ইন্ডিয়া যে সব খবর রাখে না
তমাল রায়

‘আদমি বুলবুলা হ্যায় পানি কা
আউর পানি কি বহতি সতহ পর টুটতা ভি হ্যায়, ডুবতা ভি হ্যায়,
ফির উভারতা হ্যায়, ফির সে বেহতা হ্যায়”

শীত নয়। তবু এই ভরা প্যাচপ্যাচে গরমি মে ভি শীত করে সোলেমানের। গুটিয়ে আসে হাত পা। তখন সকাল সাতটা তেত্রিশ। সকাল বললে ভুল হবে, সূরজ কা সাঁতবা ঘোড়া আপাতত মাথা ফাটিয়ে দিচ্ছে। রেস্ট করলে ভালো হত, উপায় নেই। সামনে অনেক লম্বা পথ চলা বাকি!

ঘুম থেকে ওঠা আর ঘুমোতে যাওয়ার মাঝের সময়টায় সোলেমানের একটাই কাজ হাঁটা। গলদ বলা হল। ভুখা পেটে নিদভি ঠিকসে আসে না। সোলেমান মানে, হামিরুদ্দিনের লেড়কা। হামিরুদ্দিন, অওয়াধগঞ্জের ভাগচাষী, যে বুড়োটা জন খাটতে খাটতেই শেষমেশ ধানজমিতে উল্টে পড়েছিলো মুখ থুবড়ে। সেটা ভাদ্দরমাস। পানি মিলতা নেহি পুরা মুলুকমে। বোকা সোলেমান ঢাই মাইল দূর সে পানি লাকে আব্বুর লাশ ভিজিয়ে দিতে গেলে, গাঁয়ের বাকি লোক উও পানি ছিনিয়ে নিয়েছিলো। দৈনিক আজকা সমাচারে সে খবর বড় বড় করে বেরিয়েছিল! তাও সে প্রায় দশ-বারো সাল হবে। আভি সোলেমান একটা গীর্জার সামনে। শোচা থা, থোড়া নাস্তা-পানি এখানে জরুর মিলেগা। লেকিন গীর্জা তো বন্ধ হ্যায়৷ ফলে হাঁটতে থাকে।

নিজেকেই নিজে জিজ্ঞেস করে,

পর ও সোলেমান ভাইয়া যাও কাঁহা?

পথ জেনে এগোলে ভালো হতনা? নিজেই বিড় বিড় করে, ফের চলে…

‘মনজিলেসে গুমরাহ কর দেতা হ্যায় কুছ লোগ।

হর কিসিসে রাস্তা পুছনা আচ্ছা নেহি হোতা’

