খেলাঘর
শ্যামলী আচার্য

“আজ ডাল তুমি রান্না করেছ?”

“কিছু বলছিস?” সুতিথি ছেলের দিকে তাকান। বহুদূর থেকে। কিছু শুনেছেন বলে মনে হল না।

দেওয়ালের ঘড়ি তিন মিনিট ফাস্ট। এখন ঠিক আটটা একান্ন। ন’টায় চার্টার্ড বাস এসে পড়বে। বাড়ি থেকে বড় রাস্তায় পা চালিয়ে যেতে ঠিক ছ’মিনিট। এই সময় ডালের স্বাদ নিয়ে আলোচনা না বাড়ানোই বুদ্ধিমানের কাজ। কর্পোরেট চাকুরে দীপ্ত পিঠে ব্যাগ গলিয়ে নিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসে একবার। জুতো পায়ে গলাতে ঠিক তিরিশ সেকেন্ড।

“আসছি মা।”

বেরিয়ে পড়ল দীপ্ত।

মা’কে খুব অন্যমনস্ক লাগে আজকাল। দীপ্ত ছেলেবেলা থেকে দেখছে মা ডাইনিং টেবিলের ওপর কাঁচের ফুলদানিতে টাটকা ফুল রাখেন। রোজ। এই রুটিন যে কবেকার, দীপ্ত নিজেও মনে করতে পারে না। মায়ের কাছে শুনেছে, বাবা জারবেরা ফুল খুব ভালবাসতেন। হলুদ জারবেরা। মা অবশ্য নানারকম ফুল রাখেন। রজনীগন্ধা, লিলি, সূর্যমুখী। গরমের মরসুমে ফুল না পেলে বা বাজারে বেরোতে না পারলে ছাদ থেকে পাতাবাহারের ডাল কেটে রঙিন পাতা সাজিয়ে দেন। ফুলদানির কোনাকুনি দেওয়ালে ঝোলানো বাবার ছবিতে ফুলের ছায়া পড়ে। ঘরটা ঝলমল করে ওঠে।

কয়েকদিন হল, মা বাসি ফুল ফেলছেন না। কাঁচের ঝকঝকে ফুলদানিতে শুকনো বিবর্ণ নেতিয়ে যাওয়া ফুল দেখলেই অস্বস্তি হয়। অভ্যেস নেই তো! সকালে তাড়াহুড়োর সময় মা’কে কিছু বলা হয় না। শুধু এক ঝলক লক্ষ্য করে বেরিয়ে যাওয়া। প্রতিদিন ভাবে, বাড়ি ফিরে বলবে। তখন শুধু ক্লান্তি আর অবসাদ। বিছানা সব ভুলিয়ে দেয়।

অনমিত্রা আজ চার্টার্ড বাসে যাবে না। ওর অফিসে আজ ওকে অনেক সকালে ঢুকতে হবে। বিদেশি ডেলিগেট আসছেন। কনফারেন্স। সাতটাতেই বেরিয়ে যাওয়ার কথা। দীপ্তকে মেসেজ করেছে একটা ছোট্ট। “বেরোলাম। রাতে ফোন দিও।” ব্যস। এটুকুই। আর সঙ্গে একটা লাল টকটকে হৃদয়চিহ্ন। সবটাই সিম্বলিক। লাল হৃদয়। অতএব ভালবাসি। মায়ের কাছে যেমন হলুদ জারবেরা ফুলের গুচ্ছ মানেই বাবার হাসিমুখ।

অনমিত্রাকে আজ দরকার ছিল। ওকে একটু বলা যেত মায়ের এই ক্রমাগত ভুলে যাওয়া। বা, ঠিক ভুলে যাওয়া নয়, অন্যমনস্কতা। উদাসীনতা। আজ ডালে নুন হয়নি। গতকাল রাতের তরকারিটাও বেশ বিস্বাদ। অথচ মা মানেই পরিপাটি। মা মানেই যত্ন। জানালার ধারে বসে বসে দীপ্ত ঠিক করল সামনের রবিবার মা’র সঙ্গে কথা বলবে সময় নিয়ে।

