ধূসর বাগানে উষ্ণ গোলাপ
শুভদীপ নায়ক

কাগজ কলমের মধ্যে দিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের যে নিবিড় যোগাযোগ, যে চিরস্থায়ী পরিচিতি, সাহিত্যে তাকেই আমরা প্রেম বলে জানি । চোখের আড়ালে বেড়ে ওঠে মানুষের অসহায়তা, উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে তার সমস্ত আত্মা, কেননা মানুষ চায় নিজেকে ছাড়িয়ে বাঁচতে । মানুষের অন্তর্জগতের এই বিশাল সম্প্রসারণশীলতা যা বাইরে থেকে অনুমানযোগ্য নয় বলেই আমরা মানুষ সম্পর্কে খুবই কম জানতে পারি । দেহের বাইরে, আত্মার বাইরে মানুষে মানুষে গড়ে ওঠে সম্পর্ক, দৈনন্দিন সমান্তরাল যাপন । সেই বিন্যস্ত সম্পর্ক থেকে মানুষ একা হয়ে সরে আসে, কিংবা একাকীত্বের মধ্যে দিয়ে মানুষের দেখা হয় অপর একজন মানুষের সঙ্গে, হিংসা ও ভালোবাসা দুই-ই সেখানে ন্যায্য । প্রায় ২০ মাস ব্যাপী দীর্ঘকালীন শিক্ষা দিয়ে গেল একটা অণুজীব । অনেক কলমকে থামিয়ে দিল । অনেক মানুষের জীবনকে স্তব্ধ করে দিল । কিন্তু মনুষ্যজাতির প্রগতির ওপর সে জয়ী হতে পারল না । পৃথিবী ফিরল তার নিজস্ব ছন্দে, দোকান বাজার খুলল, পথঘাট সচল হল । অনেকদিন ধরে বন্ধ থাকা স্কুলগুলিও চালু হল । বইয়ের বাজারে নতুন কাগজ, নতুন বইয়ের সম্ভার এসে পড়ল । সেইসব বইয়ের মধ্যে দু-একটি বই হাতে নিতেই দেখি ইতিমধ্যে পাল্টে গেছে ঋতুর প্রকৃতি । চারপাশে এখন শীতের স্পর্শ, তাপহীন অারামদায়ক রোদের হাতছানি ।
শীতের সকাল মানেই সবুজের সঙ্গে পুনরায় দেখা হয়ে যাওয়া । সমস্ত বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শীতের বাজার থেকে সংগ্রহ করে আনি সবুজের ডালি, ব্যাগ ভর্তি সবজি । ঠিক যেভাবে কলেজ পাড়ার আড্ডা শেষে অভ্যাসবশত দু-একটি বই কিনে ফেলি, অনেকটা সেইরকম । এ বছরের শীতের সূচনায় একটিমাত্র বই আমাকে ভরিয়ে তুলেছে । সেই বই সম্পর্কে কিছু লেখার আগে আরও কিছু কথা পাঠকদের জানাতে ইচ্ছে করছে । কবিতার বই আমি একটানা কখনওই সম্পূর্ণ পড়ে উঠতে পারি না । একেকটি কবিতার ভাবনাভুবন আমাকে টেনে নিয়ে যায় জটিল একটা বৃত্তের দিকে । কবিতা তো নিজেকে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করে না, সে চায় তার ছায়াচ্ছন্ন অঞ্চলে পাঠকের হৃদয় প্রবেশ করুক । মানুষের মধ্যে তাকে নিয়ে তৈরি হোক মতানৈক্য, পৃথক দৃষ্টিভঙ্গি, যাতে সেই কবিতাটার বেঁচে থাকাটা সার্থক হয় । কাব্যে নিহিত অন্ধকারও একটা নিজস্ব অর্থ বহন করে । তেমন একটি বইয়ের ভূমিকায় যদি লেখা হয় এমন কিছু কথা, যা আমার আপনার অতীতকে তুলে ধরবে চোখের সামনে, তা হলে সে বইয়ের সঙ্গে আপনার কেটে যাবে একটা আস্ত জীবন ।

‘তোমাকে লিখছি ভেবে সাদা কাগজকে এই যে উপহার দিচ্ছি অজস্র
ক্ষত এই যে ভরে উঠছে দিন রাত শূন্যতায় এক দেওয়াল থেকে
অন্য দিকে ছুটে যাচ্ছে গান জানলা খোলাই থাকছে অকারণ বৃষ্টিছাঁট
কিছুতেই ধুয়ে দিতে পারছে না’

