রমই এখানে ব্যাচেলার। সুতরাং একটু লেট হলেও আমার কারো কাছে কোন জবাবদিহি করার নেই। তাই অন্যরা দশটা নাগাদ চলে যাওয়ার পরেও আমি খানিক্ষণ আড্ডা দিলাম বিক্রমের সাথে। সাড়ে দশটা নাগাদ শেষ পেগটা নামিয়ে রেখে বললাম, ‘চলিরে বিক্রম। গাড়ি আনিনি। ট্যাক্সি ধরতে হবে।’ ‘পি.সি.সরকারের বাড়ির সামনে থেকে ট্যাক্সি নাহলে অ্যাপ ক্যাব পেয়ে যাবি।’ বিক্রম বলে। আমি হেসে বলি, ‘আমি নতুন আসছি নাকি এখানে?’ রাস্তা একদম শুনশান। ম্যাকিনটোশ বার্নের সমনে থেকে সুইনহো স্ট্রীটে ঢোকার মুখেই লোকটা যেন হঠাৎ মাটি ফুঁড়ে আমার সামনে উঠে এল। ছ’ফুট লম্বা। পেটানো চেহারা। হাতে ছুরি দেখেই ওর উদ্দেশ্য বুঝতে অসুবিধা হলনা আমার। ‘বটুয়া নিকাল।’ ফ্যাসফেসে গলায় বলে লোকটা। লোকটা আমার থেকে এক দেড় ইঞ্চি লম্বা হবে। ‘জলদি’। ছুরিটা বাগিয়ে ধ’রে লোকটা হিসহিস করে। আমার মাথার মধ্যে কে যেন বলে ওঠে, ‘ইউ ফুল! ইউজ ইয়োর লেফট।’ ডি’মেলো স্যরের গলা। আমি চকিতে শরীরটা একটু ডানদিকে হেলিয়ে দি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে, আমার দিকে ঝুঁকে পড়া লোকটার চোয়ালে একটা পারফেক্ট লেফট হুক আছড়ে পড়ে।  আমার শরীরের পুরো ওজনটা ওই পাঞ্চের মধ্যে ছিল। ঘুঁসির প্রতিক্রিয়ায় আমার কাঁধ পর্যন্ত ঝনঝন করে ওঠে। লোকটা একটা কাটা কলাগাছের মত আছড়ে পড়ে। ছুরিটা ছিটকে যায় ওত হাত থেকে। ইট’স আ নকআউট পাঞ্চ। আমি প্রচন্ড অবাক হয়ে যাই। সারা বক্সিং কেরিয়ারে এত ভাল একটা লেফট হুক মারতে পারিনি আমি। আজ ফ্লয়েড প্যাটারসনের মত পারফেক্ট লেফট হুক মেরে আমি নিজেই স্তম্ভিত হয়ে যাই।

 আমার নিজের মধ্যে একটা পরিবর্তন টের পেতে থাকি। আমার বাঁ দিকটা ক্রমশ সচল হয়ে উঠছে। আমি এখন বাঁ হাত দিয়ে ডানদিকে সিঁথি করি। বাঁ হাতে চামচ ধরে খাই। অফিসে, তানিয়া কিছু ভাউচার সই করাতে এনেছিল। সই করে দেবার পরে তাকিয়ে দেখি তানিয়া আমার দিকে অপলকে তাকিয়ে আছে। ওর চোখে অবিশ্বাস। ‘কী হ’ল তানিয়া, কী দেখছিস আমার দিকে?’ ভাউচার গুলো তুলতে তুলতে তানিয়া বলে, ‘তুমি বাঁ হাতে কবে থেকে সই করো মোহিতদা?’ ওর চোখ থেকে বিস্ময়ের রেখাটা তখনও মিলায়নি। ‘আমি দুহাতেই লিখতে পারি। তোকে কেমন সারপ্রাইজ দিলাম বল?’ হেসে ব্যাপারটা লঘু করার চেষ্টা করি আমি। আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে তানিয়া বলে, ‘দেয়ার মাস্ট বি সামথিং রং। তুমি আজকাল ডানদিকে সিঁথি করো। বাঁ হাতে চামচ নাও। ডান হাতে ঘড়ি পরো। ইউ অ্যাকচুয়ালি লুক লাইক ইয়োর মিরর ইমেজ।’  আমাকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে তানিয়া চলে যায়। মিরর ইমেজ – কথাটা আমিও ভাবি।

