জীবনের জলছবি
মৌসুমী চৌধুরী

দিনে দুপুরেও চেম্বারের ভেতরে এলইডি আলো জ্বলজ্বল করছিল। তার তলায় চকচক করে ওঠে ডঃ মুখার্জির মুখটা। ডিম্বাকৃতি টেবিলের ওপাশ থেকে ভেসে আসা তাঁর গমগমে গলার স্বর যেন একেবরে দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছিল মধুজা আর তন্ময়কে!
“প্যাপিলারি অ্যাডিনোকার্সিনোমা। সরি টু সে, ইমিডিয়েটলি হিস্টেরেকটমি করাতে হবে। আসলে কি জানেন, ওভারিয়ান ক্যান্সার একদম বোঝা যায় না। চুপি চুপি শরীরে মারণ থাবা বসায়!”
চেম্বার থেকে বেরিয়ে মধুজা আর তন্ময় দেখে বাইরে পৌষের এক রোদমাখা দুপুর ঝলমল করছে। রাস্তায় দিব্যি নীরবে দৌড়চ্ছে ব্যস্ত মহানগর। হলুদ ট্যাক্সিগুলো লাইন করে পর পর ধৈয্য ধরে দাঁড়িয়ে আছে সিগনালে। সাদা পোষাকে ট্রাফিক পুলিশ বেশ দক্ষতার সঙ্গে ট্রাফিক মেনটেইন করছে। কোথাও কোন অঘটনের চিহ্ন নেই। শুধু টলছিল মধুজা। একটু আগে তাদের তিন বছরের বিবাহিত জীবনে ভীষন এক ঝড় উঠেছে। ভয়ংকর মরুঝড়!
আজকাল একদম কথা বলতে ইচ্ছে করে না মধুজার। কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। সাজতে ইচ্ছে করে না। কিচ্ছু ভালো লাগে না। তন্ময় বেরিয়ে গেলে স্নান সেরে কোনক্রমে দুটি খেয়ে বারান্দায় বসে থাকে। বারান্দার পুব কোণটা থেকে দেখা যায় ওদের ঘর-গৃহস্থালি। আবাসনের দারওয়ান রামপ্যায়ারে আর তার বৌ ফুলমোতিয়ার সংসার। পিঠোপিঠি তিনটি মেয়ে আর একটা ছেলে। আদুল গায়ে ঘোরে বাচ্চাগুলো। ফুলমোতিয়ার উঁচু পেট নিয়ে সব কাজ করে, আবারও অন্তঃসত্ত্বা সে। বাচ্চার জন্ম দেওয়াটা তার কাছে এখন জলভাত! সব কাজ সে একা হাতেই করে চলে। ভাত বসিয়ে ডাঁই করে রাখা জামাকাপড় ইস্ত্রি করতে বসে ফুলমোতিয়া। বড় মেয়েটা ভাত উথলানো দেখে। নামাবার সময় এলে ডেকে দেয় তার মাকে। একেবারে ছোটটা ছেলে, বছর দেড়েকের হবে। গুড়গুড় করে হাঁটতে শিখেছে!
