পত্রের আলোয় কবি জন কীটস
সুমনা সাহা

শীতের আমেজ ভরা এক সকাল। অষ্টাদশ শতাব্দীর ‘লন্ডন টাইমস’-এ প্রকাশিত হল একটি ছোট্ট শোকসংবাদ—“বন্ধুগণ! দয়া করে অবহিত হবেন, লুইস লিন্ডনের স্ত্রী, ফ্রান্সিস লিন্ডন, ৩৪ কোলশিল স্ট্রীট, ইটন স্কোয়ারের বাড়িতে তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।” সময়টা ১৮৬৫ সালের ৮ই ডিসেম্বর। ৬৫ বছরের ফ্রান্সিস রেখে গেছেন তাঁর বড় ছেলে, সরকারি কর্মচারী, ৩১ বছরের এডমন্ড, মেজ ছেলে ২৭ বছরের হারবার্ট এবং কনিষ্ঠতমা ২১ বছরের কন্যা মার্গারেট।
শেষকৃত্যের যাবতীয় কর্তব্য চুকেবুকে গেলে মেজছেলে হারবার্ট মায়ের ওক কাঠের কারুকাজ করা ছোট সিন্দুকখানা খুলে বসল। সেখানে বড় যত্নে, থরে থরে রাখা আছে কতগুলো চিঠি, প্রায় ডজন তিনেক তো হবেই, মা-কে সেগুলো নিয়ে নিভৃতে পরম মমতায় নাড়াচাড়া করতে সে দেখেছে। কিন্তু এখনও সময় হয়নি, স্মৃতিরা থাকুক বাক্সবন্দী, নিষেধ আছে মায়ের।
বিখ্যাত কবি জন কীটস-এর সঙ্গে মায়ের কিশোরীবেলার বন্ধুত্বের কথা তারা কতবার মায়ের মুখেই শুনেছে। মা দেখিয়েছেন কবির লেখা চিঠি, উপহার দেওয়া বই, কিন্তু সংসারে অবাঞ্ছিত অশান্তির ভয়ে ফ্রান্সিস ছেলেমেয়েদের স্পষ্ট বলে রেখেছিলেন, “এসব কথা বাবা যেন কোনদিন ঘুণাক্ষরেও জানতে না পারেন!” সেই সুগন্ধী অতীত তিনি আগলে রেখেছিলেন যক্ষিণীর মত। মা চলে গেলেও বাবা যে রয়েছেন! তাঁকে অপ্রত্যাশিত আঘাত দিয়ে ছেলেমেয়েরা মায়ের নিষেধের অমর্যাদা করতে পারেনি। ফ্রান্সিসের মৃত্যুর সাত বছর পরে, ১৮৭২ সালে লিন্ডনেরও শেষ পরোয়ানা এসে গেল। এবার অতীতের ঝাঁপি খোলবার পালা। মায়ের ‘প্রেমের বেলা’-র সাক্ষী হতে পুত্রকন্যারা একান্তে সমবেত হল! ‘দেখিলাম খানকয় পুরাতন চিঠি, স্নেহমুগ্ধ জীবনের চিহ্ন দু’চারটি, স্মৃতির খেলনা-কটি বহু যত্ন করে, গোপনে সঞ্চয় করি রেখেছিলে যারে।’১

আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগের কথা, ১৮১৮ সালের ইংল্যান্ড। ধনী বন্ধু চার্লস ব্রনের ওয়েন্টওয়র্থ প্লেস-এর বিশাল বাড়ির একাংশ ভাড়া নিলেন এক প্রতিভাবান তরুণ কবি। প্রতিবেশী ডিল্ক পরিবারে প্রায়ই জমে ওঠে আড্ডা। এখানেই একদিন লাজুক কবির সঙ্গে পরিচয় হল সদ্যযৌবনা ছটফটে ফ্যানি ব্রনের। চাক্ষুষ না দেখেই ফ্যানি ‘তার অনেক গল্প’ শুনেছিলেন ডিল্কদের কাছে। চার্লস যখন কবি-বন্ধুকে নিয়ে স্কটল্যান্ডে বেড়াচ্ছেন, তখন ফ্যানিরাই ব্রনের ভাড়াটে ছিলেন, পরে এলম-কটেজে উঠে গেলেও ডিল্কদের বাড়িতে যাতায়াত রয়ে গেল আর সেই সুবাদেই দেখা হয়ে গেল জন কীটস-এর সঙ্গে—যিনি ভাবী প্রজন্মের কাছে অষ্টাদশ শতকের রোমান্টিক কবি হিসেবে প্রসিদ্ধ হবেন। তথাকথিত সুন্দরী না হলেও সুন্দর মুখশ্রী, অভিজাত চালচলন ও রঙ্গময়ী হাবভাবে প্রথম আলাপ থেকেই কীটস-এর মনোহরণ করলেন ফ্যানি। অনুরাগের অকপট নিবেদনেও দেরি হল না। চিরকুট-প্রেমপত্র চালাচালি আরম্ভ হল—কখনও ফ্যানির রূপের ‘অতুল গৌরবে’ ধন্য কবি, কখনও বা অপর পুরুষ-বন্ধুকে উচ্চস্বরে নাম ধরে ডাকাডাকি ও কবির সাক্ষাতে তাদের সঙ্গে রসালাপ কবিকে করে তুলত ঈর্ষাকাতর! চিঠিতে প্রকাশ পেত কবির রাগ-অনুরাগ, শঙ্কা-বিহ্বলতা সবই—
“আমি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করব তোমায় দেখব বলে। তোমার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কেবল ছটফট করছিলাম, সত্যিই তুমি আমাকে পছন্দ কর কি! আমি তোমায় খুব ভালোবাসি, নিবিড় ভাবে অনুভব করি। তোমার এই সৌন্দর্য কেবল আমারই জন্য সৃষ্টি হয়েছে বলেই আমার বিশ্বাস।”
কিম্বা, “I see life in nothing but the certainty of your Love – convince me of it my sweetest. If I am not somehow convinced I shall die of agony.”
অন্য পুরুষের সঙ্গে ফ্যানির সম্পর্ক নিয়ে কীটস-এর এই সন্দেহ তাঁর একাধিক চিঠিতে ফুটে উঠেছে। তাঁর নিজের জীবনও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। বংশগত যক্ষ্মারোগ স্নেহের ভাই টমকে কেড়ে নিয়েছে সদ্য (১ ডিসেম্বর), ঐ রোগে আগেই গত হয়েছেন তাঁদের মা। এদিকে আর্থিক টানাটানি, অথচ কাব্যচর্চা ছাড়া অন্য কোনও পেশাদারী কাজে রোজগার করার মানসিকতা নেই। কিন্তু কাব্য-সরস্বতীর সঙ্গে বাণিজ্য-লক্ষ্মীর প্রসাদলাভ সহজ নয়। তাই দিবারাত্রি কাব্যরচনায় মনোনিবেশ করেও নবীন প্রেমের অভিঘাতে সঙ্কিত চিত্ত সদাই আকুল—
“আমার মধুর প্রেম, আগামীকাল তোমার মোহনিয় মুখখানা দেখার পূর্ব মুহূর্তের প্রতিটি সেকেন্ড যেন এক একটি যুগের অপেক্ষার মতোই ধৈর্যের পরীক্ষা। তোমার সুন্দর তনুখানি যেন আমার অনুভব দিয়েই গড়া। তোমার ভালবাসার আবেশ আমার সমস্ত হৃদয় হরণ করেছে! আমার প্রিয় ফ্যানি, ভালোবাসা রইলো, তোমারই জন কীটস।”
ফ্যানির প্রেমে পড়ে সংবেদনশীল কবি ইতিমধ্যে লিখে ফেলেছেন প্রচুর কবিতা, টমের মৃত্যুর পর জানুয়ারি মাসে সম্পূর্ণ করেছেন ‘দ্য ইভ অব সেন্ট অ্যাগনেস’, ফেব্রুয়ারিতে ‘দ্য ইভ অব সেন্ট মার্ক’, গ্রীষ্মের প্রারম্ভেই সম্পূর্ণ হল ‘দ্য ওড টু সাইকি’ ও আরও অনেকগুলি কবিতা। কিন্তু তখনও কোন প্রকাশকের কৃপাদৃষ্টি বর্ষিত হয়নি, নিরিবিলিতে লেখায় মন দেবেন বলে বন্ধুর সঙ্গে ছুটি কাটাতে এলেন ইংল্যান্ডের আইল-অব-ওয়াইট দ্বীপের শাঙ্কলিন-এ, নাটক লিখতে আরম্ভ করলেন—‘ল্যামিয়া’ ও ‘ওথো দ্য গ্রেট’। ব্রনের দারুণ উৎসাহ, তাঁর মতে কবিতার তুলনায় নাটক লেখা অর্থকরী দিক থেকে লাভজনক। ফ্যানির প্রেমের প্রভাব ‘ল্যামিয়া’-তে আছে পূর্ণমাত্রায়। অপূর্ব এই নাটকে প্রেমের বর্ণনা এক প্রবল বিধ্বংসী শক্তি রূপে। বহু বছর পরে প্রকাশ্যে আসা প্রেমপত্রগুলিতে কীটস-এর সংবেদনশীল প্রেমের তীব্রতা দেখে পাঠক হতচকিত হয়ে পড়েন। কবির মানসলোকের এই দিগন্ত আলোকিত হয়ে ওঠে ‘ল্যামিয়া’-র প্রেমের জটিলতার বর্ণনায়।