 একদিন অফিস যাবার আগে, ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছি। চোখে পড়ে পেছনের ওয়াল ক্যালেন্ডারটা। হঠাৎ লক্ষ্য করে দেখি, ক্যালেন্ডারের তারিখটা আমি পড়তে পারছি। মানে ওটা সোজা ভাবেই আছে। মিরর ইমেজ নয়। আমি ভয়ানক চমকে উঠি। এ কী অস্বাভাবিক ব্যাপার! আমি মাথাটা ঘুরিয়ে ক্যালেন্ডারটার দিকে তাকাই। না, ওটাতো ঠিকভাবেই লাগানো আছে। তাহলে? আমি কী ভুল দেখলাম! আমি আবার আয়নার দিকে তাকালাম। নাঃ ঐ তো ক্যালেন্ডারটা দেখতে পাচ্ছি। মিরর ইমেজ নয়! আমি আয়নার দিকে মুখ করে একপা, একপা করে পেছোতে থাকি। আয়নার ভেতরের আমিও আমার সাথে সাথে পেছোতে থাকে। আমি দেওয়ালের কাছে আসতেই, আয়নার ভেতরের দেওয়ালের গায়ের একটা দরজা খুট করে খুলে আয়নার আমি অদৃশ্য হয়ে যায়। আয়নায় এই মুহূর্তে আমার কোন প্রতিচ্ছবি নেই। আর আয়নার ফাঁকা ঘরটাও এই ঘরটা নয়! খুব পরিচিত, অথচ অচেনা! আমার শরীরের সমস্ত রোমকূপ খাড়া হয়ে যায়। আতঙ্কের একটা হিম স্রোত আমার মেরুদন্ডের মধ্যে দিয়ে নেমে যায়। আজকাল মাঝে মাঝে কম্পিউটার বা অন্য কোনো লেখা আমার সামনে মিরর ইমেজ হয়েই আসে। আমার ভয় লাগতে থাকে। আয়নার ওপারের মানুষটাকেই আসল আমি বলে কখনো কখনো মনে হয় আমার। সত্যি বলতে কী, আজকাল আয়না দেখতে আমার ভয় লাগে। আজকাল আমি আয়না ব্যবহার করা ছেড়ে দিয়েছি। নিজেকে নিজেরই প্রতিবিম্ব মনে হয় আজকাল। আমার ডানদিকের ভুরুর ওপরের কাটা জায়গাটা মাঝে মাঝে চিন্‌ চিন্‌ করে। একদিন সকালে টের পাই আমার কাটা দাগটা স্থান পরিবর্তন করেছে। চিন্‌চিনানিটা এখন আমার বাঁ ভুরুর ওপরে। টেবলে আমার নাম লেখা একটা ব্রাস প্লেট আছে। ওর সামনে সানগ্লাসটা রেখেছিল নির্মল। সানগ্লাসের কাঁচে প্রতিবিম্ব ভেসে ওঠে ডান দিক থেকে বাঁ দিকে মোহিত . . .  আমি হিম হয়ে যাই। চোখ বুঁজে ফেলি। আমি ঘর থেকে আয়না সরিয়ে দিয়েছি।

 গতরাতে হিয়াকে দেখতে পেলাম। আয়না থেকে বেরিয়ে সোজা আমার দিকে এগিয়ে এলো। এই হিয়াকে আমি চিনি না। এর চিবুকের বাঁদিকে তিল, আর সিঁথি ডানদিকে। শাড়ির আঁচল ডানদিকে, আর তাতে একটা ছোট্ট ব্রাস প্লেট, ডান দিক থেকে বাঁদিকে লেখা – হিয়া! ঘুম ভেঙে যায় আমার। ঘরে এসি চলছে, তাও আমি ঘেমে জল হয়ে গেছি। আচ্ছা আমি কি মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছি?

