চয়ন ভৌমিকের কবিতা

১) অপ্রাকৃত

ওরা বাউল মন, রূপকথার স্বপ্নিল মেঘ। আকাশের রং সবুজ এঁকে, ওরা শিশু লিওনার্দো। এই উদাসীনতায় আমি খুঁজে বেড়াই একরাশ প্রজাপতির চমৎকার। জড়ানো কথার মধ্যে দিয়ে উড়ে আসে হাওয়া। সরল চোখের আড়ালে নিবিড় প্রশ্ন উঁকি মারে। আমরা উত্তর দিতে পারি না আসলে। আপাত সাজে লুকিয়ে ফেলি ব্যর্থতা।
খেলা হয়ে যায় সমগ্র জীবন। চোখে পড়ে, সাত ঋষির হাত ধরে মাটিতে নেমে এসেছে অসংখ্য তারাদের আলো। ভোরের ফুলে যারা মসৃণ, টলমল হয়ে, এইমাত্র খুলে দেখাচ্ছে আমাদের আভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন।
প্রাণ ও পদার্থের প্রকৃত রূপ…

২) ইতিহাস

শূন্যটাকে উল্টে ফেলি। শূন্যই ফিরে আসে আবার। অদূরে আয়না। গভীর চোখ। পালাবো কোথায়? সর্বত্র আমি ও আমার প্রতিবিম্ব। আমার দিকে তাকিয়ে দর্শক। বিমূঢ় হয়ে যাই। জন্ম ও মৃত্যুর মাঝে হাঁটি খানিক্ষণ। লম্বা রাস্তা। মাইলস্টোনে পথ চলার হিসাব। অথচ কিছুই তো করতে পারলাম না। সরণ কই? ত্বরণ ও মন্দনের মাঝে স্থিতি জাড্য, বুল-শিট বিজ্ঞান। বিমানের এম এস সি টা মনে পড়ে। মনে পড়ে তার সেলসম্যান-ক্লান্ত হাঁটা, বিক্রিহীনতার কৌতুক চোখ। নিজের চাকরিটাকে আততায়ী মনে হয়। বিমান ফার্স্ট বয় ছিল, আর আমি মধ্যবিত্ত।
শূন্যটাকে উল্টে ফেলি আবার। বিমান ফিরে আসে স্বপ্নে। বেঞ্জামিন ফ্র্যাংক্‌লিন ঘুড়ি ওড়ায়, তার কলকাঠিতে বজ্রগর্ভ মেঘ। বিদ্যুতের আসল চাহিদা।

৩) তাপবিদ্যুতের দেশে

এখানে আমি আর নদীটিই একমাত্র বোকা। দুজনেরই ধারা বাঁক পেরিয়ে, অজানা মোহনার দিকে … দূরে চিমনির ধোঁয়া; পাড়ে বাঁধা নৌকা আমাদের স্পর্শে দুলে ওঠে, যেন কোথাও, কোনো অতল গভীরে জল কেঁপে ওঠে – কূপমণ্ডুক ভয়ে। আমাদের ঘিরে ধরে কালপুরুষ, তারাদের অব্যবহৃত বর্জ্য, পোড়া কয়লার ছাই। ধূর্ত শেয়ালের লুকানো চোখ, নির্ঘুম রাতে, নক্ষত্রপতন একতারা বাজায় চেতনার আবছায়া ঘিরে। ভ্রু-কেশ করতলে ভাসে, কিছু চাই হিসেবমতো – কিন্তু কী বা কতটা ভুলে যাই পরমুহূর্তেই।

নদী ও আমি তাকাই পরস্পরের দিকে। বিপ্রতীপ হতে সায় দেয় না মন। আমি ওকে ‘মাহি’ নামের অর্থ জিজ্ঞাসা করাতেই, হঠাৎ মেঘ করে আসে। আকাশে বৃষ্টির দাগ দেখবো বলে, এই দেখো কেমন যে’কোনো পাত্রের অবয়ব হয়ে গেছি আমরা।

৪) গুপ্তধন

এই সিঁড়ি নেমে গেছে সুড়ঙ্গের গভীরে। প্রদীপ ও অন্ধকার পাশাপাশি রেখে অসংখ্য প্রলোভন, সন্তর্পনে খুলে ফেলেছে মানচিত্রের শরীর। এরপর শুধু খোঁজ। সোঁদা গন্ধের পাশে ভিজে দেওয়াল, ঠিকরে দেয় শ্যাওলার পিছলে সংকেত। অদম্য তৃষ্ণা টেনে নীচে নামায় আরও। আরও অসংখ্য রাস্তা, পথ হারানোর চিহ্ন খুলে দেয়। স্নায়ু টান হলে, আমরা থামি খানিক। দেখি পথ শেষ। যক্ষের ঠিকানায় আমাদের স্বাগত জানায় একমুঠো ধুলোর কান্না। ফেরার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় ধীরে।

৫) সাদাকালো সিনেমা

গড়িয়াহাটের ফুটপাথ যেন অথর্ববেদের দেশ। মার্চ মাসে ওখান থেকেই আমি কিনেছিলাম চৈত্র মাসের হাওয়া, সস্তার কৃষ্ণচূড়া ফুল। গোলপার্কের দিক থেকে উড়ে আসা কালবৈশাখীর ঝড়ে এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল আমার পরিপাটি চুল। দৌড়ে দাস কেবিনে ঢুকে পড়াই লেখা ছিল আমার অদৃষ্টে। মোগলাই প্লেটে নিয়ে, দূর থেকে নজর রেখেছিলাম কিভাবে বিদ্যুৎ চমকায় প্রথমে, তারপর, বুক কাঁপানো বজ্রপাত – গাঢ়, কালোমেঘ মাথায় এগিয়ে যায় রাসবিহারী এভিনিউয়ের দিকে। বৃষ্টি নামে চব্বিশ/ ঊনত্রিশ ট্রামের গায়ে। আমার ইভনিং শোয়ের ভিজে টিকিট প্রিয়া সিনেমা হলে পৌঁছে দেয় আমাকে। আর তখনই চোখে পড়ে আবার, একঝলক ঝড়ের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা, মিষ্টি বাতাস খেলা করছে প্রাগৈতিহাসিক সেই রোলস রয়েসের খোলা ছাদে। আর, অবর্ণনীয় ধুলোময় তারারা আমার চুলে নির্বাক স্তব্ধতায় ছুঁয়ে দিচ্ছে আমার চলচিত্র প্রেম।

5 Comments

  • Soma Dutta

    Reply March 17, 2021 |

    অসাধারণ একটি মেধাবী কলম। বিমূর্ত ইঙ্গিতে টুকরো টুকরো মূর্ত ছবির আভাস। পাঁচটি অধ্যায় পঞ্চামৃত, তবে ইতিহাস ও তাপবিদ্যুতের দেশে বিশেষভাবে স্পর্শ করলো।

    • chayan

      Reply March 21, 2021 |

      অনেক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা

  • সূর্য মণ্ডল

    Reply March 22, 2021 |

    চয়ন সব গুলি কবিতা দারুণ

  • LIPI SENGUPTA

    Reply March 27, 2021 |

    অসাধারণ! সব কটি কবিতাই ভালো লাগল পড়ে

  • Kaushik Sen

    Reply April 2, 2021 |

    মায়াবী কলম। সম্মোহিত হয়ে গেলাম।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...