চোর
যুগান্তর মিত্র


কিছুক্ষণ আগে মন্টুদার মৃতদেহ শুয়েছিল উঠোনে। শেষ শয্যায়। আর এখন চোরের মতো চলে যাচ্ছে মন্টুদা। যেমন ছিল স্বভাব, তেমন করেই চলে যাচ্ছে চিরকালের জন্য। কেউ তার মুখ দেখতে পায়নি। পাওয়ার কথাও নয়। পোস্টমর্টেমের পরে পুরো ব্যান্ডেজ করা শরীরটা ঘণ্টা দুয়েক আগেই দিয়ে গিয়েছিল পুলিশের গাড়ি।
সারা শরীর যার ঢাকা, তার ব্যান্ডেজ করা প্রাণহীণ শরীরের চারপাশে কয়েকটা মাছি উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছিল। মন্টুদার শরীরে বসার মতো উপযুক্ত জায়গা খুঁজছিল। যে-কোনও মৃতদেহেই বসার মতো ঠিক জায়গা খুঁজে নেয় মাছিরা।
দরমার বেড়ার ঘর। তার সামনের ছোট্ট উঠোনে শুয়েছিল মন্টুদার নিষ্প্রাণ শরীর। খানিকটা দূরে ঘরের বাঁশের খুঁটি ধরে বসেছিল মন্টুদার বউ বেলাদি। আমরা কেউ বউদি বলি না। বেলাদি বলেই ডাকি। আসলে বেলাদির বাপেরবাড়িও খুব দূরে নয়। সেই থেকে চেনাজানা। বিয়ের আগে দিদি ডাকতাম। পরে আর সেই ডাকের বদল ঘটেনি। ভালোবেসে মন্টুদাকে বিয়ে করেছিল বেলাদি।
গতকাল সন্ধ্যায় মন্টুদার গুলি খাওয়ার খবরটা আসে। কোনও একজন এসে উঠোনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে গিয়েছিল, মন্টুদা গুলি খেয়ে মরে গেছে বৌদি। খালপাড়ে ডেডবডি পড়ে আছে। তাড়াতাড়ি যাও। কে বলেছে কথাটা বেলাদি দেখতে পায়নি। তখন ঘরের ভেতরে ছিল। কথাটা বলেই সংবাদদাতা চলে গিয়েছিল দ্রুত। সেই মৃত্যুসংবাদ শুনেছিলেন আমার বাবাও। দোতলার বেলকনিতে বসে সংবাদদাতাকেও দেখতে পেয়েছিলেন তিনি। অবসরের পরে বাবার কাজ বলতে সকাল আর বিকেলে বাগানে পায়চারি করা। আর সন্ধে থেকে আমার বাড়ি ফেরার আগে পর্যন্ত সেখানে বসে বসে রাস্তায় মানুষের চলাচল দেখা, তাদের কথাবার্তা শোনা।
আমি অফিস থেকে ফেরার পথেই শুনেছিলাম মন্টুদার পিঠে গুলি লেগেছে। কাদের গোলমালে এমন ঘটনা ঘটল, কার গুলিতে প্রাণ গেল মন্টুদার, সবই হাওয়ায় ভাসছে। গুলিটা মন্টুদার এপাশ দিয়ে ঢুকে ওপাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। এসব খবর নিয়ে অনেকটা সময় কেটে গিয়েছিল বলে বাড়ি ফিরেছি একটু দেরিতে। ঘরে ঢোকার আগে একবার মন্টুদাদের বাড়ির দিকে চোখ চলে গিয়েছিল স্বাভাবিক ভাবেই। মৃত্যুসংবাদ জানাই ছিল, তার ওপর উঠোনে কয়েকজন মানুষ ইতস্তত দাঁড়িয়েছিল তখন। কেউ কেউ টিনের দরজা দিয়ে ঘরের ভেতরে চোখ রাখছিল। আর ভেতর থেকে বেলাদির কান্নার বিলাপ ভেসে আসছিল। তাই সেদিকে চোখ যাওয়া অনিবার্যই ছিল।
আমি অফিস থেকে ফিরলেই বাবা নীচে নেমে আসেন। আমার হাতে থাকে সান্ধ্য কাগজ। ফেরার পথে ট্রেনে বসে বা দাঁড়িয়ে উল্টেপাল্টে দেখি। ভালোই সময় কেটে যায়। ঘরে ফিরলে বাবা সেই পেপারটা পড়েন।
বাবার হাতে পেপারটা তুলে দেওয়ার সময় মন্টুদার গুলি খেয়ে মরে যাওয়ার কথাটা জানালেন আমাকে। আমি যে আগেই শুনেছি, সেকথা বলিনি আর। কেননা জানি, বললেও আবার শুনতেই হবে। সেইসময়ই বাবা জানালেন, একজন উঠোনে দাঁড়িয়ে মন্টুদার গুলি খাওয়ার কথাটা বলে গেছে।
এমনভাবে জোরে জোরে বলল, যেন কী এক ভালো খবর দিয়ে গেল। রাস্কেল কোথাকার!