ঠিক এই কারণেই কীটস-এর অন্তরঙ্গ বন্ধুমহল ফ্যানির সঙ্গে তাঁর মেলামেশা পছন্দ করতেন না। তাঁরা লক্ষ করেছিলেন, মেয়েটির রহস্যময় আচরণ তাঁদের কবি-বন্ধুর মনে ঈর্ষা ও হতাশার ভাব তৈরি করছে, তাঁর কাব্যচর্চায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে।
বন্ধুদের তাঁকে নিয়ে এই স্বাভাবিক উৎকণ্ঠা কীটস বুঝতেন, কিন্তু ঐ মিষ্টি জ্বালাতনই তাঁর সৃজনী শক্তিকে উসকে দিত! পরে এই কথা স্বীকার করে বলেছিলেন, তিনি ফ্যানির ঈর্ষা উৎপাদক কার্যকলাপ উপভোগ করতেন, তাঁর কবিতাকে তা শক্তি জোগাত, ‘the excellence of every Art is its intensity’, ফ্যানির সঙ্গ তাঁকে দিত অপরিসীম তৃপ্তি! প্রথম যৌবনের এই নব-অনুরাগের ছোঁয়ায় তিনি পেয়েছিলেন নব প্রেরণা, জগৎ সম্বন্ধে নতুন অন্তর্দৃষ্টি আর তাঁর কবিতায় প্রকাশ পেত সেই নতুন অভিজ্ঞতা ও শক্তির প্রতিফলন। প্রেমমগ্ন কবি লিখলেন—“তুমি আমার কাছে চিরনতুন! তোমার শেষবারের চুম্বন মধুরতম, শেষবারের হাসিটি সবচেয়ে উজ্জ্বল, শেষবারে দেখা হাঁটার ভঙ্গিতে শ্রেষ্ঠ আভিজাত্যের প্রকাশ! এই তো গতকাল আমার জানলার সামনে দিয়ে তোমায় যখন হেঁটে যেতে দেখেছি…ঠিক প্রথমদিনের মতই অপার মুগ্ধতায় পূর্ণ করেছ!” এই সময়কার রচনাই কীটস-এর প্রতিভার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রকাশ, যা তাঁকে সর্বকালের সেরা কবিদের মধ্যে আসন দিয়েছে।
সাহিত্যকর্ম ও প্রেমের মাঝখানে ‘স্যান্ডউইচ’ হওয়ার যন্ত্রণায় কীটস বুঝলেন, “আমার ভালোবাসা আমাকে স্বার্থপর করে তুলেছে। তোমাকে ছাড়া আমি নিজের কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাই না। তোমাকে বারংবার দেখার জন্য আমি সব ভুলে যেতে প্রস্তুত। জীবন থমকে গেছে তোমাতে, আমার সর্বস্ব হরণ করেছ তুমি… ধর্মের জন্য লোকে শহীদের মৃত্যু বরণ করে, ভালোবাসাই আমার ধর্ম, ভালোবাসার জন্য মরতে প্রস্তুত আমি, তোমার জন্য মরে যেতে পারি … I cannot breathe without you.!” এর একমাত্র সমাধান বিবাহ ও ফ্যানিকে নিজের করে পাওয়া। ফ্যানির বিধবা মা-ও এতদিনে মা-মরা সুদর্শন ছেলেটির সঙ্গে বড় মেয়ের ভাব-ভালবাসা জানতে পেরেছেন। বুদ্ধিমান ও ভদ্র ছেলেটি গরীব, বেচারা কাব্য লেখে, যাতে পয়সার মুখ দেখা দুরাশা মাত্র। তিনটি সন্তান নিয়ে অভাবের সংসার, তবুও ফ্যানির সঙ্গে কীটস-এর প্রাক-বিবাহ ‘এনগেজমেন্ট’ পর্বে মত দিলেন মিসেস ব্রন।
কিন্তু সব গল্প মিলনান্তক হয় না, এই প্রেমীযুগলের ভাগ্যও ‘মধুরেণ সমাপয়েৎ’ হয়নি। ফেব্রুয়ারি, ১৮২০ থেকে ঘটনা অন্য দিকে বাঁক নিল, বংশগত ক্ষয়রোগ কীটস-এর মৃত্যু-পরোয়ানা নিয়ে হাজির হল। ফ্যানিকে গোপন করেননি কিছুই, সম্পর্ক থেকে মুক্তি দিতেও চেয়েছেন। এক বিশেষ পরিস্থিতিতে এক মাস অসুস্থ কীটস-কে নিজের কাছে রেখে সেবা করেন ফ্যানি ও তার মা। এই সময় ফ্যানি কাছ থেকে দেখেন অসুখের ভয়াবহতা, কাশির দমকে মুখ থেকে রক্ত উঠে আসা আর তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়া তাঁর প্রেমের পরিণতি। তবুও কীটস-এর কাছ থেকে সরে এলেন না, আরও বেশী করে ভালবাসলেন। এই ছোঁয়াচে রোগীর কাছাকাছি মেয়ে আসুক, মা চাইতেন না, তবুও ফ্যানির মুখখানা একবার না দেখলে, তাঁর লেখা দু’ছত্র না পড়লে কবির ঘুমই আসে না—“তুমি ক্রেসিডের প্রতি একটুখানি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছ, এই ভয়টাই আমার সব চেয়ে বড় যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ঐ সন্দেহটা আমি একেবারে নাকচ করে দিয়ে তোমার ভালবাসার আশ্বাসে সুখী থাকব, যে ভালবাসা আমার কাছে যতখানি বিস্ময়ের, ততটাই আনন্দের—তোমায় নিশ্চিত করে বলছি। এখন আমাকে ‘শুভ রাত্রি’ লিখে পাঠাও, যেটা বালিশের নিচে রেখে আমি ঘুমাব।”
