জুহি
রুখসানা কাজল

কুত্তার মত হাসিস না তো জাখার।

আমি হেসেই চলি। কুত্তা তো! অভ্যাস যাবে কই।

হাসতে হাসতেই হঠাত থেমে যাই। মালয়েশিয়ার জঙ্গলে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে যখন ধরা পড়ে গেছিলাম, ওদের পুলিশ বুটের স্পাইক ঘষে দিয়েছিল আমার শিরদাঁড়ায়। নীল বিদ্যুতের মত ব্যথা ছড়িয়ে পড়েছিল সমস্ত শরীর জুড়ে। সেরকম ব্যাথায় দপদপ্‌ করে ওঠে আমার মাথা, তোর এই জীবন ভালো লাগে জু?

লাগে।

লম্বা চুলের ভেতর চিরুণি ডুবিয়ে আঁচড়ে নিচ্ছে জুহি। তীক্ষ্ণ চোখে উলটে পালটে দেখছে চিরুণির দাঁতে কোনো চুল উঠে এলো কিনা! পেছনে বিশাল বড় জানালা জুড়ে রেশমি সাদা পর্দা। উড়ছে। ধীর বিভঙ্গে। আর দুলে উঠছে লেসের অলকঝলক ধবল জরি।

নাকি কাঁপছে?

অসহিষ্ণু লাগছে সবকিছু। মনে হচ্ছে, এক ঘুষিতে জুহির মুখের জিয়োগ্রাফি পালটে দিই। আবার ইচ্ছা করছে একটানে ওকে নিয়ে চলে আসি আমাদের লালমাটিয়ার বাসায়। একতলা হলুদরঙ বাড়ির সামনে পুঁই গাছ উঠেছে ফুলে ফেঁপে। জুহি খুব ভালো পুঁই পাতার বড়া বানাতে পারত। ইলিশ মাছের মাথার সাথে পুঁইপাতার চচ্চড়ি। কিম্বা পুঁইকুমড়োর মাখামাখি নিরামিষ। তাতে উঁকি মারত সোনারঙ কয়েকটা আধভাঙ্গা ভাজা বড়ি !

হাঁটুর উপর হাত রেখে জুহিকে কাছে টানি। লকলক করছে ওর দীর্ঘ রাঙানো চুল। দুহাতে চুলের ভেতর বিলি কাটে জুহি। চিরুনি চালায় চামড়ার গভীরে। কোনো এক সৌন্দর্য সুরক্ষা পত্রিকায় ও পড়েছিল, মাথার ব্লাড সার্কুলেশন রেগুলার থাকলে চুলের গ্রোথ ভালো থাকে। অকালে চুল পড়ে না। পাকেও না। চুলের দৈর্ঘ্য দ্রুত বাড়ে। এই এগারো বছরে গোছা গোছা চুল গজিয়েছে জুহির মাথায়। ছোটখাটো জুহি ঢেকে গেছে চুলের আগ্রাসনে। প্রায় হারায় হারায় অবস্থা।

রুম জুড়ে দামি সেন্টের মৃদু সুবাস। ওর বুকের উপর মুখ রাখি। স্তনের খাঁজে নাক ডুবিয়ে শ্বাস নিই। নাহ আগের সেই আগুন তাপের ভাপে ভাজা গন্ধ নেই জুহির শরীরে। নেই গানমত্ত রক্তচলাচল। এই জুহি কি সেই জুহি?

ওর ডান কানের উপর একটি কালো তিল ছিল। তিলটি খুঁজি। কথায় কথায় জাঁক দেখাতো জুহি, জানিস, কানের উপরে যাদের তিল থাকে তাদের অনেকগুলো প্রেম হয়। আমারও হবে। সব বেছে খুঁটে তবে বিয়ে করব!