বাবার এই একটিই গালি। সবাইকেই এক গালি দেন। এমনকি চশমা কোথায় রেখেছেন ভুলে গেলেও একই গালাগাল করেন নিজেকেও। ‘আমি এমন এক রাস্কেল, কোথায় যে নিজের জিনিস রাখি ভুলে যাই!’ ফলে বাবার মুখে এই কথাটা গা-সওয়া হয়ে গেছে আমাদের। এরপরই বাবা যে কথাটা বলেছিলেন, তাতে আমি অবাক। গলা শুনে নাকি মনে হয়েছে, বিট্টু শেখ কথাটা বলেছে। বিট্টু অনুরূপ ভৌমিকের দলের লোক। এককথায় অনুরূপের ছায়াসঙ্গী। সে এসে জানিয়েছে খবরটা! বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ বাবার মুখের দিকে। তারপর হাতমুখ ধুয়ে চা খেয়ে একবার গিয়েছিলাম মন্টুদার বাড়িতে। সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমি ঠিক জানি না। তাই চুপ করে দাঁড়িয়েছিলাম কিছুক্ষণ। বেলাদি তখন আমাকে দেখেও বিলাপ করেছিল। এরপরে একবার ক্লাবে ঢুঁ মারতে গিয়ে মন্টুদার খবরটা জানলাম বিশদে। অনুরূপের দলের লোকেরা গোলাগুলি ছুঁড়েছে বেশি। সুশীলের দলের লোকসংখ্যা কম। তাই তারা বেশি সুযোগ পায়নি। অনুরূপ আর সুশীল একই দলের দুই গোষ্ঠী। মন্টুদার গায়ে যে গুলিটা লাগে, সেটা অনুরূপের দলের কারও পিস্তলের গুলি বলেও কেউ কেউ বলাবলি করছিল। যদিও সবই ছিল ফিসফিসানি। সত্যি মিথ্যে জানি না। বেলাদিকে যে মন্টুদার ডেডবডি পড়ে থাকার খবর জানিয়ে গিয়েছিল, সেই বিট্টু শেখ আমাদের পাড়াতেই থাকে। পার্টি করলেও মারামারির সময় ফ্রন্টে থাকে না। ওরা কয়েকজন দলের কোর কমিটির লোক। নানা সিদ্ধান্ত নেয়, তোলা আদায় ইত্যাদির ভাগ পায়।
ক্লাব থেকে তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে বাবাকে বললাম, এসব কথা আর কাউকে বোলো না। সবাই হয়তো জানে অনুরূপের দলের হাতেই মন্টুদা খুন হয়েছে, এমনকি বিট্টু যে খবরটা জানিয়ে গেছে বাড়ি বয়ে এসে, সে খবরও অনেকেই জানে। কিন্তু সকলের মুখেই কুলুপ। তাই তুমিও কিচ্ছুটি উচ্চারণ কোরো না এই নিয়ে। কী দরকার ঝামেলায় যাওয়ার? কোথা থেকে কী হয়ে যাবে কে জানে!