শেষমেষ ডাক্তার ও বন্ধুবান্ধবের পরামর্শে স্বাস্থ্যোন্নতির জন্য রোম-এ (ইটালি) যাওয়া স্থির হল, সেকালে ইউরোপে রোমই ছিল ‘সর্বসন্তাপহর’—এখন কলকাতার লোক চিকিৎসা করাতে যেমন ভেলোর যাওয়ার কথা ভাবে, তেমনই খানিকটা। রোমের শুকনো জল-হাওয়া যক্ষ্মারোগীর পক্ষে উপকারীও। কিন্তু ফ্যানির কাছ থেকে দূরে সরে থেকে তিনি ভাল থাকবেন না, এ আভাস আগেই দিয়েছিলেন—“আজ সকালে একটা বই হাতে করে বাগানে বেড়াচ্ছিলাম। কিন্তু যথারীতি মন জুড়ে ছিলে শুধু তুমিই… আমি দিবারাত্রি জ্বলেপুড়ে মরছি, ওরা আমায় ইটালি নিয়ে যাবে বলছে, তোমার কাছ থেকে অত দূরে গিয়ে আমি কিছুতেই সেরে উঠব না, দেখে নিও!”
কীটস-এর কবিতার অনুরাগী, অনুজপ্রতিম তরুণ শিল্পী সেভার্নের সঙ্গে কবি অবশেষে চলে এলেন রোম-এ। ক্রমাগত শারীরিক অবনতি হতে হতে ১৮২১ সালে যক্ষ্মার অন্তিম দশায় পৌঁছে গিয়েছিলেন কীটস। বিদেশে অচেনা পরিবেশে ধীর ও বেদনাদায়ক মৃত্যুর জন্য নীরব অপেক্ষা কীটস-এর সমস্ত মনোবল একেবারে ভেঙে দিয়েছিল। সেভার্ন পরে স্মৃতিচারণ করেছেন—“কীটস মাঝে মাঝে উন্মত্তের মত আচরণ করতেন, … তাঁর চোখে এমন একটা বিষণ্ণ চাহনি দেখতাম… এক এক সময় সেই করুণ, ভয়াবহ অভিব্যক্তি আমাকে একেবারে হতবুদ্ধি করে দিত!” ইটালি যাত্রার আগে ফ্যানি কীটস-এর ব্যাগে চিঠি লেখবার কাগজ ও পত্রিকার সঙ্গে ডিম্বাকার একটি মার্বেল দিয়েছিল, সেলাই করতে করতে হাতের চেটো গরম বোধ হলে ঠাণ্ডা পাথরটা সে নিজের হাতের মধ্যে রাখে, জ্বরের তাপে ওটা কবিকে আরাম দেবে। মৃত্যু যত আসন্ন হচ্ছিল, ফ্যানিকে কবি আর চিঠি লিখতেন না, এমনকি ফ্যানির চিঠি খুলে পড়তেও তিনি ভয় পেতেন, দারুণ মানসিক যন্ত্রণায় পুরনো আবেগ ভুলে থাকতে চাইতেন, কিন্তু মার্বেলটা সর্বদা হাতে নিয়ে বসে থাকতেন, যেন প্রেয়সীর হাত ধরে আছেন! সারাদিন কেবল ফ্যানির কথাই ভাবতেন, সেভার্নকেও ফ্যানির প্রসঙ্গেই বলতেন। চার্লস ব্রাউনকে লিখেছিলেন, “আমি ওকে লিখতে ভয় পাই, ওর চিঠি পেতেও ভয় লাগে। ওর হাতের লেখা দেখলেও আমার হৃদয় চুরমার হয়ে যায়! … ওর প্রত্যেক স্মৃতি আমার মনে ভয়ানক ভাবে জাগরূক, আমি ওকে দেখতে পাই, ওর স্বর শুনতে পাই…।” ফ্যানি একটি বই কবিকে পাঠিয়েছিলেন, উত্তরে কীটস লিখলেন, “এখানে আমার কোন বই পাঠিও না… তুমি আমার বইয়ের দিকে চেয়ে আছ, এটা ভেবে আমি অপূর্ব আনন্দ পাই!”
অবশেষে দুঃসহ যন্ত্রণার অবসান হল। ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৮২১ গভীর রাত্রে কবি শাশ্বতলোকে পাড়ি দিলেন, ২৬ ফেব্রুয়ারি তাঁকে সমাহিত করা হল পিরামিড অব গেয়াস সিস্তিয়াসের প্রোটেস্টান্ট সেমেটারিতে। অনুগত সেবক ও সঙ্গী সেভার্নকে অনুরোধ করেছিলেন, চিরনিদ্রার স্থানটি দেখে আসতে। সেভার্ন যখন এসে বললেন, ‘জায়গাটা ভারী শান্ত ও মনোরম, ওখানে ডেইজি আর ভায়োলেট ফুটে আছে রাশি রাশি, কবরের উপর শান্ত মেষের পাল চড়ে বেড়াচ্ছে’—কীটস খুশী হয়ে বলেছিলেন, “আমার বোনের তৈরি পার্স ও ফ্যানির লেখা একখানি চিরকুট আর জুলপির একগোছা চুল আমার কফিনে রেখে দিও… একটি কথা কেবল আমার সমাধি ফলকে লিখে রেখ—‘Here lies one whose name was writ in water.’