বাঁধাহীন শরীর মেলে দিয়েছে জুহি। অথচ আগে সাপুড়ের মত খেলিয়ে তবে ওকে ধরতে দিত। বাসায় কেউ না থাকার সুযোগে আমি যখন ওর কাঁধে পিঠে চুমুর পর চুমু খেতাম, জুহি তখন পুঁইপাতার বড়া বানাতে বানাতে কিম্বা কাপড় ভাঁজ করতে করতে হাজার খানেক গান গেয়ে উঠত। আর সরে সরে পিছলে যেত।

প্রায় সারাক্ষণই জুহি গান গাইত। মাঝে মাঝে মা রেগে যেত, এই তোর গান থামা তো। উফফ, ঝালাপালা করে দিচ্ছিস একেবারে! জুহি আরো বেশি সুর তুলে নতুন শোনা কোনো গান গাইতে শুরু করে দিত বিপুল খচড়ামিতে।

— আস্তো শয়তান মেয়ে। বদমাশেরও বড় বদমাশ। থাক তুই তোর গান নিয়ে, আমি চললাম। মা বেরিয়ে যেতো পাড়া ঘুরতে। কখনও মহিলা পরিষদ অফিসে। কিম্বা কোনো মহিলানেত্রির বাসার আড্ডায়। জানত জুহি ঠিক সামলে নিতে পারবে তার সুর তাল কাটা এক পায়ে দাঁড়ানো কুঁজোবেঁকা সংসারটাকে।

আহা রে আমার লালমাটিয়া। নাভিকুন্ড থেকে ঠমক তুলে নিঃশ্বাস ওঠে আসে আমার। জুহির কোলে মাথা গুঁজে শুয়ে পড়ি, লালমাটিয়া যাবি জুহি? আয়। ফিরে চল। সব তো তেমনই আছে। তোর বাড়ি। তোর সব। শুধু তুই নাই!

চুলের গোছায় রিবন লাগাতে লাগাতে জুহি হাসে। এগারো বছরের স্রোতে ওর মুখের ছোট্ট টোলটা হারিয়ে গেছে। আমি জুহির গাল স্পর্শ করি। ঠোঁট। চিবুক। ক্লিভেজের ভাঁজে পাউডারের সেই পুরনো সাদা ভূমি। ঝাঁপিয়ে পড়ি সে ভূমিতে।

বাসা থেকে মা বেরুলেই আমি সুযোগ নিতাম জুহিকে জ্বালাতে।

কি বানিয়েছিস এগুলান? পুই বড়া ? ভ্যাক, থুঃ —

জুহি চোখ সরু করে গান থামিয়ে খুন্তি উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকত। আমি ভ্যাক ভ্যাক থুঃ করে দুচারটে সাবড়ে দিয়ে জুহিকে জড়িয়ে ধরতাম। এর পরের ইভেন্ট ছিল মাতঙ্গিনী জুহির কড়া একটিভিটিস, এই তুই বড়া খেতে এসেছিস নাকি আমাকে?

আমি হে হে করে বলতাম, দুটোই।

জুহি খুন্তি নামিয়ে বড়ার প্লেট হাতে নিয়ে বলত, না দুটো খাওয়া চলবে না। যে কোনো একটা। বল কি খাবি?

আমি কুত্তার মত জুহির পায়ে পায়ে ঘুরতাম, প্লিজ জু—।

জুহি ভাঙা ইটের মত শক্ত হয়ে থাকত। অই বয়সে খুব ভালো লাগত জুহির অই কড়ামি। থালাবাসন ওয়াশ করছে। আমি ওর পেছনে কাকুতি করছি চুমু খেতে। জুহি ওভেন মুছছে আমি জুহিকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করছি। জুহি রান্নাঘরের শিকল তুলে উঠোনে নেমে যাচ্ছে, আমি ওর পায়ে পায়ে —

জুহি পা ঝাড়া দিয়ে লাথি মারার মত করে বলত, টমিকুকুরের মত ঘুরছিস ক্যান তুই! কাজ নাই কোনো? যা পড়তে বোস গিয়ে।

আমি দাঁত কেলিয়ে ঘেউ ঘেউ করে বলতাম, আমি ত টমিই। তোর কুকুর টমি। সাত লাখে কেনা বান্ধা কুত্তা ফর ইওর লাইফ লং! তোর পেছনে ঘুরঘুর করাই ত আমার কাজ ডারলিং মালকিন।

হাস্নুহেনার ডালে টুনটুনির বাসায় উঁকি মেরে জুহি ক্যাজুয়ালি মাথা নাড়াত, ট্রুথ। কামোন টমি। উচ্চু উচ্চু —ছু ছু—

আমার বাবা ছিল না। ছিল না মানে, আদতে ছিল। কিন্তু না থাকার মত।

মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের এক মহিলার সাথে বাবা লেপ্টে গেছিল চানতারার মত। কি একটা কাজে বাবাকে জেনেভা ক্যাম্পে যেতে হয়েছিল। প্রথম দেখায় এক চান্সেই অই মহিলাকে ভালো লেগে যায় বাবার।