দুপুর একটা। হাইওয়েতে তেমন লরি, ট্রাক পত্তরও চলেনা। অগত্যা রাস্তার মাঝখান দিয়েই, ওই আর কি হাঁটাই…মাথার ওপর শকুনের ডানার ছায়া, কেউ হয়ত মরেছে, মরছেই তো পটাপট। যেখানে সেখানে। যেন দিওয়ালি। তখন পটপট করে পটকা ফাটে, এখানে মরে। ইনসানের মরার কি শব্দ হয়? ভুখ লাগে, ফির ভি করার তো কুছু নেই। সামনে অনেক লম্বা পথ চলা বাকি! ঘুম থেকে ওঠা আর ঘুমোতে যাওয়ার মাঝের সময়টায় সোলেমানের একটাই কাজ হাঁটা। গলদ বলা হল। ভুখা পেটে নিদভি ঠিকসে আসে না। কতগুলো পুলিশের গাড়ি হুটার বাজিয়ে চলে গেল। চারঠো কুত্তা একটা বিল্লিকে মেরে তাকে খাবার জন্য কামড়া-কামড়ি করছে৷ গা গুলিয়ে ওঠে৷ বমি পায়৷ আঁখ ফিরিয়ে নেয় সোলেমান। একটা আদমি তার জেনানাকে পিছে বসিয়ে, সাইকেল চালিয়ে এগিয়ে গেল৷ সামনে যতদূর দেখা যায় সোলেমানের মতই লোগ হাঁটছে, পিছে ভি এইসাই হাল হ্যায়। বরষাতকা দিন, এইসাহি সোলেমানদের মহল্লায় লোগ মন্দির কা তরফ চলতা হ্যায়। বাঁক কাঁধে যায়। শিবজিকা মাত্থে পর পানি ঢালে। এক ছোটিসি লেড়কি উঁচা বিল্ডিংসে হাত নাড়ছে সোলেমানদের দিকে, বিলকুল রেশমা য্যায়সা। শকুনটার ছায়া আবার সোলেমানের মাথার ওপর। বহিন রেশমা যেদিন মরলো, উসদিন ভি এইসা শকুন উড়ছিলো মাথার ওপর। রাস্তা বনছিলো। ওমপ্রকাশ মিশ্রাজির আণ্ডারে ঠিকা লেবার সোলেমান তখন মাথায় করে মাটি নিয়ে ভিরাণ্ডির রাস্তায় ফেলছে লেবারের যা কাজ আর কি। মাটি ফেলে আশমানের দিকে তাকাতেই ঠিকাদার মিশ্রাজি তাড়া মারলো, হেই সোলেমান তু রুকতা কিঁউ রে? পঞ্ছি দেখনে সে পেট ভরেগা ক্যায়া, শুয়ারকা আউলাদ! চল্ চল্। কাম কর। সে সময়েই খবরটা এলো, রেশমাকা উল্টি হচ্ছিলো বহুত। বাদমে গির গ্যায়া জমিন পর। উঠ নেহি রহা। রেশমার বয়স আনুমানিক তেইশ। কিন্তু ভুখা শরীর, খানা তো হর রোজ মিলতি ভি নেহি হ্যায় । দেখনেসে পনরা ষোলা সাল উমর মনে হয়। ঝুড়ি ফেলে সোলেমান দৌড়েছিলো ঘরের দিকে। আম্মু বসে আছে রেশমার মাথাটা কোলে নিয়ে। চুপ করে। করনে কা ভি কুছ নেহি থা। রেশমার শরীরে রক্ত ছিলো না। দাওয়াখানায় নিয়ে ভি গেছিল আম্মু। ডক্টরসাব বলেছিলো দাওয়াই খানে সে কুছ নেহি হোগা। খানা খিলাও। ডাল রোটিই সহি। উভি তো খিলানা পড়েগা। নেহি তো মাত আও। সোলেমান এর কাম কাজ ভি তো হর রোজ মিলতা নেহি, ক্যায়া করেগা! রেশমার গলা ছিলো খুব সুরেলা। পাক্কা শ্রেয়া ঘোষাল যাইসা। ইন্তেজার এর গানাটা কিতনা আচ্ছা খাসা গাইতো। শাঁসো মে হ্যায় হাওয়া…।

আচ্ছা, সবার শাঁসোসে কেয়া হাওয়া নিকালতে হ্যায়? সায়দ গরীবের শাঁস পর হাওয়া ভি না আছে।

এ সময়ে ছায়া ছোট হয়ে আসে। অবশ্য তেমন বড় মানুষই বা কই সোলেমান! পানি নেই শরীরে, তাই পশিনা ভি নেই। রাস্তার পাশে একটা রিং রোড। রিং রোড টপকালেই মন্দির দেখা যায়। খানিক আশা নিয়েই এগিয়ে যায় সোলেমান, আগর থোড়া সা পানি, একটু ডাল রোটি মিলে যায়৷ নাহ৷ মন্দির ভি বন্ধ। চলতে থাকে সোলেমান…।

‘দুখ কা দরিয়া শর্ম কা সমুন্দর হোতা হায়

সবসে খৌফনক ভুখ কা মঞ্জর হোতা হায়’

সন্ধ্যে ছটা চুয়াল্লিশ। সোলেমান হাঁটছে। সামনে অনেক লম্বা পথ চলা বাকি!

ঘুম থেকে ওঠা আর ঘুমোতে যাওয়ার মাঝের সময়টায় সোলেমানের একটাই কাজ হাঁটা। গলদ বলা হল। ভুখা পেটে নিদভি ঠিকসে আসে না।

আশমানে অনেক তারা ফুটেছে। তারা গিনতো সোলেমান, আব্বুর সাথে খাটিয়ায় বসে৷ সে বহুত দিনের কথা। তখন তো খেলতেও যেত মাঠে। ভুখ তখনও ছিলো পর ওই যে ভুখ লাগলে আম্মুকে বলতো৷ আম্মু যেন পয়গম্বর। ঠিক খানা জোগাড় করে নিয়ে আসতো। কিন্তু আভি খিলাবে কৌন? নিদ লাগছে সোলেমানের। নিদ এলেই অবশ্য ও চমকে ওঠে। মনে পড়ে সে রাতের কথা৷ উস রাত ভি আম্মু মিট্টিতে শুয়েছিলো। শোনে কা পহলে যেমন নামাজ পড়ে, পড়েই শুয়েছিলো, সুবাহ হলো। সবাই উঠলো। লেকিন আম্মু নেহি উঠি।