সমস্ত কথাই যতিহীন, সব কথার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে বলতে না পারা কথা । অকারণ কথার মেঘ এসে ঢেকে দিচ্ছে আসল কথাগুলোকে । এমন তো আমার নিজের সঙ্গেই কতবার হয়েছে । কলমের আঁচড়ে কাগজকে যত উপহার দিয়েছি, তা আসলে দিতে চেয়েছি অন্য কাউকে । জীবনের মধ্যে খুঁজে পাইনি সেই হাত । সমস্ত অন্যায় সত্ত্বেও যে হাত ধরতে চেয়েছি, একসময় বুঝেছি পথভ্রষ্ট হয়ে এসে সমস্ত জীবন ভুল হাত ধরেছি । ভুল চাওয়া চেয়েছি । ভুল মানুষের মধ্যে খুঁজে চলেছি নিজের হারিয়ে যাওয়া সম্ভ্রম । ‘দিন রাত শূন্যতায়’ ভরে গিয়েছে আমার যৎসামান্য লেখার টেবিল । গান হারিয়ে গেছে, সুরের মধ্যে নেই উন্মাদনা, মধ্যরাতে যে বৃষ্টি অকারণেই আমার জানলার কাছে এসেছে, কই সে তো কখনও পারেনি আমার জীবনের মধ্যে থেকে যন্ত্রণার ধুলোকাদা ধুয়ে দিতে !
এই আশ্চর্য লেখাটি কীভাবে লিখে ফেললেন কবি তৃষা চক্রবর্তী! মানুষের মনে মনে ভ্রমণ করে, তাদের অভিজ্ঞতাকে স্পর্শ করে এমন একটি কথা এ বইয়ের সূচনাপত্রে তিনি লিখলেন যা বইটিকে অন্যতম করে তুলল । পাঁচ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে বইটির প্রথম কবিতা শুরু । কবিতাটি শুরু হচ্ছে এইভাবে:

‘শব্দ পাই
হাঁসেদের, সলজ্জ ঘাস মাড়িয়ে
ঘরে ফিরে গেছে যারা

বহু বহুদিন ডাকেনি এমন

মানুষের মতো কাছে যেতে গিয়ে আমি
মানুষের মতো দূরে চলে আসি’

মেয়েদের মন মানেই অস্পষ্ট দ্বিধা, সুস্পষ্ট সম্পূর্ণতা । এই পুরুষ জীবনে আমি কখনও মেয়েদের মতো মন পাইনি । সমস্ত জীবনই চেয়েছি ইচ্ছে নয়, উচিতই জিতুক শেষপর্যন্ত । আর তাই আমি থাকতে পেরেছি আমার পড়াশুনোর ঘরে, বইগুলোর সঙ্গে । আমি নিজেকে চিনেছি, সত্যকে খুঁজেছি অনেক মানুষের মধ্যে, অনেক সম্পর্কের পরতে পরতে জড়িয়ে রইল আমার অন্যায়, অবাধ্যতা । অনেক মানুষই আমাকে ক্ষমা করে ভালোবাসল, কেউ কেউ আবার চিরকাল আমাকে ক্ষমা করে উঠতে পারল না । কাজেই সৃষ্টির গভীরে আমি হারালাম অনেক মানুষ, অনেক পরিচিতি । এই কবিতাটিতে যেসব হাঁস সলজ্জ ঘাস মাড়িয়ে ঘরে ফিরে গেছে, তাদের শব্দ এবং আমার ব্যক্তিগত নৈঃশব্দ্য, দুই-ই মিশে রইল । সমস্ত সম্পর্কে আমি কাছে যেতে গিয়েই তো দূরে চলে এসেছি, সঙ্গে এনেছি তিরষ্কার ও ছোট ছোট ভুল সিদ্ধান্ত, কিছুক্ষেত্রে অপমানও ।
আরেকটি কবিতার ওপর চোখ পড়তেই দেখি, মাত্র তিন লাইনেই সমস্ত জীবনের সারমর্ম তুলে ধরেছেন কবি ।

‘ধিক্কারে, আত্মগ্লানিতে—এই কথা
লিখে যাব বারবার, আলোয়, ব্যর্থ দর্পণে
তোমার মতন করে তুমি এসেছিলে’