মহিলার স্বামি হারিয়ে গেছে মরুভুমির ঝড়ে। ঘটনা বাস্তব। যারা সেই মরু ঝড়ের কবল থেকে বেঁচে পাকিস্তান যেতে পেরেছিল, তারা আল্লাহর দোহাই দিয়ে চোখ ছুঁয়ে বুকে হাত রেখে বলেছে, তাদের চোখের সামনেই আচমকা আসা ঘোলা বালির ঝড়ে উড়ে গেছে লোকটা।

আসমত কাদির নাম ছিল লোকটার। মিরপুর বেনারসি পল্লিতে চাল্লু দোকান ছিল। লেখাপড়াও জানত। প্রচুর বাঙালী বন্ধু ছিল। পয়লা বৈশাখে ধুম আনন্দ করত। নজরুল রবীন্দ্র সুকান্ত জয়ন্তী পালন করত। এমনকি ননস্টপ রবীন্দ্র, নজরুল গাইতে পারত। অনেকটাই শিল্পী জাহেদুর রহিমের মত ভরাট গায়কী ছিল।

বৃষ্টি মাখা জ্যোৎস্না রাতে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে আরিচাঘাটে ছুটে যেত। মাছ কিনে ঘটা করে বন্ধুদের বিলিয়ে দিত। ফুর্তিবাজ। উছল জীবনশক্তিতে ভরপুর। তবু কেন যে পাকিস্তান যেতে সাধ হলো লোকটার ! পাকিস্তান তো আসমত কাদিরের দেশ নয়।

তবে ?

এরা প্রায় সবাই বিহারী। সাতচল্লিশের দেশভাগের আগে থেকেই এদেশে বসত গেড়েছিল এদের বাপদাদারা। লেপতোশক, চামড়ার ব্যাগ, মোগালাই কাবাব, রেশমীকাবাব, রুমালি রুটি, চাপ, বিরিয়ানির ব্যবসা নিয়ে এরা সেই কতকাল আগে থেকেই এদেশে বাস করছিল। ছুটি পেলে কেউ কেউ দল বেঁধে ফুর্তিসে বিহার চলে যেত। আবার, ঘর চল্‌ সাজন বলে ফিরে আসত এদেশে।

অথচ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর দিব্যি স্বাধীন বাংলাদেশকে অস্বীকার করে পাকিস্তানের নাগরিকত্ব চেয়ে পাকিস্তানী পতাকা উড়িয়ে বসে গেলো এদের একাংশ! পাকিস্তান সরকার জিন্দেগিতেও এদের নেবে না। ভালো করেই জানে, এরা কেউ পাকিস্তানি নাগরিক নয়। ক্রমে এরাও জেনে গেছে। তাই পালিয়ে দালালের সাহায্যে চোরাপথে ভারত হয়ে এদের কেউ কেউ পাড়ি দিচ্ছে মুলক এ পাকিস্তান। ওদের স্বপ্নের দেশে।

মাঝে মাঝে আমি ভাবি, কে বলেছে প্রেমপ্রীতি, মায়া মানবতাই মানুষের জীবনের শেষ কথা ? কে বলে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ভাষা, টাকার জোর জলবৎ তরলং? আমি তো দেখি এগুলোর জোরই বেশি। আর সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কেবল কখন যে কোনটির প্রয়োজন জীবনকে ঘিরে ফেলবে তাই শুধু অজানা থাকে মানুষের কাছে। কিম্বা মানুষ বুঝতে পারে না। অথবা বুঝতে পেরেও চেপে রাখে সময়ের সুবর্ণ সুযোগের অপেক্ষায়। যেমন ছিল আসমত কাদির।

চোরাপথে পাকিস্তান যেতে কি এক মরুভূমি পেরুতে হয়। মাঝে মাঝে মরু ঝড় হলে অনেকেই পথ হারিয়ে, দিক হারিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যায় সে মরুভূমির মহাকবলে। তখন কারো কিছু করার থাকে না। ভাগ্য ভালো হলে ফিরে আসে। নইলে বালির নীচে জীয়ন্ত বালি সমাধি হয়ে মরে পড়ে কংকাল হতে থাকে। ভারত বাংলাদেশের পত্রিকায় ত দেখেছি এসব খবর।