গতকাল খবরটা শোনার পরেই দৌড়ে গিয়েছিল বেলাদি। তার পরপরই পুলিশ লাশ নিয়ে গেছে। আজ আবার সন্ধ্যায় পুলিশ এসে কাটাছেঁড়া করা লাশটা দিয়ে গেছে বাড়িতে। কাল সন্ধ্যা থেকে অনেক কেঁদেছে বেলাদি। বেশি রাত পর্যন্ত আমাদের কানে বেলাদির বিলাপ পৌঁছেছিল। আজ সেই কান্না শুকিয়ে গেছে। কিংবা অবসন্ন শরীরে, নির্ঘুম চোখের নীচে যন্ত্রণার কালি লেপ্টে আছে, সেখানেই হয়তো লুকিয়ে আছে বেলাদির চোখের জল।
আমাদের বাড়ির পেছনে আছে মস্ত এক বাগান। আম, জাম, জারুল, সুপুরি, নোনা ফলের গাছ ভরে আছে। কিছু জংলি গাছও আছে। আর আছে কয়েকটা নারকেল গাছ। ঠাকুরদা উচ্চারণ করতেন নারিকেল গাছ। অনেকেই বলে ‘সতীনাথের বাগানবাড়ি’। এলাকায় এই নামটাই প্রচলিত। সত্যিই বাগানবাড়ি যেন। কিছুতেই কোনও গাছ কাটতে দিতেন না ঠাকুরদা। ফল ভরে গেলেও বিক্রি করতেন না। বলতেন, ‘গাছের ফলপাকুড় কি বিক্রির জন্য? বাড়ির ছেলেপিলেরা খাবে। সবাই খাবে।’ প্রতিবেশীদেরও খুশিমনে বিলোতেন তিনি।
আমাদের পাশের বাড়ি থাকে মন্টুদা। থাকে নয়, থাকত বলা উচিত। রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ করত। যার যেমন আয়, তার তেমন সংসার চলে। সেই হিসাবে মন্টুদার সংসার খারাপ চলত না। বেলাদিও মেশিনে সেলাই করে আয় করে। ছেলেমেয়ে নেই। খরচ আর কী এমন! তবু মন্টুদা বাগান থেকে আম, নারকেল, পেঁপে এইসব চুরি করত। ধুপ করে শব্দ হলে আমরা কেউ ছুটে যেতাম। গিয়ে কিছুই পেতাম না। ভেজা মাটিতে ছাপ পড়ে থাকত নারকেল, পেঁপে বা আমের। মন্টুদা নিয়ে নিত আগেই। আমরা কখনোই মন্টুদাকে বামাল ধরতে পারিনি। কিন্তু নিশ্চিত ছিলাম মন্টুদাই নিয়েছে। কেননা টিনের দরজার পাশে চোখ রেখে চোরের মতো দেখত আমাদের গতিবিধি। আশেপাশে আর কেউ থাকত না যে তাদের কাউকে সন্দেহ হবে আমাদের। সব বুঝেও হতাশ হয়ে চলে আসতাম। জোরে জোরে শাসাতাম, ‘হাতেনাতে ধরতে পারলে পুলিশে দেব।’ অথচ ঠাকুরদা ওদের কিন্তু নারকেল দিতেন। বেশিই দিতেন। কারণ ঠাকুরদা মন্টুদাকে কেন যেন পছন্দ করতেন। চুরি করে জেনেও অদ্ভুত দুর্বলতা ছিল দেখেছি। ঠাকুরদা নেই বলে বাবা কিন্তু ওদের বঞ্চিত করেন না। বরং বাগানের আম, জাম, জামরুল, পেঁপে বা নারকেল বেশিই দেন। তবু মন্টুদা চুরি করবেই।
এ ওর স্বভাব। কী আর করব বল!