ছেচল্লিশ বছর পরে অন্ধকারের আগল ভেঙ্গে অষ্টাদশ শতাব্দীর রোমান্টিক কবি কীটস-এর অজানা প্রেমিকা বেরিয়ে এলেন, ৬৫ বছরের মৃতা ফ্রান্সিস লিন্ডনের অতীত—ফ্যানি ব্রন! চিঠিগুলি সবই একতরফা। কারণ মায়ের চিঠিগুলো অনুপস্থিত। রয়েছে কেবল বিখ্যাত কবির প্রেমপত্র। যেগুলোতে কবির সন্দেহ ও অনুযোগ, প্রেমের তীব্র আবেগ তাঁকে গৌরবের তকমা তো দেবেই না, গর্ভধারিণী জননীও পুরুষের মন নিয়ে খেলা করা ‘রঙ্গিণী’ ভাবমূর্তিতে কলঙ্কিত হবেন! তা সত্ত্বেও বৈষয়িক উন্নতির গন্ধ পেয়ে হারবার্ট মায়ের প্রাক্তন প্রেমিকের চিঠি নিলামে তুলে দিলেন। ‘Keats’s love letters to Fanny Brawne’ প্রকাশিত হওয়ার পরে (এপ্রিল, ১৮৭৮) RH Stoddard লেখেন, “ঠিক কোন্ উদ্দেশ্য ফ্যানি ব্রন-এর উত্তরাধিকারীরা এই আপত্তিজনক বইটি প্রকাশ করেছে? টাকাপয়সা বাগিয়ে নেওয়া ছাড়া অন্য কোনও উদ্দেশ্য কি?”
চার্লস ডিল্ক (ডিল্ক পরিবারের ৩য় পুরুষ) পূর্ণ মালিকানা না পেলেও চিঠিগুলি প্রকাশ্যে আনা রোধ করতে অপ্রকাশিত ৩৯ খানি চিঠি কিনে নিলেন। ব্যক্তিগত পরিচিতির ভিত্তিতে চেনা সংবেদনশীল, লাজুক কবির গোপন অনুভূতি এভাবে সর্বসমক্ষে মেলে ধরা কবির প্রতি অমানবিক নিষ্ঠুরতা মনে করেই চিঠিগুলি গোপন রাখতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বিক্রি করবার দু’বছর পরে আরও বেশি লাভের আশায় হারবার্ট চিঠিগুলি ফেরৎ চাইলেন (১৮৭৪)। ক্রয়ের কোন লিখিত চুক্তি না থাকায়, চিঠিগুলো ফেরৎ দিতে একরকম বাধ্য হলেন ডিল্ক।
এরপর কীটস-এর প্রথম জীবনী-লেখক, রিচার্ড মঙ্কটন মিলনেজ-কে চিঠিগুলি বিক্রি করতে চেয়েছিলেন হারবার্ট। রিচার্ড আগেই ডিল্ক-এর কাছ থেকে চিঠিগুলি পড়েছিলেন এবং তাঁর বইয়ের নতুন সংস্করণের জন্য চিঠিগুলো মূল্যবান জেনেও, সেগুলো অপ্রকাশিত রাখার ব্যাপারে ডিল্ক-এর সঙ্গে একমত ছিলেন। এরপর আরও বেশি লাভের আশায় হারবার্ট এক প্রকাশকের দ্বারা গ্রন্থাকারে চিঠিগুলি প্রকাশ করেন, বইয়ের জনপ্রিয়তা যখন তুঙ্গে, আবার চিঠিগুলি নিলামে তোলেন। ঐ নিলামে উপস্থিত ছিলেন নোবেল-জয়ী সাহিত্যিক অস্কার ওয়াইল্ড। তিনিও সম্পূর্ণ অনুষ্ঠান দেখে বিরক্ত হয়ে মন্তব্য করেছিলেন, “ওরা শিল্পের মর্যাদা দিতে জানে না… কবির স্ফটিক-হৃদয় ওরা ভেঙে ফেলল!” তিনি নিজে একখানি চিঠি কিনলেন।
ফেব্রুয়ারি, ১৮৭৮ হারবার্ট-এর বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন সফল হল, সমস্ত চিঠি একত্রে ‘Letters of John Keats to Fanny Brawne’ নামে ছেপে বের হল, অসংখ্য কপি ছাপা হল, হাজার হাজার মানুষ সেসমস্ত চিঠি পড়লেন, এক বছর ধরে গোটা ইউরোপ ও আমেরিকায় বিতর্কের ঝড় বয়ে গেল। মার্চ ১৮৮৫, উত্তেজনার তুঙ্গে Sotheby কম্পানি আবার ৩৭ টি চিঠির নিলাম ডাকলেন, ২টি চিঠি ডিল্ক নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন। তখনও ‘নক্ষত্র-কবি’ না হয়ে উঠলেও বহু মানুষের মনে কীটস ভালবাসা ও শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। চিঠিগুলি বেচে ৫৪৩ পাউন্ড পাওয়া গেল, সেকালের সাপেক্ষে মোটা অঙ্ক।