সেই ঝড় মাঝে মাঝে ভেসে ওঠত ওই মহিলার দু চোখে। ওরকম ঝোড়ো চোখে আমার বাবা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়র আশফাক মোল্লা চিরকালের সমাধি খুঁজে নিয়েছিল।

বাবা ওখানেই থাকতে শুরু করে দিয়েছিল। প্রথমে দিনের বেশি, কয়েক ঘন্টা। তারপর গভীর রাত। এরপর দু একটা দিন ও রাত। তারপর সপ্তাহের দিনরাত। এরপর যে কোনো দিন রাতের যে কোনো সময়।
মা বুঝে গেছিল সব কিছু।

একদিন বোরখা পরে দেখেও এসেছিলো সেই মহিলাকে। তারপর কাউকে কিছু না বলে, কোথাও কোনো নালিশ না করে আমার অসম্ভব ঝগড়ুটে মুখরা মা, বাবাকে ডেকে তার এক হাতে স্যুটকেস আরেক হাতে ডিভোর্সনামা ধরিয়ে জানিয়ে দিয়েছিলো, যা শুয়োরের বাচ্চা। জন্মের মত বিদেয় হ। এই পাড়ার এই রাস্তায় আর কোনোদিন আসবি না। ছেলেমেয়ে ন্যাদাতে আসবি না। দরকার হলে নতুন বানিয়ে নিবি। তোর এই জীবন শেষ। খতম। যা —

মার তিন ভাই ছিল সে সময়ে লালমাটিয়ার মুরুব্বি। মা তাদের কাছে কোনো নালিশ করেনি। বরং অনুরোধ করেছিল, বাবার প্রসঙ্গ একেবারে মুছে ফেলতে। ইচ্ছে করলে মামারা বাবার হাতপা ভেঙ্গে ঘরের এক কোণে শিকল পরিয়ে সারাজন্মের মত বসিয়ে রাখতে পারত। মা তাতে আপত্তি জানিয়ে বলেছিল, আমি তাকে মুক্তি দিয়েছি। এগুলা নিয়া আর মাথা ঘামাইয়েন না তো। মাঝে মাঝে পোষা কুত্তা হারানোর মতন মানুষও হারায়ে যায়! লোকটা হারায়ে গেছে তাই মনে কইরা আপনারা সান্ত্বনা লন গো ভাইজান।

মামারা আর কি করবে! শিকার হাতছাড়া হওয়া বাঘের মত কদিন শূন্য থাবা ঘুরিয়ে তর্জন গর্জন শেষে শান্ত হয়ে আমাদের চার ভাইবোনের দিকে নজর দিয়েছিল।

আমার মায়ের একটা মাত্র বোন ছিল। জুহির মা। আমার একমাত্র ছোটখালা। কানাডা বেড়াতে গিয়ে গাড়ি এক্সিড্যান্টে জুহির মা বাবা ভাই নিহত হয়। কেবল জুহি কিভাবে যেনো বেঁচে গেছিল। সামান্য কাটাছেঁড়া ছাড়া জুহির তেমন কিছুই হয়নি। গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার করার সময় ওর হাতে ছিল নতুন কেনা একটি বার্বি ডল। কিছুতেই জুহি সেটা ছাড়তে চায়নি। তাই দেখে কানাডার পুলিশ অবাক হয়ে বলেছিল, দ্য ওয়ান্ডার গার্ল!

মায়ের গন্ধ পাওয়া যায় খালার গা থেকে। মামারা তাই জুহিকে মার কাছে দিয়ে দেয়। জুহির টাকাপয়সাও। আমার আরো তিন বোনের সাথে জুহি বড় হয়ে ওঠতে থাকে। মা অবশ্য যেটুকু দরকার তার বাইরে কিছুতেই জুহির টাকায় হাত দিত না। শুধু একবার আমি চাকরি করে ফিরিয়ে দেবো এই শর্তে সাত লাখ টাকা নিয়েছিলো। বোনেরা বড় হয়ে উঠেছে। আমারও আলাদা রুম লাগে। বন্ধুরা আসে। তাই আমাদের পুরনো বাড়িটা মেরামত করতে টাকাটা খরচ হয়েছিল।

জুহি অবশ্য এই শর্তে কিছুতেই রাজি ছিল না। ছটফট করছিল। কিন্তু আমার মা জুহির চেয়েও বড় পাগল। তবে শেষ চালটা অবশ্য জুহি দিয়েছিল, তাইলে তোমার ছেলে কিন্তুক বন্ধক দিলা খালামণি। কথাটা মনে রাইখো।

মা হেরো চোখে জুহির দিকে তাকিয়ে হঠাত হেসে ফেলেছিলো, তুই কি মহাজন হলি নাকি! তো জেনে রাখিস মহাজন, সব বন্ধকি মাল কিন্তু হজম করা যায় না!