……………………………………………………………………………

দুপুরে নিঃশ্বাস ফেলার সময় পায়নি দীপ্ত। একের পর এক ঝামেলা। তার মধ্যে বেশ কয়েকবার বড়মা’র ফোন। বিরক্ত হলেও কিছু করার নেই। ওই সময় ফোন সাইলেন্ট। ধরার উপায় নেই। কথা বলা তো বহু দূরের ব্যাপার। বড়মা’র নম্বর দেখে সামান্য অন্যমনস্ক হতে গিয়েও মন সরিয়ে নেয় দীপ্ত। পেশাদার জীবন। এখন আবেগের জায়গা কম।

বিকেলে একটু হালকা হয়ে বড়মা’কে ফোন করে। দীপ্তর জেঠিমা। যিনি এখনও চৌধুরী পরিবারের বটগাছ। প্রচন্ড ব্যক্তিত্ব। সবদিকে সমান নজর। পক্ষপাতহীন এক আশ্চর্য মানুষ।

রিং হয়ে কেটে যায় প্রথমে। হতেই পারে। অধৈর্য হয়ে লাভ নেই। মহিলা নির্ঘাত সেলাইয়ের ক্লাসে। ঘরঘর মেশিনের আওয়াজে ফোন না শুনতে পাওয়াই স্বাভাবিক। দ্বিতীয়বার করামাত্রই বড়মা’র গলা।

“ব্যস্ত ছিলি তখন? দুপুরে দু’তিনবার ফোন করেছিলাম।”

“হ্যাঁ গো, ওই সময় এত চাপে ছিলাম।”

“জানি। শোন, মেজ কোথায় রে?”

মেজ, অর্থাৎ দীপ্ত’র মা। চৌধুরী পরিবারের মেজবউ সুতিথিকে বড়জা আদর করে ‘মেজ’ বলেই ডাকেন বরাবর। অভ্যেস। দীপ্ত হোঁচট খায় বড়মা’র প্রশ্নে।

“কোথায় মানে? মা তো বাড়িতেই।”

“আরে বাড়িতেই তো থাকার কথা। কিন্তু বেশ কয়েকদিন দুপুরে ফোনে পাচ্ছি না। কোথাও যায় দুপুরে? জানিস কিছু?”

সুতিথি তাঁর অধ্যাপনাজীবন থেকে অবসর নিয়েছেন বছর দেড়েক হল। কলেজ ছাড়ার পর বেশ ফুরফুরে মেজাজ। ফ্রি বার্ড। সকালের তাড়া নেই। সন্ধের ক্লান্তি নেই। খাতা দেখার চাপ নেই। কিন্তু দীপ্ত গত দিন দশ-বারো ধরে মা’কে একটু অন্যরকম দেখছে… একবার ভাবে, বড়মা’কে বলবে।

কী ভেবে থেমে যায়।

“আমি তো বাড়িতেই আছে জানি। মানে, দুপুরে তো মা কোথাও বেরোয় না আজকাল। তুমি ল্যান্ডলাইনে করেছিলে? মায়ের মোবাইলে ফোন করোনি?”

“আমি তোর মায়ের মোবাইলেই ফোন করি। দু’এক দিন ছাড়া ছাড়া। দুপুরের দিকে টুকটাক কথা হয়। কয়েকদিন ধরে ফোন করলেই দেখি মোবাইল সুইচ অফ। খটকা লাগল। বাড়ির নম্বরে করি। ও মা। সেটাও বেজে যায়, কেউ ধরে না। আজ তাই তোকে করছি। তুইও আজ না ধরলে কাল একবার যেতাম তোদের ওখানে। হ্যাঁ রে, মেজ’র শরীর ঠিক আছে তো?”