এই সবকয়টি পর্যায়ে পাঠকের ক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু হয়ে থেকেছেন ফ্যানি ব্রন, প্রতিক্রিয়াগুলির বিষয়বস্তু এরকম—
১) কীটস-এর প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধাবোধ থাকলে, অনেক আগেই ফ্যানির উচিৎ ছিল চিঠিগুলো নষ্ট করে ফেলা।
২) ফ্যানি কীটস-এর যোগ্য নন। অনেক রিভিউয়ার এমনও মন্তব্য করেছিলেন, কীটস-এর সৌভাগ্য যে ফ্যানিকে বিবাহ করার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। তা না হলে ঐ দুশ্চরিত্রা রমণী তাঁর জীবনটা নষ্ট করে দিত।
৩) কীটস যতখানি ভালবেসেছেন, ফ্যানি মোটেই সেভাবে কীটসকে ভালবাসেননি।

এখন আমরা মুদ্রার অন্য পিঠ উলটে দেখব। কীটস-এর বোন ফ্রান্সিস-কে লেখা ফ্যানি ব্রন-এর ৩১ খানি চিঠি ১৯৩৭ সালে ছেপে বার করল অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস। ফ্যানির চরিত্রের উপর অন্য জানালা থেকে আলো পড়ল। ফলে মাত্র কয়েক দশক আগে কীটস-এর জীবনীকাররা ফ্যানিকে এক অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পেলেন।
কীটস তখন মরণের দোরগোড়ায়, ফ্যানি ভাবী ননদিনি, ফ্রান্সিস-কে (যার ডাকনামও ফ্যানি) লিখছেন, ‘If I am to lose him I lose everything,’ কীটস-এর বহু পত্রের অভিযোগ অনুসারে ‘রঙ্গিনী’ মেয়েটি এই মৃত্যুপথযাত্রী প্রেমিককে ত্যাগ করে নতুন জীবনসঙ্গীর খোঁজ করেনি কেন? কবির মৃত্যুসংবাদ বাড়ির লোকের কাছে পৌঁছল তিন সপ্তাহ পরে। সেই বসন্তেই ফ্রান্সিস-কে ফ্যানি লিখলেন, “আমি এখনও শোক কাটিয়ে উঠতে পারিনি আর কখনও পারবোও না!” কীটস-এর মৃত্যুর আট বছর পরেও তিনি প্রিয়বিয়োগের শোকের চিহ্ন ধারণ করে কালো পোশাকই পড়তেন, কীটস-এর লেখা কবিতা ও প্রেমপত্র পড়ে কেটে যেত বহু বিনিদ্র রজনী। ফ্রান্সিস-কে লিখেছিলেন, “আমি ধৈর্য ধরে শান্ত হয়ে আছি, কিন্তু আমার সব আশা শেষ হয়ে গেছে। জানি, আমার কীটস সুখেই আছে, এখানকার থেকে হাজার গুণ সুখে আছে, কারণ তুমি জানো না, কখনও জানতেও পারবে না, কী পরিমাণ যন্ত্রণায় সে ছিল! … তাঁর সঙ্গে শেষ অবধি থাকতে পারলাম না, এটাই আমাকে কষ্ট দেয়! … অজ্ঞ, অনুভূতিহীন ডাক্তাররা তাঁকে দূর দেশে মরতে পাঠিয়ে দিলেন! … এখানে থাকলে সে বন্ধুদের সান্ত্বনা পেত, আমি তাঁর কাছে থাকতে পারতাম! আমাদের এখন কেবল এটুকুই সান্ত্বনা যে তাঁর সমস্ত কষ্টের অবসান হয়েছে, তিনি এখন অপার আনন্দে আছেন!” চিঠির প্রত্যেকটি অক্ষর কীটস-এর প্রতি ফ্যানির গভীর ভালবাসাই মেলে ধরেছে।
কীটসও কি এতটাই নির্বোধ ছিলেন? ফ্যানির দিক থেকে কোনরকম ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে একতরফাই তিনি এমন আবেগমথিত চিঠি লিখে যাবেন! প্রেমের নিশ্চিত স্বীকারোক্তি ফ্যানিরও প্রার্থনীয় ছিল—“তোমার বুঝি ভয়, আমি তোমাকে তেমন ভালবাসি না, যতখানি তুমি চাও? আমার সোনা মেয়ে, তোমার প্রতি আমার ভালবাসা কখনও ফুরোবে না, তা সীমাহীন! তোমাকে যত জেনেছি, ততই বেশী করে ভালবেসেছি। সব ভাবে—এমনকি আমার ঈর্ষাও প্রেমের উৎকণ্ঠা মাত্র, যদি বলি, তোমার জন্য প্রাণটা দিয়ে দিতে পারি, সেটাই বোধ করি যথার্থ হবে!”