আমরা উষ্মা প্রকাশ করলে বাবার সংক্ষিপ্ত জবাব এটাই। আমি বা মা এর বদলে নানা কথা বললেও চুপ করে থাকেন বাবা। যেন যা বলার বলে দিয়েছেন। আর কোনও কিছু বলার নেই।
অনেক আগে মন্টুদার সঙ্গে মাঝেমাঝে কথা হত আমার। একদিন দেবার চায়ের দোকানে দেখা হয়েছিল মন্টুদার সঙ্গে। সেদিন হয়তো কাজ ছিল না। সচরাচর দেবার দোকান ফাঁকা থাকে না। রবিবারের বিকেলে তো ফাঁকা থাকার কথাই ছিল না। তবু অদ্ভুত রকমের ফাঁকা সেদিন। কথায় কথায় সেদিন জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তুমি লেখাপড়া শিখতে চাওনি নাকি? বাবা বলছিলেন।
ঠিকই বলেছে কাকা। আমার পড়তে ভালো লাগত না।
তোমার কাকা নাকি খুব চেষ্টা করেছিলনে পড়ানোর? মামারা অবশ্য সেইরকম চেষ্টা করেননি। সবই আমার শোনা কথা।
কাকা চাইত আমি পড়াশোনা করি। কাকিমা যেমন উৎসাহ দেয়নি, তেমনি বাধাও দেয়নি। তবে মামারা চাইত না, তা কিন্তু নয়। ওরাও চাইত। আমারই ইচ্ছে করেনি। এই নিয়ে আফসোসও নেই আমার।
সেকি! ইচ্ছে করত না কেন?
করত না মানে করত না। আমার বাবা নকশাল ছিল জানিস তো?
হ্যাঁ জানি। কথাটা বলেই আমি চুপ করে বসেছিলাম। পড়াশোনা না-করার সঙ্গে বাবার নকশাল হওয়ার কী সম্পর্ক, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আজও বুঝি না।
যার বাবা নকশাল করত, তার দিকে কেমন চোখে যেন তাকাত লোকজন। আমার খুব অসহ্য লাগত। ছোটবেলায় তো অত বুঝতাম না। একটু বড় হয়ে বুঝলাম। বন্ধুরা জিজ্ঞাসা করত, তোর বাবা গুলি খেয়ে মরেছে? এমনভাবে প্রশ্ন করত, যেন বাবা চুরিটুরির মতো অপরাধ করেছে। বন্ধুদের বাবা-মায়েরাও অন্যরকম চোখে দেখত, বুঝতে পারতাম। কেমন যেন ভয় বা ঘেন্না। একদিন এক বন্ধুর মা জানতে চাইল, তোমার বাবা নকশাল করতেন? সেদিন খুঁটিয়ে আরও কিছু জিজ্ঞাসা করেছিল সেই বন্ধুর মা। তারপর থেকে বন্ধুটা আমাকে এড়িয়ে চলত। অন্য বন্ধুরাও মিশতে চাইত না। যেন আমি একজন বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা মানুষের ছেলে, যে ভুল স্বপ্ন দেখে সমাজ থেকে হারিয়ে গেছে।
এসব তোমার মনের ভুলও হতে পারে। আমি বলেছিলাম। কিন্তু কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জবাব চলে এসেছিল।
হতে পারে। এই নিয়ে এখন আর আমি ভাবি না। ভুল কি ঠিক ভেবে এখন লাভ কী! তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল, দিনবদলের স্বপ্ন দেখত বাবা। কী হল বল তো? একটা স্বপ্ন দেখতে গিয়ে আমাদের সংসারের স্বপ্নটাই শেষ হয়ে গেল। আমার মাকেও আমি হারালাম ওই লোকটার জন্য! মন্টুদার গলায় ছিল হাহাকারের চিহ্ন।
এই যে জোগালির কাজ করো, তুমি তো মিস্ত্রিও নও, মনে হয় না পড়াশোনা করলে ভালো চাকরি পেতে?