আমার বোনেরা পড়াশুনা করলেও জুহির পড়াশোনায় মন ছিলো না। পুওর মার্কস নিয়ে এসএসসি পাশ করে সটান বলে দিয়েছিলো, অনেক হয়েছে। আর পড়তে পারব না খালামণি।

মা অবাক হয়ে বলেছিল, কি বলিস তুই জুহি? পড়াশোনা করবি না মানে ? তোর নিজের জন্যেই ত পড়াশুনা করা দরকার। তুই এতিম তা বুঝিস?

বুঝি। জুহির ঘাড় তবু বাঁকা।

তাহলে? চাকরি করে নিজের পা শক্ত না করলে কে আছে তোকে দেখার! আমাকে দেখছিস না! দেখে কি কিছুই শিখিস না? তোর তিন মামার কাছে তোলা তুলে জীবন চালাচ্ছি। তুই কি তাই করবি নাকি!

হ্যা করবো।

কষে থাপ্পড় মেরেছিল মা, শয়তানের শয়তান। মহা শয়তান মেয়ে। স্বামী গেলে স্বামী পাওয়া যায়। কিন্তু চাকরি করলে নিজের মান সন্মান নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচা যায় তা বুঝিস। এই যা সবাই পড়তে বস গিয়ে।
কিসের পড়াশুনা। জুহি এক ঝটকা মেরে বাসা থেকে বেরিয়ে গেছিল সেদিন।

আমার মাও ঝাটকায় ওস্তাদ। কিছুতেই এমনি এমনি ওয়াকওভার দেয়নি জুহিকে। মামাদের ডেকে জোর করে কলেজে ভর্তি করে দিয়েছিল। জুহিও জিদের ফিল্ড ছাড়েনি একচুল। আজ কলেজ যায় তো কাল যায় না। বই ধরে না। একবারের জন্যে খুলেও দেখে না কি আছে বইয়ের পাতায়। এমনকি কোন বইয়ের প্রচ্ছদ কি রঙের একবারের জন্যেও তা দেখে না। ইনফ্যাক্ট ব্যাগের বই ব্যাগেই পড়ে থেকেছে।

এর বদলে ও যা শুরু করল তা হলো, ভোরে ওঠে উঠোন ঝাড় দিয়ে, গাছে পানি দিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে পড়া। এবার মা তার ভাইদের ডেকে আনল, অই যে দেখেন রান্নাঘরের রাণী।

মামারা জুহি অন্তঃপ্রাণ। তিন মামাই মাকে তাচ্ছিল্য করে হেসে বলেছিল, আরে ও ঠিক হয়ে যাবেনে। তাছাড়া খারাপ কি! কাজ শেখা তো ভালো কথা। আখেরে তাই তো করতে হয় সব মেয়েকে। ও জুঁই মামণি, আমাদের জন্যে কফি বানা তো মা। জম্পেশ কইরা বানাবি যাতে তোর খালামণি রাগ ভুইলা বার বার তোর হাতের কফি খাইতে চায়!

এর কদিনের মাথায় আমরা জুহিকে ভয় পেতে শুরু করলাম। কারণ রান্নাঘর পুরোপুরি জুহির আন্ডারে চলে গেছিল। বেসিনের কল পর্যন্ত জুহির কথায় পানি ছাড়ত। দুটো চুলোই জুহির কথা ছাড়া ঠিক মত আগুন জ্বালাত না। আর খাওয়া ছাড়া তো মানুষ বাঁচতে পারে না। আমার বোনেরা জুহি যা বলে তাই করে দেয়। এমনকি জুহির পাক্কা আট মাসের বড় আমার বোনটা জুহির মুখাপেক্ষি হয়ে বসে থাকে খাওয়ার টেবিলে। জুহির ভয়ে টান টান করে রাখে নিজেদের বিছানা, পড়ার টেবিল। চুল আঁচড়ে যেখানে সেখানে চুল ফেলে না। ঘরবাড়ি, উঠোন, বাথরুম সব ঝকঝকে, তকতক। তিন বোনের পড়াশুনার অভূতপূর্ব উন্নতি হচ্ছে। আর আমাদের একতলা হলুদ বাড়িটা জুহির যত্নে সুন্দর পরিচ্ছন্ন হয়ে ওঠেছে।