দীপ্ত ঘড়ি দেখে। এখন আর কথা বাড়ালে মুশকিল। হিসেবমতো ওই দশ-বারো দিনের গন্ডগোলটা এখানেও হচ্ছে। সেটা আপাতত অফিস থেকে কথা বলে সমাধান হবে না। দীপ্ত দ্রুত কথা গুছিয়ে নেয়।

“সব ঠিক আছে বড়মা। আমি আজ মা’কে গিয়েই বলছি। রাতে কথা বলিয়ে দেব। চাপ নিও না। এখন রাখি গো। হেভি প্রেশার।”

ফোন কেটে গেলেও কথার রেশ কাটে না। থেকে যায়। কথা। প্রশ্ন। অস্বস্তি। কী হল মায়ের?

………………………………………………………………………………

অফিস থেকে ফেরার সময় সাধারণত কানে হেডফোন। গান চলে। পাঁচমেশালি। স্ট্রেস কাটানোর উপায় তো বটেই। সেই সঙ্গে নিজের ভালবাসার জগতকে আরও একবার ছুঁয়ে দেখা।

এমন কোনও দিন যায়নি, যেদিন সে রেওয়াজে বসেনি। পরীক্ষা, স্কুল, টিউশন সব সামলেও রোজ সকাল-সন্ধে দু’বেলা তানপুরা নিয়ে বসত। মায়ের রুটিন। বাবার ঘুম ভাঙত দীপ্তর ভৈরব কিংবা ভৈরবীর আলাপে। কবে যেন সব ছেড়ে গেল। চিনচিনে ব্যথা। মাঝেমধ্যে জানান দেয়। বিব্রত করে না।

মনে পড়ে, মা’ও তখন বসত। সকালে সময় পেত না। কিন্তু সন্ধেয় রোজ। কলেজ থেকে এসে। চা-চিঁড়েভাজার মুচমুচে গন্ধের সঙ্গে মায়ের শরীর থেকে ভেসে আসত সুগন্ধি সাবানের নরম শৌখিনতা। মা ইমন কল্যাণ ধরলেই ঘরের মধ্যে কড়ি মধ্যমের আনাগোনা। ভীরু পায়ে।

মা’কে আবার গান শুরু করতে বললে হয় না? যদি আবার সিরিয়াসলি শিখতে শুরু করে কোথাও? দীপ্ত সিদ্ধান্ত নেয়, আজ বাড়ি ফিরেই কথা বলবে। মায়ের একটা কোয়ালিটি টাইম কাটানো উচিত।

বাড়ি ফিরে ফ্ল্যাটের দরজা আধভেজা দেখে মনে হয় নিশ্চই এসেছেন কেউ। অফিসফেরত এই অবেলায় আর কথা বলতে ভাল লাগে না। সামাজিকতার দেঁতো হাসি তো একেবারেই না।

ঘরে অবশ্য নেই কেউ। মায়ের শোবার ঘরের দরজা খোলা। মৃদু আলো জ্বলছে। বাইরের লিভিং রুম থেকেই হাঁক দেয় দীপ্ত।

“দরজা খোলা কেন মা?”

“এই একটু আগে ঢুকেছি রে। এ বাবা। দেখ খেয়াল করিনি। বন্ধই করা হয়নি।”

মায়ের উত্তরে বড় নিস্পৃহতা। এটা অবিশ্বাস্য। মা বরাবর শান্ত। কিন্তু উদাসীন নন।

“তুমি ফিরলে? কোথায় গিয়েছিলে?”

দীপ্তর মনে হয় একবারে জেনে নেওয়াই ভাল। বড়মা’র কথাগুলোও মিলিয়ে নেবে। গত কয়েকদিন ধরে দুপুরে মা কোথায় যাচ্ছে… কাউকে কিছু না বলে।

“আমি… আমি আমার এক বন্ধুকে দেখতে গিয়েছিলাম রে। ছোটবেলার বন্ধু। শেষ অবস্থা। কেমো চলছে। জানি না ক’দিনের মেয়াদ।”

“তোমার ছোটবেলার বন্ধু? কে গো? আমি চিনি?”