দ্যাখ তকাই, কী হলে কী হত, এসব ভেবে লাভ নেই। এখন তো আর এই নিয়ে কিছু করতে পারব না! তাই ভাবিও না। এখন আমি যা আছি, ভালোই আছি।
তকাই আমার বাড়ির ডাকনাম। বাড়ি ছাড়া একমাত্র মন্টুদা আর বেলাদি আমাকে তকাই ডাকে।
আচ্ছা একটা কথা বলি। অন্যভাবে নিও না মন্টুদা। যার বাবা নকশাল করতেন, সৎ রাজনীতির লোক ছিলেন, তার ছেলে এইরকম চুরি করে কেন? শুনেছি অন্যদেরও ছোটখাটো জিনিস হাতসাফাই করেছে মন্টুদা। শেষের দিকে ব্যঙ্গ ফুটে উঠেছিল আমার গলায়।
চুপ করে মাটির দিকে তাকিয়ে থেকেছিল কিছুক্ষণ। কিন্তু কেন চুরি করে তার ধারপাশ দিয়েও যায়নি। মন্টুদা যে চুরি করে এবং আমরা বুঝতে পেরেছি, তা নিয়েও কোনও প্রতিক্রিয়া দেখায়নি সেদিন। উল্টে নিজের বাবার প্রসঙ্গে চলে গিয়েছিল।
তোর কি মনে হয় বাবা সাধুপুরুষ ছিল? সমাজ থেকে পালিয়ে গিয়ে চোরের মতো লুকোচুরি খেলা সাধুর লক্ষণ? মন্টুদার চোখের তারা নড়াচড়া করতে দেখেছিলাম। যেন কোনও চিন্তা মাথায় ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে।
তা কেন? ওঁরা তো গ্রামেগঞ্জে গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতেন?
সেই মানুষগুলোর কী হল? গ্রামের মানুষগুলোর? তারা কি এখনও খুব ভালো আছে?
একেবারে যে ভালো নেই তা নয়। আগের তুলনায় ভালো আছে। তবে যেমন থাকার কথা, সেইরকম নেই, এটা ঠিক। আমি মনে মনে স্বীকার করি। কিন্তু কিছু বলতে ইচ্ছে করেনি।
বীজ ফেলতে গেলে আগে মাটি নরম করতে হয়। বাবার দলের লোকেরা এসব বুঝতে পারেনি। এত তাড়াহুড়ো কীসের ছিল বল তো?
প্রশ্নটা কি আমাকেই করল মন্টুদা? বুঝতে পারলাম না। কেননা তার চোখ তখন আমার দিকে নয়। বোসদের নারকেল গাছ ছাড়িয়ে কোন সুদূরে যেন তার দৃষ্টি।
এসব রাজনৈতিক কথাবার্তা আমার ভালো লাগছিল না। আমি রাজনীতি এড়িয়ে চলি বরাবর। আমার বাবাকেও কোনওদিন রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাতে দেখিনি। তাই সেদিন থেমে গিয়েছিলাম। আর তারপর থেকে মন্টুদা আমাকে দেখলে এড়িয়ে যেত। কথা বলতে চাইত না। আমি নিশ্চিত, চুরির কথা বলার জন্য নয়, বাবার নকশাল করার প্রসঙ্গ তুলেছিলাম বলেই মন্টুদা আমার থেকে সরে সরে থাকত।
মামা, কাকা, কারও আশ্রয়েই মন্টুদা থাকেনি বেশিদিন। ক্লাশ টেনে উঠে আর পড়াশোনা করেনি। রবং নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরে এসেছিল। মায়ের

ভূতুড়ে বাড়ির মতো পড়েছিল মন্টুদাদের বাড়ি। ভাঙা ঘর সারিয়ে, আগাছা আর জঙ্গল সাফ করে থাকা শুরু করেছিল একাই। মন্টুদার বাবাও গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন। মন্টুদাও তাই। তবে মন্টুদার বাবা কোনও রাজনৈতিক গোলমালের মাঝে পড়ে গুলি খাননি। পুলিশের এনকাউন্টারে মারা গেছেন। কার্জন পার্কের কাছে তাঁর মৃতদেহ পড়েছিল। বাড়িতে সে খবর পৌঁছনোর পরে মন্টুদার মা শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন। কিছুদিন পরে তিনি আত্মহতা করেন। মন্টুদা তখন চার বছরের বালক। তখন প্রথমে কাকা নিয়ে গিয়েছিলেন মন্টুদাকে। পরে মামার বাড়িতে চলে গিয়েছিল মন্টুদা। সেই থেকে দরজা-বন্ধ বাড়িটা নিষঙ্গের মতো একা একাই পড়েছিল।