একটা কান্না যেন দমকে দমকে উথলে উঠতে চায় মধুজার ভেতর থেকে… ছেলে ছিল, নাকি মেয়ে? সবে তো রক্ত ডেলা বেঁধে মাংসপিণ্ড হয়েছিল। বেঁচে থাকলে ও কি ফুলমোতিয়ার ছেলেটার মতোই হাঁটত এখন? আচ্ছা ও কি নিজের জীবন দিয়ে বাঁচিয়ে গেল মধুজার প্রাণ? মিস ক্যারেজ হল বলেই তো সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা হল। আর ধরা পড়ল তার শরীরে বাসা বেঁধেছে মারণ রোগ! নয়তো মাসের ওই কয়েকটি দিনে তলপেটে অসহ্য চাপধরা ব্যথা ছাড়া আর তো অন্য কোন সিম্পটমই ছিল না মধুজার… প্রতি মাসের ওই যন্ত্রণাটা আর নেই। হিস্টেরেকটমির পর চুকেবুকে গেছে সব। তাই তো আজও এ পৃথিবীতে নিঃশ্বাস নিতে পারছে মধুজা।
“বৌদি, আর কতক্ষণ এভাবে বাইরে বসে থাকবে? এখন একটু শুয়ে বিশ্রাম নাও না।”
মালতীর ডাকে চিন্তাজাল ছিঁড়ে যায় মধুজার। তাদের সংসারে রাত-দিনের কাজ করে মালতী। শাশুড়ির স্ট্রোকে প্যারালিসিস। তাঁকে দেখাশোনা করে, এছাড়া ঘরের অন্য কাজও করে। মধুজার অপারেশনের সময় এবং তারপরেও তার সংসারটা খুব ভালোভাবে সামলাচ্ছে মালতীই। কৃতজ্ঞ চোখে মালতীর দিকে নীরবে তাকায় মধুজা। সমান্তরালে চোখ চলে যায় সামনের উঁচু উঁচু আবাসনগুলোর চূড়ায়। ম্লান কমলা আলো ছড়িয়ে ডুবে যাচ্ছে সূর্যটা। গেটের ধারে বেগনভেলিয়া ফুলের ঝোপ থেকে পাখিদের কিচির-মিচির ডাক ভেসে আসছে। যেন কমলারঙা সূর্যটার জন্য বিদায় সম্বর্ধনা সঙ্গীত গাইছে ওরা জোট বেঁধে।
বিকেলের মরে আসা আলোয় ইস্ত্রি শেষ করে আধ-শোওয়া হয়ে বাচ্চাটাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে ফুলমোতিয়া। উঁচু পেট নিয়ে তো বসে খাওয়াতে পারে না। শরীরটা বেশ মুটিয়েছে তার। তার ঢাউস পেটটার দিকে বার বার চোখ চলে যায় মধুজার। নারী জন্মের পূর্ণতার চিহ্ন শরীরে বহন করে চলেছে আনপড়-দেহাতি মেয়েটা। তার আধখোলা ফরসা বুক দেখা যাচ্ছে। সারা শরীর থেকে একটা মা মা স্নিগ্ধতা উছলে পড়ছে। বুকের ভেতরে হঠাৎ একটা পাথুরে ওজন অনুভব করে মধুজা। এখুনি তন্ময় ফিরে আসবে অফিস থেকে। তাঁর সামনে যেতে আজকাল নিজেকে বড় অপরাধী লাগে। আর তন্ময় এখন যেন খুব বেশি বেশি করে চেষ্টা করে মধুজাকে ভালো রাখতে। কিন্তু আগের মতো সেই প্রেমে-পড়া সন্ধেগুলো, খুনসুটিগুলো ফিরে আসে না। তার বদলে মধুজার বুকের কোটরে অনবরত একটা অপরাধ বোধ আর হীনমন্যতা মিলেমিশে দলা পাকাতে থাকে।
তিন বছর আগে বিয়ের পর পর সময়গুলোতে সন্ধের প্রেম, খুনসুটিগুলো, হাহাহিহিগুলো থেকে উষ্ণতা বিইয়ে আসত রাত, কবিতার মতো রাত… তারপর আবার একটা ফুটন্ত সকাল… চায়ের প্লেটের তলায় চিরকুট, “আজ সন্ধেতে রেডি হয়ে থেকো। টিকিট কেটেছি “বীরজারা” দেখতে যাব।”
জীবন যেন ছিল এক উৎসব… উৎসবের জীবন। জীবনের শরীরে লেপ্টে ছিল তীব্রমধ্যম… মাদকতা!
তন্ময়ের জন্য একটা আলাদা রকমের মন খরারপিয়া বাতাস আজকাল ঝাপটা দেয় মধুজার বুকে। নিজের দুঃখ চেপে রেখে মধুজাকে আনন্দে ভরিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে ছেলেটা। একজন সৎ, সহজ-সরল, ভালো মনের মানুষ। মধুজার অসুখের কারণে মানুষটা বাবা হওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মেনে নিতে খুব কষ্ট হয় মধুজার। প্রথম প্রথম শাশুড়িমা নাতি-নাতনির সঙ্গে খেলাধুলো-গল্পগাছা করার আহ্লাদ প্রকাশ করতেন। তিনিও আজকাল নিজের অসুস্থতা আর মধুজার অসুস্থতা দুইয়ে মিলে কেমন যেন থম মেরে গেছেন। তাঁর চোখে একটা অনুচ্চারিত হতাশা দেখতে পায় মধুজা। একমাত্র ছেলের ঘরে বংশধর আসবে না এটা তাঁকে কষ্ট দেওয়াই তো স্বাভাবিক। কলিংবেলের সুরেলা আওয়াজে চিন্তায় ছেদ পড়ে মধুজার। ওই তন্ময় এল বুঝি। মালতী দোর খুলে দিচ্ছে। দাঁতে দাঁত চেপে কথাগুলো আজ তন্ময়কে বলার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায় মধুজা।
“চা করি? নাকি কফি খাবে?”