“নাঃ, তুই চিনবি না। একই ক্লাসের। টুয়েলভের পরে আর তেমন যোগাযোগ ছিল না। কলেজে পড়ার সময় একদিন দেখা হয়েছিল। তারপর আর আসেনি। এই বাড়িতে কখনওই আসেনি।”

মায়ের গলায় ক্লান্তি। অবসন্নতা। সে কি শুধুই ছেলেবেলার বন্ধুর অন্তিম মুহূর্ত বলে? দীপ্তর মনটা ভিজে ওঠে। আহা! এইজন্যই মা কয়েকদিন এত অন্যমনস্ক।

“আগে বলবে তো! বড়মা ফোন করে পায়নি তোমায়। আমাকে বলল আজ।”

“ওকে হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে এলাম। বন্ড সই করে। টাকা মিটিয়ে। ওর নিজের বাড়িতে দেখার কেউ নেই। আত্মীয়-স্বজন এই বয়সে আর কে কত করবে। সবাই ব্যস্ত। বয়স হয়েছে। বুঝিসই তো।”

“ও মা! তাই? ওনার ছেলে-মেয়ে, হাজব্যান্ড নেই কেউ?”

“হাজব্যান্ড? নাঃ, অশোকের প্রায় কেউই নেই। বিয়ে করেনি তো।”

দীপ্ত অপ্রস্তুত হয়। মায়ের ‘বন্ধু’ শুনে ও বান্ধবী ভেবেছিল। নিজেরই ভাবনার দৈন্য।

“ইস। তাহলে বেশ চাপের। আচ্ছা আগে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আসি। শুনব তোমার কথা।”

দীপ্ত দেখে, ফুলদানিতে নিস্তেজ ফুল। পালটানো হয়নি।

ডাইনিং টেবিলে বসে মায়ের মুখের দিকে একবার খেয়াল করে দীপ্ত। মা চিরকাল ছিপছিপে। নির্মেদ। এখনও টানটান ত্বক। ফর্সা গায়ের রঙে গোলাপি আভা। কাঁচাপাকা চুল কাঁধ ছাড়িয়ে পিঠের মাঝামাঝি। এককথায় গ্রেসফুল। অনমিত্রা দেখে মুগ্ধ হয়েছিল। অনমিত্রা সম্পর্কে প্রথম দিন থেকে দীপ্ত সবকিছুই ভাগ করে নিয়েছে মায়ের সঙ্গে। মা বরাবর সেই খোলা বারান্দা দিয়েছে তাকে। দীপ্তর বন্ধুরা প্রায়ই বলত, আন্টি খুব লিবারাল।

দীপ্ত ছেলের চোখ দিয়ে নয়, একজন পুরুষের চোখ দিয়ে দেখছিল তার মা’কে। সুতিথির ষাট পেরিয়েছে সদ্য। দেখে বোঝা মুশকিল। স্বচ্ছন্দে ফিফটি প্লাস বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। বাবা যখন চলে যান, মায়ের ছত্রিশ। আবার বিয়ে করতেই পারত। দীপ্ত কত ছোট। বিয়ের কথা উঠেছিল কী? দীপ্তর মনে নেই। ওর সামনে এইসব আলোচনা কেউ কখনও করেছিল বলে মনেও পড়ে না। আচ্ছা, তাহলে এই অশোক নামের ভদ্রলোকের সঙ্গে কি মায়ের ছেলেবেলার প্রেম… একটা সম্ভাবনার সুতো দুলতে থাকে হাওয়ায়। মা ছেলেবেলা থেকেই সব আলোচনায় স্বচ্ছন্দ। শরীর-মনের অনেক গহন পাঠ সহজে বুঝিয়েছিল মা। খেলাচ্ছলে। কিন্তু এই মুহূর্তে শান্ত ব্যক্তিত্বের ঋজু চরিত্রের মা’কে কিছুতেই এই সম্ভাবনার কথা মুখ ফুটে বলতে পারে না।

