জয়দেব থেকে জয়দেব
সুবীর ঘোষ

বীরভূমের মানুষ দুজন বিশাল মাপের কবির জন্য গর্ববোধ করতে পারেন । একজন রবীন্দ্রনাথ যাঁর জন্ম বীরভূমে না হলেও কর্মস্থান অধিকাংশত বীরভূম । অন্যজন তারও বহু আগে—কবি জয়দেব গোস্বামী । তিনি যে বীরভূমজাত তার কথা তাঁর অমর সৃষ্টি গীতগোবিন্দতেই পাওয়া যায়—বর্ণিতং জয়দেবকেন হরেরিদং প্রবণেন ।

কেন্দুবিল্বসমুদ্রসম্ভবরোহিণীরমণেন ।।

( সাগরসম্ভূত রোহিণীনাথ চন্দ্রমার ন্যায় কেন্দুবিল্বগ্রামজাত জয়দেব-কবি শ্রীকৃষ্ণের চরণকমলে নমস্কারপূর্বক এই বিরহকীর্তন করিলেন । )

রাধাকৃষ্ণের লীলামাহাত্ম্য অনুভবের বিশেষ সহায়ক বলেই গীতগোবিন্দ শ্রীচৈতন্যদেবের প্রিয় ছিল । আধ্যাত্মিক প্রেমরসের সঙ্গে সুন্দরভাবে এসে মিলেছিল লোকায়ত যাপনের দেহচর্চা । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর গীতগোবিন্দের রচনা-উৎকর্ষের প্রশংসা করেছিলেন । অধ্যাপক করুণাসিন্ধু দাসের মতে–‘সংস্কৃত কাব্যের ইতিহাসে মেঘদূতের পর গীতগোবিন্দ সবচেয়ে জনপ্রিয় কাব্য — যার জনপ্রিয়তা আজও অম্লান’ ।

কেঁদুলির মেলার জন্য বছরে একবার অন্তত আমরা মহাকবি জয়দেবকে স্মরণ করি। তাঁর অমর সৃষ্টি গীতগোবিন্দ জাগতিক ও ঐশ্বরিক প্রেম ও ভক্তির মিশ্রণে রচিত এক অপূর্ব কাব্যসুষমার সমাহার।

১২শ শতকের মানুষ জয়দেব। গৌড়াধিপতি লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি ছিলেন। অল্প বয়সেই জয়দেব পুরীতে জগন্নাথদেবের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। সে সময়ের উৎকলরাজের রাজসভাতেও তিনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। জীবনের শেষভাগ তিনি কেন্দুবিল্ব বা কেঁদুলিতে অতিবাহিত করেন।

ললিতলবঙ্গলতাপরিশীলনকোমলমলয়সমীরে

মধুকরনিকরকরম্বিতকোকিলকূজিতকুঞ্জকুটীরে।

 (ললিত লবঙ্গলতা তাহার মিলনে।

কোমল মলয়বায়ু বহে অনুক্ষণে।।

মধুকর-নিকট-বেষ্টিত সব ঠাঞি।

কোকিল কূজিত কুঞ্জ-কুটীরে সদাই।। )

অথবা

স্মরগরলখন্ডনং মম শিরসি মন্ডনম্

দেহি পদপল্লবমুদারম্।

( সরস অলক্তকরঞ্জিত কামনাবিষের খন্ডনকারী তোমার মনোহর পদপল্লব আমার মস্তকের ভূষণ হোক্ )

জয়দেবের আরো দুটি বহুশ্রুত পঙক্তি উদ্ধৃত করব।

প্রলয়পয়োধিজলে ধৃতবানসি বেদং ( প্রলয়কালে বেদ সাগরে নিমগ্ন হলে তুমিই সেই বেদ রক্ষা করেছিলে )

এবং

বদসি যদি কিঞ্চিদপি দন্তরুচিকৌমুদী

হরতি দরতিমিরমতিঘোরম্।

( তব দন্তরুচি রূপ কৌমুদী সকল।

নাশে ঘোরতর তম করয়ে উজ্জ্বল।। )

রবীন্দ্রনাথ কালিদাস-সাহিত্যের ভক্ত ছিলেন । তাঁর পূর্বজ বীরভূম-নিবাসী কবি জয়দেব সম্বন্ধে বা বীরভূম  সম্বন্ধে তিনি কিছু লিখেছিলেন কী না আমার জানা নেই । তাঁর রচনায় স্থান ও কাল কখনোই খুব একটা চিহ্ন রাখে না বলেই হয়তো তিনি কালজয়ী কবি হতে পেরেছেন । যাই হোক্ সে সব সরিয়ে রেখে আমরা  তাঁর লেখা সেই অমর গানটি আর একবার পড়ব—