আমার মাও সে সময় রান্নাঘরে ঢুকতো ভয়ে ভয়ে। জুহি কড়া চোখে মাকে দেখে যথেষ্ট গম্ভির গলায় জানতে চাইত, কি চাই খালামণি?

মা ঝকঝকে চায়ের কেটলি দেখে চমকে যেত। নতুন নাকি! নাহ এতো পুরনো সেই কেটলি। হাতলের নীচে অই যে ডোপ পড়া। জুহি পুরো রান্নাঘরের ভোলই পালটে দিয়েছে দেখি! কোণের দেয়াল থেকে লেজকাটা এক টিকটিকি ঠিকঠিক ডেকে ওঠতেই মা গলা নরম করে বলে, চা দিস তো এক কাপ। বিকেলে মিটিং আছে প্রেসক্লাবে। বক্তৃতা দিতে হবে।

জুহি তখন মিচকি হেসে স্বাভাবিক গলায় বলে উঠত, কি লাভ পাচ্ছ তোমরা খালা? পারলে বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে?

মা চিন্তিত মুখে জুহির দিকে তাকায়, জাখারের বিদেশ যাওয়ার কি হল রে জু? সংসারের হাল না ধরলে আর ত পারছিনা। তদ্দিনে বড় বোনটার বিয়ে হয়ে গেছে আমার বড়মামার বড় ছেলের সাথে। মামাদের রমরমা পড়তির দিকে। মামীমারা টাইট দিয়ে রাখছে তিন মামাকে।

মেজো বোনটা লেদার ইঞ্জিনীয়ারিং পড়ছে। ছোটোটা কলেজে। আমি এক বায়িং হাউসে পারচেজ অফিসার। মিনিমাম স্যালারি। নিজের খরচ বাদে বাকিটা চলে যায় সংসারে। বন্ধুরা চলে যাচ্ছে বিদেশ। ইতালি, জার্মান, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, হল্যান্ড। মাকে ধরেছি জব্বর ধরা। টাকা দাও বিদেশ যাবো। কিন্তু মার হাতে নগদ টাকা কোথায়!

সম্পত্তি বলতে লালমাটিয়ার অই বাড়ি। যা কিনা জুহির কাছে বন্ধক রাখা আছে। তাছাড়া বোনেরা আছে। মা তাদের কথা ভেবে বাড়ি বিক্রি করতে নারাজ। আমি তখন উন্মাদ। অসহিষ্ণু । বিদেশ না গেলে কিছুতেই চলবে না। খোলা পথে না পারলে চোরাপথ হলেও ইতালি, জার্মান, পর্তুগাল যাবোই যাবো। শালার টাকা। বেতন পেয়ে হাতে ধরতে না ধরতে এক ঘন্টার ভেতর উধাও হয়ে যায়। ডলার কামাবু। ডলার। এক ডলার সত্তর আশি পচাশি টাকা। এরম কামিয়াবি জাদু টাকা আমার চাইই চাই।

গোপনে গোপনে বাপ শালার খোঁজ করি। নাই কোথাও। কেউ বলতেও পারে না কোথায় গেছে। কেউ বলে গুজরাট, বিহার নইলে বেঙ্গালুরু চলে গেছে। আমি নিরাশ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকি গোঁজ হয়ে। খিটিমিটি করি। চেঁচাই। মাকে কড়া কড়া কথা বলে আঘাত করি। সেই সময় এক রাতে জুহি আসে আমার কাছে।

তুই সত্যি বিদেশ যাবি?

সস্তা সিগ্রেট শেষ। বিড়ি ধরাচ্ছি। আগুনমুখো হয়ে বলি, হ্যা যাবো। তুই টাকা দিবি ? তোর ত অনেক টাকা। ওয়ান্ডার গার্ল হিসেবে ডলারও কম পাস নাই। দিবি?