সোলেমান আর ছোট ভাই কাশেম আম্মুকে ধাক্কা দিয়েই যাচ্ছিলো। আম্মু ওঠেনি। সেদিন খুব বারিশ গিরছিলো। দাফন শেষে সোলেমান আর কাশেম বসে বচপনের কথা ভাবছিলো৷ গরীবের বচপন তো খেলনা বাটির, পুতুল খেলার নয়, ভুখের। ভুখ শালা বহুত হারামি আছে। এত জ্বালায়। ওরা তিনজনেও জ্বালাতো আম্মুকে। আব্বু হামিরুদ্দিন ধমক দিতো। ইতনা কামাতা নেহি হুঁ। সারাক্ষণ খানা খানা করে চিল্লালে হবে। আম্মু ফিরভি চোরি চোরি কহিসে ভি খিলাতো। মহাজনের ঘরে বাসন মাজে কাপড়া কাচে আম্মু। শ রুপাইয়া অর কুছ খানা। লেকিন আম্মু খুদ কুছ খেতনা। রাতে শুলে আম্মু কিস্যা শুনাতো, আল্লাহ হ্যায় না। ভরোসা রাখো বেটা। সব মুশকিল আসান হয়ে যাবে। আব্বু হাসতো, বলতো আল্লাহ ভি বড়লোকদের সাথ দেয়। হামারা নেহি। আল্লা হ্যায় ক্যায়া?

সোলেমান হাঁটছে। রাস্তায় দুজন মরে পড়ে আছে। তাকে ঘিরে ঢের সারি লোগ। ও থামেনা। চলতে থাকে। মউত ভি ইতনা তাকতওয়ালা হ্যায় নেহি যে সোলেমানকে রুখবে।

লাগতা হ্যায় আজ জিন্দেগী মুঝ সে খাফা হ্যায়,

চালিয়ে ছোডিয়ে ইয়ে ক‌ওন সা পেহলি দফা হ্যায়।

রাত দুটো আট। ন্যাশনাল হাইওয়ে ছেড়ে এখন স্টেট হাইওয়ের পথে সোলেমান। সায়দ শো গায়ি হ্যায় সব লোগ। কুছ কুছ মকান পর ফিরভি আলো জ্বলে। হয়ত টিভি দেখছে। শাসের কষ্ট হয়। পেটমে দর্দ। ফির ভি চলনা তো পড়েগাই। সামনে অনেক লম্বা পথ চলা বাকি!

ঘুম থেকে ওঠা আর ঘুমোতে যাওয়ার মাঝের সময়টায় সোলেমানের একটাই কাজ হাঁটা। ভুল গলদ বলা হল। ভুখা পেটে নিদভি ঠিকসে আসে না। পায়ে টান ধরছে। পিয়াস লাগতা হ্যায়। পর পানি কাঁহা? দূর উ কেয়া হ্যায়? মসজিদ? কুছ নেহি মিলেগা! পা চালাতে চায় সোলেমান। পেট্রোল ছাড়া পা গাড়িও কি আর চলে? যব ছোটা থা,আব্বুর কাঁধে চড়ে মেলা দেখতে যেত। উও ফির বহুত দিন কা বাত। আব তো বড়া বন গায়া সোলেমান৷

বড়া হোনা কহি আসান কা বাত নেহি। খুদ কো খিলাও, দুসরে কো খিলাও। খিলায়েগাতো জরুর। পর কাঁহা সে মিলেগা ইতনা সা রুপাইয়া? চুনাও এলে ভোটবাবুরা দূর দেশকা পনছি যায়সা এসে ভীড় জমাতো গাঁয়ে। হাম হ্যায় না গরীবো কা সাথ। চুনাও খতম। জিত গায়া, ব্যাস অ‌ওর দেখাই নেহি দেগা। সব শাল্লা চুতিয়া কাঁহিকা। একটা এক ঠ্যাং না থাকা কুত্তাভি চলছে আভি সোলেমান কা সাথ সাথ। মসজিদের সামনে সোলেমান দাঁড়ায়। বন্ধ কোথাও কেউ নেই। সবাই কি ঘুমিয়ে পড়লো? নাকি মরে গেছে? এটা কি মৃতের নগরী? একটু আগে ভি তো উঁচা মকান কা বাহার আকে সব লোগ তামাশা দেখ রহা থা। আভি কাঁহা গায়া? তামাশার কথায় মনে পড়ে, রেশমা যব রোতি থি, সোলেমান ভাল্লুক সেজে লাফাতো৷ রেশমা খিল খিল করে মুশকরাতো। আজ কি তাকে ভাল্লুকের মতই লাগে? এইসা দেখনে মে কৌন সা চিজ হ্যায়?