এ লেখাটি পড়ে বারবার আমাকে থামতে হয়েছে । সত্যিই তো, আমরা যখন কারোর জীবনে প্রবেশ করি, আমরা তো নিজেদের স্বপ্নপূরণ ও প্রত্যাশাগুলোকে নিয়েই প্রবেশ করি । যার জীবনে আমরা প্রবেশ করলাম, তারও যে একটা অসম্পূর্ণতা ও অস্বস্তি আছে, আমরা কখনও কি কেউ তার খোঁজ নিই! এমন অনেক বিবাহিত দম্পতি আছে, যাদের মধ্যেকার সমস্ত বিনিময় শুষ্কতা বেছে নিয়ে ঝরে গেছে । কেবল আশ্রয়হীনতার ভয়ে তারা টিকে আছে এক বন্ধনে । চিরজীবন মুক্তি বেছে নিয়ে ভালোবাসার তীব্রতা অনুসন্ধান করে ফেরা তো সহজ কাজ নয় । কিন্তু যে সম্পর্ক আমাকে বয়ে নিয়ে এল আস্ত জীবন ধরে, তার কাছে কতটুকু শিক্ষা পেলাম আমি, সেইটাই হল বড় কথা । কবি তৃষা চক্রবর্তীর বইটি নিয়ে কেটে গিয়েছে আমার শীতের বেশ কিছু বিষণ্ন দুপুর, কয়েকটি সুরাসক্ত সন্ধ্যা । কবিতাগুলো সংক্ষিপ্ত অথচ সেই সংক্ষিপ্তের আড়ালে লুকিয়ে আছে সুবিশাল সম্পর্কচেতনার পরিসর যা আমাদের ভাবায়, শেষপর্যন্ত কী অর্জন করলাম একাকীত্ব ও অভিজ্ঞতার বিপন্নতা ছাড়া ?
আরেকটি কবিতা আমি এখানে তুলে দিয়ে শেষ করতে চাই । কিন্তু এ বইয়ের দুটি মলাটের মধ্যে কবিতার ডালি ছাড়াও আরও একটি শিল্প রয়েছে । শিল্পী কৌস্তব চক্রবর্তীর আঁকা বেশকিছু ছবি, যা কবিতাগুলোকে একটি ভাস্কর্যে ফুটিয়ে তুলেছে । ছবির পাশাপাশি লেখাগুলো, এই দুটি যুগলবন্দী বেদনা মিলে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে কবি তৃষা চক্রবর্তীর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘তোমার হাসির থেকে দূরে’ । এমন একটি আশ্চর্য কাব্যগ্রন্থ আমি উপহার দিতে চাই আমার সকল বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের যাদের জীবন গড়ে উঠেছে অভিজ্ঞতার সংঘর্ষে । কেমন সেই জীবন, এই কবিতাটির মধ্যে দিয়ে চেনা যাক তাকে ।

‘একটি পাতা
আকাশের মেঘ দেখে
খুশি হয়

বৃষ্টির পূর্বাভাস
কখন ঝড়ও আনে
বুঝতে পারে না’

পুনরায় একটি যতিহীন কবিতা । ঠিক যেন ধূসর বাগানে ফুটে থাকা একটি উষ্ণ গোলাপ । সুখ কত সামান্য দেখুন, দৃষ্টি কত গভীর তাও দেখুন । জীবন কতটা চঞ্চল তা এই কবিতার মধ্যে দিয়ে ধরা পড়ছে । সামান্য একটা পাতা, তার খুশি হওয়া শুধু মেঘ দেখে । আমরা সেই ঈষৎ খুশির কথা শুনেছি কি কখনও! পাতার সম্পর্কে আমরা খুবই কম জানি । সুতরাং, মানুষ সম্পর্কে আমাদের সমস্ত ধারণাই যে ভুল, ক্ষুদ্র, মানুষ যে ধারণার বাইরেও একটা বিশাল কিছু, তার বিস্তৃতি যে অনন্ত, সেইটাই হল এ বইয়ের চিরন্তন শিক্ষা ।

‘তোমার হাসির থেকে দূরে’
তৃষা চক্রবর্তী
প্রকাশক: একলব্য
মূল্য: ১৩০/-

2 Comments

  • মণ্ডল সুব্রত

    Reply January 1, 2022 |

    খুব ভালো পাঠ প্রতিক্রিয়া

  • অনির্বাণ সূর্যকান্ত

    Reply March 15, 2022 |

    ভালো লাগলো আলোচনা । অনুভূতি। যদিও তাকে পড়িনি । ইচ্ছে জাগল। তার বই বাংলাদেশে পাওয়া যায় কিনা জানাবেন প্লিজ।

Leave a Reply to মণ্ডল সুব্রত Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...