কীটস-এর মৃত্যুর আট বছর পরে চার্লস ব্রাউন বন্ধুর বায়োগ্রাফি লিখতে মনস্থ করেন এবং ফ্যানির উদ্দেশ্যে কীটস-এর লিখিত যেসমস্ত চিঠি ও কবিতায় প্রেয়সীর নামের উল্লেখ আছে, সেগুলি জীবনীতে সংযুক্ত করবার জন্য ফ্যানির অনুমতি চেয়ে চিঠি লেখেন। উত্তর পেলেন, “তাঁর খ্যাতি প্রতিষ্ঠা পেলেই আমি আনন্দ পাব, নিজের জন্য কিছুই দাবি নেই। সত্যি বলছি, আমি তাঁকে স্মরণ করব, তাতেই আমার তৃপ্তি, জগতে আর কেউ মনে না রাখুক, আমি জানি, তিনি আমার জীবনে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন!”
প্রেমিকের মৃত্যুর আট বছর পরেও ফ্যানির কণ্ঠে কবির স্মৃতিকে হৃদয়ে আগলে রাখার দৃঢ়তা ও কবির মৃত্যু সম্পর্কে এক তিক্ত মনখারাপিয়া সুর! বাকিটা বুঝে নেওয়ার দায় পাঠকের। আমরা ধরে নিতে পারি, ব্যক্তিগত অনুভূতির দলিল ঐ চিঠিগুলো অনেক বছর ফ্যানি বুকে আগলে রক্ষা করেছেন, কিন্তু যখন তিনি অন্য পুরুষের ঘরনি (১৮৩৩) হলেন, তখন কোন্ কথা ভেবে দাম্পত্য-কলহের আশঙ্কা সত্ত্বেও সেগুলো নষ্ট করে ফেলেননি? অথচ কীটস তখনও বিখ্যাত হননি। এরপর সন্তান এসেছে একে একে, বাসা বদল হয়েছে ইউরোপে, তখনও, এবং মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্তও সযত্নে আগলে রেখেছিলেন কাঁচা-বয়সের এক অসমাপ্ত প্রেমের দলিল, অকালে ঝরে পড়া এক তরুণ কবির নবীন প্রেমের আবেগরঞ্জিত মর্মকথা। অথচ কতবার কীটস-এর কবিতা-পাঠকের মনে কবির জীবনের রহস্যময় এক নারীকে ঘিরে কৌতূহল ঘনিয়ে উঠেছে, সেই জল্পনা পাখনা মেলেছে কবির কবিতার খ্যাতির সঙ্গে সঙ্গে সমান তালে, তবুও ফ্যানি সংযত থেকেছেন। নিজেকে প্রকাশ্যে আনেননি। অথচ যখন কীটস-এর অসুস্থতার বিষয়ে ‘কবি পাগল হয়ে গিয়েছিলেন’ জাতীয় বিকৃত প্রতিবেদন মুদ্রিত হয়েছে, প্রচণ্ড ক্রোধে প্রতিবাদ করে নিজেকে প্রায় প্রকাশ করে ফেলবার অসতর্কতা দেখিয়ে ফেলেছেন। ভালবাসা ছাড়া এ আর কী?
কিন্তু যাঁর কবিতায় এত রোমান্স, সেই প্রেমিক কবি কখনও কবিতা লিখে পাঠাননি প্রিয়তমাকে। চিঠিগুলি কাব্যিক, প্রেমের মধুর আকুতিভরা, তবুও প্রেমিকার সঙ্গে কীটস কখনও কাব্যের আলোচনা করেননি। কেন, সেও পাঠকের কাছে এক প্রশ্ন। তাহলে ফ্যানি কি কবির কাছে কেবল দৈহিক সৌন্দর্যের ‘অবসেশন্’ ছিলেন? নারী-পুরুষের বন্ধুত্বে প্রত্যেক বিষয়ে পরস্পরের মধ্যে আলোচনা ও অনুভূতি ভাগ করে নেওয়ার যে প্রবণতা আজকে দেখি, সে যুগে কি তেমন ছিল না? অথচ বন্ধুদের লেখা চিঠিতে কীটস স্বরচিত কাব্য ও অন্যান্য অগ্রজ সাহিত্যিকদের বিভিন্ন রচনা সম্বন্ধে খোলাখুলি বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এর উত্তর খুঁজব কবির চিঠিতে—“My Mind has been the most discontented and restless one that ever was put into a body too small for it. I never felt my Mind repose upon anything with complete and undistracted enjoyment – upon no person but you. When you are in the room my thoughts never fly out of window: you always concentrate my whole senses.”
কীটস-এর সমগ্র সত্তা ও ভাবরাজ্য ফ্যানির উপস্থিতি ও সান্নিধ্যে ভরাট হয়ে থাকত, কিছু রচনা করতে হলে নিজের সত্তাকে দুটি ভাগ করতে হয়—রচনার বিষয় ও রচয়িতা; এই মেয়ে সেই ভেদ মুছে দিত।