 আজ অফিস থেকে বেশ একটু তাড়াতাড়িই বেরিয়েছি। ভালো লাগছিল না কাজ করতে।  পার্কিং লট থেকে গাড়িটা বের করে বাড়ির দিকে রওনা হই।  খেয়াল পড়ে, কিছু জিনিস কেনার আছে। হরাইজন মলের সামনে গাড়িটা পার্ক করি। শেভিং ফোম, দুটো বিস্কিটের প্যাকেট আর এক কিলো ডিটারজেন্ট পাউডার কিনে আমি যখন মল থেকে বেরোলাম, ঘড়িতে দেখলাম, বিকেল সাড়ে তিনটে। কপালগুণে রাস্তাঘাটও একেবারে শুনশান। আমি অবাক হলেও গাড়ি চালিয়ে দিব্যি আরাম লাগছে দেখে ব্যাপারটা আর মনের মধ্যে থাকে না। জানলা দিয়ে বাইরে তাকাই আমি। এখন মে মাস, অথচ কোথা থেকে যেন ঝিরঝিরে একটা ঠান্ডা হাওয়া ভেসে আসছে। ঠান্ডা হাওয়ায় ঝিমুনি এসে যায় আমার। খনিকক্ষণ যাওয়ার পরেই বুঝতে পারি গাড়ি এখন আমার বশে নেই। এ রাস্তা সম্পূর্ণ আমার অপরিচিত। মে মাস, এসিও চলছে না। কিন্তু আমার শীত শীত করতে থাকে। সামনে গাঢ় কুয়াসা দেখে আমি গাড়ি থামাতে বাধ্য হই। মে মাসে কুয়াসা! থামানোর পরে আমি আবার গাড়িটা স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু গাড়ি আর স্টার্ট নেয় না। একটা প্রবল অস্বস্তি বোধ হতে থাকে আমার। এখন কুয়াসা আর নেই। ঠান্ডা ভাবটাও কেটে গেছে। ভ্যাপসা গরমের সাথে সাথে জামার ভেতরে গড়িয়ে নামা ঘামের একটা চটচটে অনুভূতি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠি আমি! একি! ঘড়িতে এখনও সাড়ে তিনটেই বাজে! আমি বাধ্য হয়ে গাড়ি থেকে নেমে আসি। কী আশ্চর্য ব্যাপার! আশেপাশে একটা লোকও নেই যাকে কিছু জিজ্ঞাসা করা যায়।

 কীভাবে রাস্তা ভুল হল আমার? ভুল জায়গায় এসে পড়লাম কীভাবে? প্রচন্ড অবাক লাগতে থাকে। আরে, কী আশ্চর্য, জায়গাটা খুব চেনে চেনা ঠেকছে, অথচ আমি মনে করতে পারছি না কেন? নিজের বাড়ির ঠিকানাটা মনে করার চেষ্টা করি আমি। যাক এটা অন্তত মনে আছে। আমি এতক্ষনে খানিকটা নিশ্চিন্ত হলাম। যাক, একটা ট্যাক্সি নিয়ে নিলেই হবে। আর গ্যারেজে ফোন করে দিলে, ওরাই গাড়িটা সরানোর ব্যবস্থা করবে। একটু এগোলেই মামার চায়ের দোকানের সামনে থেকে ট্যাক্সি পাওয়া যাবে। এটাও অদ্ভুত লাগতে থেকে আমার। মামার চায়ের দোকান মনে পড়ছে, অথচ জায়গাটা যে কোথায় সেটা কেন মনে পড়ছে না! একটা প্রবল অস্বস্তি খোঁচাতে থাকে আমাকে। ধুত্তোর! আশেপাশে তাকিয়ে কাউকে দেখতেও পাচ্ছি না, যাকে কিছু জিজ্ঞাসা করা যায়।  