মোদের শালের ছায়াবীথি  বাজায় বনের কলগীতি,

সদাই পাতার নাচে মেতে আছে আমলকী-কানন ।।

সেই চেনা আমাদের শান্তিনিকেতনকে আমরা আবার খুঁজে পেলাম  বিশ্বভারতীতে অধ্যাপনা করা কবি অশোকবিজয় রাহার লেখায়—

এলো প্রতীক্ষার ক্ষণ

স্বপ্ন দেখে শান্তিনিকেতন

নির্জন বকুলকুঞ্জ , আম্রবন

লাল পথে শালবীথি

জ্বালে স্মৃতি

সন্ধ্যার সিঁদুরে রাঙা সিঁথি ।   (স্বপ্ন-সন্ধ্যা )

শান্তিনিকেতনের আর এক অধ্যাপক-কবি নরেশ গুহর কবিতা ‘শান্তিনিকেতনে ছুটি’ অনেকেই পড়েছেন । সে কবিতার কিছু অংশ ফিরে পড়া যাক্—

শান্তিনিকেতনে বৃষ্টিঃ  ছুটি শেষ । ভিজে আলতা-লাল

শূন্য পথ । ডাকঘরে বিমুগ্ধ কাউন্টার চুপ । কাল

হয়তো রোদ্দুর হবে , শুকোবে খোয়াই , ভিজে ঘাস ।

লোহার গরাদ ঘেরা আম্রকুঞ্জে কবিতার ক্লাস

কাল থেকে ফের ।

বীরভূমের বিখ্যাত শাল-শাল্মলী-অর্জুন গাছের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হননি এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর । সেই গভীর শালবনের কথাই এসেছে বীরভূমের আর এক খ্যাতনামা কবি-অধ্যাপক সুধীর করণের কবিতায়—

আর কী যেতে পারি

গভীর জ্যোৎস্নায় শালের বন ছেড়ে

মরতে হয় যদি

মরবো এখানেই ।

হঠাৎ  জ্যোৎস্না–গভীর শালবনে

থমকে দাঁড়ালো সে ।

                     (জ্যোৎস্নার শালবনে )

বীরভূমের হরিওকা গ্রামে জন্মেছিলেন তিনি । কবিরুল ইসলাম । তাঁর মতে হরীতকী শব্দ ভেঙে হয়েছে এই হরিওকা । হতেও পারে । রাঢ়-বাংলায় আমলকী হরীতকী বহেড়া গাছের প্রাচুর্য ছিল এক সময় । সারাটা জীবন  বীরভূমে কাটিয়ে গেছেন কবিরুল ইসলাম । তিনিও কবি-অধ্যাপক । সিউড়ি লিখতেন শিউড়ি বানানে । তাঁর একটি সুপরিচিত কবিতা ‘শিউড়ি পেরিয়ে’ ।

পুলিশ প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছুলে

সামনেই সাজানো আকাশ—

অদূরে স্টেশন , ব্রিজ দুবরাজপুর রোডের উপর

দু’একটি ট্রেন আসে, যায় ।

পিছনে স্মৃতির চাঁদ শিউড়ি পেরিয়ে !

বীরভূমের সুখ্যাত কবি ও গীতিকার ছিলেন আশানন্দন চট্টরাজ । বীরভূমের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল ও তার মহুয়াফুলের গন্ধ তাঁর স্মৃতিতে ভেসে এসে তাঁর কবিতায় আশ্রয় নিয়েছে । এ যেন মাতৃভূমির প্রতি কবির কৃতজ্ঞতা ।

যখন ফাগুনরাতে, দূরের মহুয়া বন গেছে ভেসে,

বাঁধভাঙা মায়াবী সে জ্যোৎস্নার বানে ।

তখন এ পৃথিবীর সুন্দর যত কিছু তোমাকেই চেয়েছি যে দিতে । 

                                                (খুঁজেছি নিভৃতে )

বীরভূমের আর এক সুসন্তান কবি ও গদ্যকার সমরেশ মণ্ডল । হিংলো ও অজয় বীরভূম-বর্ধমানের এই দুই নদীর পাড় ধরে তাঁর শিক্ষাযাত্রা , কর্মজীবন এবং স্মৃতিচর্চা । বীরভূমের তৎকালীন শান্ত প্রকৃতি থেকে কয়লাখাদান নানা সময় তাঁর কবিতায় জায়গা নিয়েছে ।