“দীপ্ত, তুমি যা ভাবছ, তা পুরোটা নয়। আবার খানিকটা ঠিকও বটে।”

মায়ের গলায় আনমনা ভাব কেটে গেছে।

“অশোক আমার খুব ছোটবেলার বন্ধু। বহরমপুরে বাড়ি। শ্যামনগরে মামাবাড়িতে বড় হয়েছে। আমাদের পাড়ায়। ওর মামা আর আমার বাবা, মানে তোমার দাদু ছিলেন প্রাণের বন্ধু। সেইসূত্রে অশোক শ্যামনগরে আমাদের বাড়িতে আসত প্রায়ই। একই ক্লাসে পড়ি। আলাদা স্কুল হলে কি হবে, গুলতি, ডাংগুলি, পিট্টু, গাদি, সবেতেই অশোক আর আমি পার্টনার। পাড়ার বন্ধুরা খ্যাপাত। বলত, বর-বউ। ও লজ্জা পেত। আমি তেড়ে যেতাম, ঝগড়া করতাম। তখন বুঝিনি। বুঝলাম অনেক পরে। ছেলেবেলার ওই বর-বউয়ের কল্পনাকে ও মনে মনে অনেক জল দিয়েছে, সার দিয়েছে, লালনপালন করেছে। কিন্তু কাউকে কিচ্ছু বলেনি। ক্লাস টুয়েলভের পরে চলে গেল বহরমপুরে ওর নিজের বাড়ি। আমি পড়তে এলাম কলকাতায়। বেথুন কলেজ। হোস্টেলে থাকি। ইউনিভার্সিটির গন্ডিতে পৌঁছই। তোমার বাবার সঙ্গে তো সেখানেই দেখা। তারপর সময় গড়িয়ে গেছে। কলেজে চাকরি পেয়েছি, বিয়ে করেছি, তোমাকে নিয়ে আমাদের জগত এগিয়ে চলেছে। মসৃণ জীবন। অশোকের কথা আমার একদম মনে ছিল না। হঠাৎ একদিন দেখা। তোমার বাবা তখন সদ্য চলে গেছেন। সব সামলাতে হচ্ছে। সেই সময়। চারপাশে সব দুলছে। তার মধ্যেই অশোক যেন ধূমকেতুর মতো এল। রাস্তায় একটা বিরাট গাড়ি থামিয়ে ডাকল অশোক। আমি চিনতে পেরেছি, কিন্তু মেলাতে পারিনি। সেই অশোক! ক্লাস টুয়েলভ অবধি যতটুকু দেখেছি, তারপর একবারই কলেজে পড়ার সময় শ্যামনগরে। ওর মামাতো বোন শর্মির বিয়েতে দেখা হয়েছিল। সেদিন কথা হয়নি। কিন্তু ও বারবার বলেছিল, তোর সঙ্গে অনেক কথা আছে। তোর হোস্টেলের ঠিকানা দিবি? চিঠি লিখব। দেওয়া হয়নি। মনেও হয়নি কিছু। এতদিন পরে রাস্তায় দেখে গাড়ি দাঁড় করিয়ে তুলে নিল। সাফল্যের পালিশ ওর সারা শরীরে। আভিজাত্য ফুটে বেরোচ্ছে। জোর করেই নিয়ে গেল ওর বাড়িতে। নিউ আলিপুরে। ছোট্ট বাড়ি, বিরাট বাগান। কিন্তু বাড়িতে একাই থাকে। সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের চাকরি। বদলি হয়ে যায়। এদিক ওদিক। কোনও পিছুটান নেই। রাখেনি। আমার জন্য অনেকটা জায়গা রেখে দিয়েছিল, বিশ্বাস করত আমিই একদিন আসব ওর কাছে।”