মরুকগে, হাঁটতে থাকি আমি। ঐতো মামার চায়ের দোকান দেখা যাচ্ছে। দোকান পর্যন্ত পোঁছোবার আগেই একটা হলুদ ট্যাক্সিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌছোনোটা খুব জরুরি। দ্রুত পায়ে এগোতে থাকি। আমি ট্যাক্সির কাছে পৌঁছোতেই ড্রাইভার দরজাটা খুলে দেয়। তাজ্জব! ট্যাক্সি ড্রাইভার কি আমার জন্যই অপেক্ষা করছিল নাকি? আমার দারুণ বিস্ময় বোধ হতে থাকে। আমি আমার গন্তব্য বলার আগেই ট্যাক্সি ড্রাইভার মিটার ডাউন করে। মিটার ডাউন করার টিং টিং শব্দটা অদ্ভুত এক বিভ্রম সৃষ্টি করে আমার মাথায়। এই রকম মিটার ট্যাক্সি, এখনও আছে নাকি? কয়েকটা মুহূর্ত মাত্র। আমি আমার ফ্ল্যাটের সামনে পৌঁছে গেছি। ‘আটত্রিশ টাকা।’ ট্যাক্সি ড্রাইভার জানায়। এই  ‘আটত্রিশ টাকা।’ কথাটা আমার মাথা মধ্যে ঢুকে যায়। সংখ্যাটাকে খুব চেনা চেনা লাগে। ভাড়া মিটিয়ে গেট খুলে ঠিক বারো পা হেঁটে আমি ফ্ল্যাটের সিঁড়ির সামনে পৌঁছোই। ফার্স্ট ফ্লোরে ফ্ল্যাট। ফলে লিফট ব্যাবহারের প্রশ্নই ওঠেনা। ফ্ল্যাটের সদর দরজাটা ভেজানো ছিল। ভেতরে ঢুকে আমি সোফায় রিল্যাক্স করে বসে, সামনের সেন্টার টেব্‌লে হাতের প্যাকেটটা রেখে, বাঁদিকে, বেডরুমে ঢুকি। এ কী, আমার বেডরুম তো ডানদিকে! আমার ভুরু কুঁচকে ওঠে। ওয়াল ক্লকটার দিকে তাকিয়ে দেখি এখনও সাড়ে তিনটে বাজে। বিদ্যুৎ চমকের মতো মনে পড়ে যায়, এটা তো আমার এখনকার ফ্ল্যাট নয়। এই ফ্ল্যাট আজ থেকে এগারো বছর আগে আমি ছেড়ে গেছি। আর হ্যাঁ, আটত্রিশ টাকা ট্যাক্সি ভাড়া দিয়েই বাবার সাথে মাঝে মাঝে আমি মামার দোকান থেকে এখানে আসতাম। এই সেই আয়নার ঘরটা! আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই! বাইরে সিঁড়িতে একটা পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। আমার সামনে এক অনন্ত দর্পণ। দর্পণে  কোন প্রতিবিম্ব নেই।  না, একটা নয়! দুটো পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। আমি নিশ্চিত দ্বিতীয় পদক্ষেপটি কোন মহিলার। মোহিত বাড়ি ফিরে আসছে। সঙ্গে কে? তবে কি আরো একটি প্রতিবিম্ব? বাম চিবুকে তিল? আমি শ্বাস বন্ধ করে প্রতীক্ষা করতে থাকি, ঘরে ঢোকার সময় ওর কোন পাটা আগে পড়ে!

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...