ওখানে মোহানা ছিল এখন তা স্মৃতিবাহী পেনসিল

রেখা । শিশুশিল্পী তার অবলম্বনহীন টানেও যেন

নিপুণ করেছে কাঁদর প্রণালীর জলরেখা , শুধু

নদী তার ফিস্ ফিস্ স্বর বড্ড গোপনে শোনায় ।

                           (খয়রাশোল ২০০০ )

বীরভূমের মানুষ ডঃ আদিত্য মুখোপাধ্যায় । তারাশঙ্কর-গবেষক । রাঢ়-বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চায় তাঁর অসামান্য অবদান । নিয়মিত কবিতা লেখেন । কেঁদুলি নিয়ে তাঁর বেশ কয়েকটি কবিতা আছে । তেমনই একটির অংশবিশেষ—

গেরুয়া মাটির গানে কারা যেন বলেছিল, ‘অজয়ে অপার

ভালোবাসা’ । সারারাত, শ্মশান-বন্ধুর সাথে তমাল তলায় মৌতাত ।

কবি প্রবীর দাসের জন্ম, কর্ম, বসবাস সবই বীরভূমে , মাঝের কিছু সময় বাদ দিয়ে যখন তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ছিলেন । শান্তিনিকেতন থেকে একটি নিয়মিত পত্রিকা বের করে চলেছেন—‘আজকের কবিতা’ । ৫৬টি কাব্যগ্রন্থের প্রণেতা । এ হেন কবির স্মৃতিতে জুবুটিয়া- বোলপুর- শান্তিনিকেতন ঘোরাফেরা করে ।

বোলপুরের একটি স্কুল-ঘর জুড়ে এ কেমন বিকেলের স্তব্ধতা এখন—দেওয়ালে নির্মিত

ব্ল্যাকবোর্ড একদম ফাঁকা, কুচকুচে কালোয় উজ্জ্বল । আজ সকালে কেউ রং করে গ্যাছে —

আমার চোখ ও মন বিঁধে গেল ওতে–           ( বাবাকে যখন ফিরে পাই-৪ )

বর্তমান প্রতিবেদক সুবীর ঘোষ অর্ধশতাব্দী ধরে কবিতা ও কথাশিল্পচর্চায় নিয়োজিত । তিনিও বীরভূমের সন্তান । তাঁর অনেক লেখায় বীরভূমের তৎকালীন প্রকৃতির পরিচয় পাওয়া যায় ।

হিংলোনদীর জলে প্রায় বালির কাছাকাছি ক’টা খলসে মাছ

হাত দিয়ে ছোঁয়া যায় যদি, মনোরম উল্লাসে ব্যতিব্যস্ত থাকি সারাদিন ।

সমস্ত অঞ্চল জুড়ে খুঁজে ফিরি ঝুলে থাকা ধুধুঁলের গাছ ;

শুকনো পাতার ধোঁয়া শীত আনে ।

                                       (কেউ সুখী নয় )

কবি জয়দেব বসু । আমাদের দুর্ভাগ্য যে তিনি আর আমাদের মধ্যে নেই । তিনি এক অকাল-নিঃশেষিত কবিপ্রতিভা । শান্তিনিকেতনে আংশিক শিক্ষাজীবন । বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি লিখেছিলেন—

আমার কাঁধের উপর

থাকুক তোমার ভার

আমি হাঁটতে থাকি

আকাশ-বাতাস যার

যে পার হবে কান্তার

সে তো আমার মধ্যে

বকুল ঝরে ঝরুক,

আমি হাঁটতে থাকি…

দুই মহাকবি জয়দেব ও রবীন্দ্রনাথ—এর মাঝখানে অনেক কবি । অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবি । আবার অনেক কবি স্বল্পচর্চায় বা উপযুক্ত আলোর অভাবে অদৃশ্য হয়ে গেছেন । আবহমান বাংলা কবিতার ইতিহাসে সেই সব বীরভূম-নিবাসী কবির ভূমিকাও কম নয় । আবার যাঁরা প্রচারে আছেন , লেখণীও সচল তবু পরিসরের সীমাবদ্ধতার কারণে এবং আমার পাঠবৃত্তের সংকীর্ণতার জন্য তাঁদের কবিতা নিয়ে এখানে আলোচনা করা গেল না । তাঁদেরকে সসম্মানে বারান্তরের আলোচনার জন্য তুলে রাখলাম । দ্বিজ চন্ডীদাসও  বীরভূমেরই মানুষ ।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...