সুতিথি জল খেলেন এক ঢোঁক। দীপ্ত শুনছে অপলক। এর পরেই তো বাংলা ছবির চিরাচরিত ডায়ালগ থাকে। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। ছেলেবেলার অপূর্ণ প্রেমের কিছু বস্তাপচা সংলাপ।

“অশোকের সঙ্গে আমার শারীরিক সম্পর্কের সেই শুরু।”

মায়ের কথায় দীপ্ত হকচকিয়ে তাকায়। ওর দিকে না তাকিয়েই সুতিথি বলতে থাকেন, “তোমার বাবাকে ও একবারের জন্য ভুলিয়ে দেয়নি। কিন্তু আমার মধ্যবয়স তখন জ্বলছে। বিধ্বস্ত লাগত এক একদিন। যে চলে গেল, সে তো গেলই। কিন্ত আমি? আমার কথা কে বুঝবে? সেই প্রথম বুঝলাম, অশোক বন্ধু হয়ে পাশে দাঁড়াতে জানে। অশোক আমায় আশ্রয় দিতে শুরু করল। মন থেকে শরীর, শরীর থেকে অস্তিত্ব, অস্তিত্ব থেকে চেতনা। সবকিছু ভেসে গিয়েছিল। টানা তিনবছর। ওর নিউ আলিপুরের বাড়ির প্রতিটি ইঁট জানত আমাদের উদ্দাম ভালবাসা। শুধু ওই গন্ডি ছাড়িয়ে এ কথা বাইরে আসেনি। কাকপক্ষীও টের পায়নি। তখন তো আর এখনকার মতো লিভ-ইন রিলেশন শুরু হয়নি। আমরা বোধহয় ওই লিভ-ইন পার্টনারের মতোই থাকতাম। অশোকের শুধু অস্বস্তি ছিল তোকে নিয়ে। তাই কোনওদিন সামনে আসেনি। আমিও জোর করিনি। যদি তোর ভাল না লাগে, আমার কষ্ট হবে যে!”

“এ সব তুমি কি বলছ মা?”

সুতিথি দুচোখ মেলে তাকান তাঁর আত্মজ’র দিকে।

“তিন বছর পরে অশোক ট্রান্সফার হয়ে চলে গেল ভুবনেশ্বর। তারপর পাতিয়ালা। ছুটিতে আসত। যখনই আসত, যেতাম ওই বাড়িতে। অন্য সময়েও যেতাম। কলেজ থেকে একা যেতাম দুপুরবেলায়। ঘর গোছাতাম, সাজাতাম। পর্দা, শোপিস পালটে দিতাম। প্রত্যেকবার এসে যেন চমকে যায়। প্রত্যেকবার নতুন কিছু। ইউনিক। সে আমার আরেকটা সংসার। আমার খেলাঘর।”

সুতিথি পরিপূর্ণ দৃষ্টি মেলে দেন একমাত্র সন্তানের দিকে।

“অশোক আর বাঁচবে না। হিজ ডেজ আর নাম্বারড। দেখতে যাবি একবার? আমারও বাড়ি ওটা। মনে কর না, মায়ের বাড়িতেই যাচ্ছিস।”

দীপ্তর চোখ জ্বালা করে ওঠে।

“আমি কোথাও তৃতীয় ব্যক্তি হব না মা। স্যরি।”

2 Comments

  • Moumita Manna

    Reply March 12, 2021 |

    অপূর্ব গল্পটা।

  • Indranil bakshi

    Reply March 13, 2021 |

    চমকে দেওয়ার মতো বাঁক! এই যে বলো তুমি নাকি গল্পের শেষটা ধরতে পারো না!
    প্রশ্নের সামনে দিব্যি দাঁড় করিয়ে দিলে পাঠককে।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...