নিজের চরিত্র নিয়ে কটু মন্তব্য মিসেস ফ্রান্সিস লিন্ডন-কে শুনে যেতে হয়নি। অসমাপ্ত জীবনে যে মেয়েটিকে ভালবেসে দুদণ্ড শান্তি পেয়েছিলেন কবি, বেঁচে থাকলে সমালোচনার উত্তরে তিনি কি ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের নায়িকা কপিলার মত বলতেন, ‘হায় রে পুরুষ!’ নারীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তুমি কী সুখ পাও? আমার বরং মনে হয়েছে, গভীর ভালবাসা ও শ্রদ্ধা না থাকলে ফ্যানি এভাবে মৃত প্রাক্তন প্রেমিকের চিঠি আগলে রাখতেন না। জীবদ্দশায় অসুস্থ কবির সন্দিহান মনোভাবকেও তিনি মমতা ও কৌতুকের সঙ্গেই সহ্য করেছেন। একদিন কবি খ্যাতিলাভ করবেন, এ বিশ্বাসও তাঁর ছিল। নিজের ভাবমূর্তির বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে সন্তানদের দিয়ে গিয়েছেন তাঁর আনন্দ-বেদনাময় অতীতের সন্ধান। ‘কবি’ কীটস-এর সঙ্গে ‘রঙ্গিণী’ ফ্যানির নয়, ভাবতে ভাল লাগে, ভালবাসা হয়েছিল দুটি মানব ও মানবীর, যে নামেই তাদের ডাকি না কেন! তাই সমস্ত অভিযোগ, বিতর্ক একপাশে সরিয়ে রেখে আমরা বরং মিলনের আগ্রহে অধীর দুটি তরুণ প্রাণের অপূর্ণ আশা ও অধরা স্বপ্নে থরে থরে সাজানো সেইসব হলুদ চিঠিগুলোকে ভালবাসি—
“My sweet girl,
Your Letter gave me more delight, than any thing in the world but yourself could do…”মাত্র ২৫ বছর বয়সেই নিভে গিয়েছিল কীটস-এর জীবনদীপ! ভাগ্যিস ফ্যানি ব্রন জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আঁকড়ে ছিলেন চিঠিগুলো! ভাগ্যিস কীটস-এর বোন রেখে দিয়েছিলেন ফ্যানির চিঠিগুলো! ‘তোমার মহাবিশ্বে কিছু হারায় না তো কভু!’—জীবনে যে প্রেম পূর্ণতা পায়নি, ‘মরণ হতে’ জেগে উঠে সেই কাঁচা বয়সের আবেগ-মাখানো প্রেমপত্রগুলোই একবিংশ শতাব্দীর সাহিত্য-আলোচকদের দৃষ্টিতে পৃথিবীতে বিভিন্ন সময়ে লেখা চিঠির মধ্যে সুন্দরতম দ্যুতিময় মণি!
ইংরেজ কবির সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে কতযুগ পরে বাঙলার কবি লিখলেন—
“করুণা করে হলেও চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিওআঙুলের মিহিন সেলাইভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,এটুকু সামান্য দাবি চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতোঅক্ষরের পাড় বোনা একখানি চিঠি…!”২
(২৯৫৫ শব্দ)

উদ্ধৃতি সূচী
১। স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর পর কবি স্বামীকে লেখা তাঁর না-পাঠানো এক গোছা পত্র পেয়ে রবীন্দ্রনাথ এই ছত্রটি লিখেছিলেন।
২। চিঠি দিও; মহাদেব সাহা

তথ্য-সংগ্রহ

  1. https://englishhistory.net/keats/fanny-brawne/,
  2. Poem by John Keats(1795-1821)
    http://keats-poems.com/letters/love-letters/
  3. https://poets.org/text/selected-love-letters-fanny-brawne
  4. https://www.brainpickings.org/2016/02/19/john-keats-love-letter-fanny
  5. https://www.britannica.com/biography/John-Keats

2 Comments

  • Kakali some

    Reply June 28, 2021 |

    অসাধারণ লাগলো 🙏❤️

  • Sumana Saha

    Reply July 21, 2021 |

    অনেক ধন্যবাদ

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...