মামার বাড়ি থেকে একদিন আচমকা পালিয়ে গিয়েছিল মন্টুদা। কোনও এক পাইস হোটেলের কাজে ঢুকে পড়েছিল। সেইসময়ই তার নিজের ঘরে ফেরা। একসময় সেটা ছেড়ে দিয়ে নারায়ণ মিস্ত্রির সঙ্গে যোগ দিল। শেষদিন পর্যন্ত নারায়ণ মিস্ত্রির সঙ্গেই জুড়ে ছিল।
গতকাল একই রাজনৈতিক দলের দুই গ্রুপের ক্ষমতা দখলের লড়াই চলছিল। মাঝে মাঝেই এসব হয়। মন্টুদা কাজ সেরে ফিরছিল ওই পথ দিয়েই। গোলাগুলির মুখে পড়ে যায় মন্টুদা। আর তারপরই আসে সেই অমোঘ সময়। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া।
মন্টুদার মৃতদেহ শ্মশানে নেওয়ার সময় আমরা কেউ সঙ্গে যাব না ঠিক করেছিলাম। কেননা যে রাজনীতির লোকেদের জন্য তার প্রাণ গেল, তারাই মৃতদেহ দখল করে নিয়েছে। দলীয় কর্মী হিসাবে এলাকায় ঘোরানো হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। আমরা কেউ এর মধ্যে জড়াতে চাইনি। যার গুলিতে মন্টুদার প্রাণ গেল বলে শোনা যাচ্ছে, সেও আছে সেই ভিড়ের মধ্যে। পুলিশ নাকি তদন্তে বুঝতে পারেনি এই মৃত্যুর জন্য কে দায়ী। সবাই সব জানলেও পুলিশ কিছুই বুঝতে পারে না, এমন ঘটনা প্রায়ই হয়। তাই এই নিয়ে কেউ আর প্রশ্নও তোলে না আজকাল। ঠিক সেই সময়ই ঘটে গেল অভাবনীয় এক ঘটনা। আমরা সেই ঘটনার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিলাম না।
না। আমি এটা হতে দেব না। আমার স্বামীর মরা নিয়ে আমি ভাবব। বেলাদি আচমকা চিৎকার করে উঠল।
হঠাৎ এমন একটা চিৎকারে সবাই হতচকিত হয়ে পড়েছিল। মন্টুদার মৃতদেহ ঘিরে থাকা লোকজন থমকে গিয়েছিল কিছুক্ষণ। ধাতস্ত হয়ে তারা অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছিল। বেলাদি কারও কথায় কান দিতে রাজি নয়। এরপর আমাদের প্রতিবেশী কয়েকজন এগিয়ে এসে মন্টুদার শরীর ঘিরে দাঁড়িয়ে পড়ল। রাজনীতির লোকেরাও খেলা ছেড়ে সরে গেল ধীরে ধীরে। কেন যেন কেউ আর এই নিয়ে উচ্চবাচ্চ করেনি।
মাত্রই কয়েকজন নিষ্প্রাণ মন্টুদার শরীর কাঁধে নিয়ে শ্মশানের পথে চলেছে। ঠিক চোরের মতোই। অন্ধকার গলিঘুঁজি দিয়ে। প্রকাশ্য আলোর পথে নিয়ে যেতে হয়তো তারা ভয় পেয়েছে। একসময় আমিও ওদের পিছু পিছু হাঁটা শুরু করলাম।
আমরা জানতাম মন্টুদা চোর। ছোটখাটো চুরি করে। অনেকেই জানত ব্যাপারটা। তারা সতর্ক থাকত মন্টুদার থেকে। এখনও অনেকেই সতর্ক হয়ে এড়িয়ে গেল মন্টুদাকে। আমরাও এখন চোরের মতোই চলেছি মন্টুদার মৃতদেহ নিয়ে। চোরের মতোই শেষযাত্রায় চলেছে মন্টুদাও।

1 Comment

  • বিশ্বজিৎ দাস

    Reply November 3, 2020 |

    সাংঘাতিক গল্প। চেনা লাগছে সব অথচ অদ্ভুতভাবে বদলে যাচ্ছে। এ গল্প জীবনের, রাজনীতির, মনোপ্রবণতার আর ইতিহাসের…

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...