জুহি স্থির অকম্প গলায় বলে, দেবো কিন্তু শর্ত আছে।

কি শর্ত ? আমি লাফ দিয়ে বিছানা ছাড়ি। বল্‌ বল্‌ কি চাস তুই।

তোকে। তুই বিদেশ যাবি যা। কিন্তু আমাকে বিয়ে করে তবে যাবি। রাজী ?

সোনার চাঁন পাইছি হাতে। ছুটে জুহিকে জড়িয়ে ধরি। আজ হোক কাল হোক জুহি ত আমারই।

বিয়ের একুশদিনের মাথায় ইতালি যাবো বলে রওনা হই। চোরাপথে। সাথে আরও এগারো জন।

কিন্তু ইতালি যাওয়ার বদলে আমাদের অন্য কোথাও নিয়ে যায়। সেখানে আমাদের মত আরো প্রায় পঞ্চাশ জন ছিল। শুনলাম এখন ইতালি নয় মালয়েশিয়া থাকতে হবে কিছুদিন। তবে গা ঢাকা দিয়ে। মালয়েশিয়ার নতুন আইনে ইললিগ্যাল বিদেশি দেখলেই জেলে পুরে দিচ্ছে। জঙ্গলের পর জঙ্গল পাল্টে প্রায় ছমাস থাকার পর বুঝতে পারলাম, ফাঁদে পড়ে গেছি। যারা ছিল সাথে তাদের অধিকাংশই স্বল্পশিক্ষিত। মাঝে মাঝে চার পাঁচজনকে কোথায় যেন নিয়ে যায়। তারা আর ফিরে আসে না। কানাঘুষা শোনা গেল, ওদের বিক্রি করে দিয়েছে। আমাদের সাথে কুমিল্লার একজন ছাত্র ছিল। সাদমান খান। তার সাথে পরামর্শ করে জঙ্গলের অই গোপন আস্তানা থেকে পালিয়ে গেলাম। তারপর ধরা পড়ে গেলাম মালয়েশিয়ান পুলিশের হাতে।

ক্ষ্যাপা কুকুরের মত ওরা অত্যাচার করত। আর সেই তখন বুঝতে পারলাম, দেশে আমার ছোট্ট চাকরিটা অনেক ভাল ছিল। আর সেটা বুঝতে বুঝতে কি করে যেন মাথাটা বিগড়ে গেল। এগোরাটা বছর কিছুই মনে করতে পারিনি আমি।

মাথা ঠিক হলে স্মৃতি ফিরে আসে। ইন্টারন্যাশনাল মানবাধিকার কর্মীদের সহযোগিতায় ফিরে আসি দেশে। মা, মামারা মরে গেছে। জুহি আমার ছোট দুবোনকে বিয়ে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে কানাডা। আর নিজেকে বিক্রি করে দিয়েছে কর্পোরেট জগতের এক বুড়ো খচ্চরের কাছে।

লালমাটিয়ার বাড়িটা কিছুতেই ছাড়েনি। প্রতি বছর রঙ করে। গাছ লাগায়। একজন বুড়ো দারোয়ান তার বুড়ি বউকে নিয়ে থাকে। আমি ফিরে এসেছি শুনে জুহি দেখতে আসেনি। কিন্তু ঝকঝকে খাওয়ার টেবিলে আমার পছন্দের খাবার থাকে। বিছানার চাদর তিন দিন পর ওয়াশে চলে যায়। হ্যাঙ্গারে টান টান হয়ে ঝোলে ভেজা শার্ট।

আমিই যাই। প্রতিদিন। সৈকতে ভেসে আসা মরা ঝিনুকের মত আমরা শুয়ে থাকি। আমার তিন বোন কোরাসে হাহাকার করে, দাদা তুই জুহিকে ফিরিয়ে আন। ফিরিয়ে আন দাদা।

জুহি ফিরে আসে না। আমাকেও ফিরিয়ে দেয় না। শুধু হাত খুলে দেখায় ওর হাতে কোন দড়ি নেই। তুই মুক্ত জাখার।

কিন্তু আমি জানি, আছে। পষ্ট দেখতে পাই জুহি টানছে—টানছে–

1 Comment

  • যুগান্তর মিত্র

    Reply March 13, 2021 |

    অসাধারণ দিদি। অসাধারণ!

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...