“কফি নয় তোমার হাতের লেবু দেওয়া মশলা চা খাওয়াও এক কাপ। তারপর তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে,” বেশ হৈ হৈ করে বলে তন্ময়।
নিশ্চয় কোথাও বেড়াতে যাবার পরিকল্পনা করেছে তন্ময়। মনে মনে ভাবে মধুজা। আর তখনই মনে জোর আনে কথাগুলো বলার জন্য।
“তোমাকে আমারও একটা কথা বলার আছে।”
“বলে ফেল। তারপর না হয় আমারটা বলব। আফটার অল, লেডিজ ফার্স্ট,” হাঃ হাঃ হাঃ, তন্ময়ের গলায় মজার ছোঁয়া।
কোন ভূমিকা না করে মধুজা বলে, “আমি মায়ের কাছে ফিরে যাব, তন্ময়। মানে বরাবরের জন্য। না না, তোমার ওপর কোন রাগ, অভিমান কিছু নেই আমার।”
আষাঢ়ের মেঘ নেমে এসেছে তন্ময়ের মুখে! তদের দু’জনের মাঝে বাতাস বিলাপ করে বয়ে চলে নিস্তব্ধতা! মধুজা বলে চলে মন খুলে,
“দেখো, আমি তো আর মা হতে পারব না। কিন্তু তুমি তো বাবা হতে পারবে। তুমি তো সু্স্থ স্বাভাবিক। আমার অসুস্থতার জন্য তোমাকে এ আনন্দ থেকে কিভাবে বঞ্চিত করি, বল তো?”
কোন সাড়া না দিয়ে মাথা নীচু করে আছে তন্ময়। ভেতরটা প্রাণপণে শক্ত রাখার চেষ্টা করে মধুজা, “তুমি নতুন করে অন্য কারও সঙ্গে আবার জীবন শুরু কর। একবার কাগজে সই করেছ বলে আমার সঙ্গেই থেকে যেতে হবে কষ্ট করে, এমন তো কোন কারণ নেই।”
টিক টিক শব্দে ঘড়িটা তাদের মাঝখানের স্তব্ধতা জানান দিচ্ছে। এবার মুখ খুলল তন্ময়, “হ্যাঁ, এটা তুমি ঠিকই বলেছ, মধু। কিন্তু তোমার সঙ্গে থেকে যাবার যে একটা বিরাট কারণ রয়েছে।”
“তা কি সেই কারণ, শুনি?” এবার কৌতূহলী হয় মধু।
“বলতেই হবে? থাক না, মধু।”
“বলো, শীগগির। আমাকে রাগাবে না কিন্তু।”
“কারণটা খুব সহজ মধু, তোমাকে ভালোবাসি। তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারব না! খুব কষ্ট হবে আমার।”
একটু দম নিয়ে তন্ময় বলে, “আর শোনো, ওই প্যারায়েলাল আর ফুলমোতিয়ার আসন্ন সন্তানটিকে দত্তক নেব আমরা। ওরাও রাজি।”
জীবনের জটিল সব সমস্যাগুলোর এমন সব সরল সমাধান থাকে! কী অবলীলায় উঁচু উঁচু সিঁড়িভাঙ্গা অঙ্কগুলো কষে ফেলে তন্ময়। ও কি ম্যাজিক জানে? শুধু এই জন্যই তন্ময়ের সঙ্গে বাকী জীবনটা কাটিয়ে ফেলা যায়! মুখ নিচু করে ঝাপসা চোখে ভাবল মধুজা।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...