ফের হাঁটতে শুরু করে। এ জায়গাটা অন্ধকার। আবার হাইওয়েতে ওঠে। আন্ধেরা পার করকে আভি আলো আর আলো। চলতে শুরু করে সোলেমান।

কেমন যেন মনে হয় সুবাহ হো গায়া। আর আম্মুর ওড়নার খুঁট পাকড়ে বেরিয়ে পড়েছে ছোট্ট সোলেমান। খাবার খুঁজতে বেরিয়েছে আম্মু। এ বস্তি ও বস্তি ঘুরছে, মুদি দোকানদার হাটিয়ে দিলো৷ নেহি মিলেগা। আগে কা কর্জ মেটাও পহলে। তব দেগা। এক সময় রাস্তাতেই বসে পড়ে। আম্মু মাথায় হাত বুলিয়ে বলছে, অউর থোড়িসি চল বেটা, খানা জরুর মিলেগা… কতগুলো রাত পাখি ডাকছে। কানের মধ্যে একটা পোকা ঢুকেছে মনে হয়। কেবল ভোঁওওও করে একটা শব্দ। সুবাহ তো হয়নি এখনও, তো ফির আব্বু কি করে এখানে এলো? পিঠে কোদাল আর মাথায় ঝুড়ি নিয়ে আব্বু খাড়া হ্যায়। সোলেমানকে ডাকছে…দেরী হয়ে যায়, আ যা জলদি বেটা। পা চালালো, চলে কই?

একটা টেম্পো এসে দাঁড়ালো, কি যেন বললো সোলেমান। উস টেম্পো পর কেয়া নবীজি বইঠে হ্যায়? চোখে অনেক রঙ, লাল-কমলা-হলদে-সবুজ…, আম্মুর কাঁচের চুড়ির মতই। ঠুং ঠুং শব্দ হয়, আম্মু মিশ্রাজির ঘর যাবে না? বহুত ভুখ লাগা হ্যায়। আম্মু মুশকোরাচ্ছে… কাশেম ভি রয়েছে। আরে দেখ দেখ রেশমা ভি কাঁহাসে জুড় গায়ি। একটু দ্রুত এগোতে যায় সোলেমান। শাঁস খুব দ্রুত এবার…একটা কালা বিল্লি চলে গেল উধার। পর রুকনে কা তো কহি বাত হি নেহি হ্যায়। ফির চলতেহি থাকে…এবার পড়ে যায় সোলেমান। মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে। এখনও শাঁস পড়ছে, লেকিন ছোট ছোট…আম্মু, রেশমা, কাশেম, আব্বু ওরা সবাই ডাকছে, সোলেমান ওঠবার চেষ্টা করে, পারে না। পড়ে যায়। একটা জোর টায়ার ফাটার শব্দ হল। কুছ গ্যয়া, যো যানা হ্যায় ওহ তো যায়েগা হি।

মৌত তো এক কবিতা হ্যায়

এক কবিতা কা ওয়াদা হ্যায়

এক দিন মিলেগি মুঝে…

ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

সোলেমানের ভেতর থেকে সোলেমান উঠে আসে। ফের হাঁটতে থাকে। ভারত তীর্থ পথে হাঁটছে সোলেমান, সোলেমানরা। ইন্ডিয়া সে খবর অবশ্য জানে কিনা জানা নেই!

ঋণঃ গুলজার

2 Comments

  • মেঘ

    Reply November 2, 2020 |

    আহ্লাদ করে পড়তে এসে থম মেরে গেলাম। জীবন..

  • সমরেন্দ্র বিশ্বাস

    Reply November 2, 2020 |

    নিদারুণ জীবনের ক্লান্তি, মৃত্যুকে ছোঁয়া সময় – এই লেখা মনটাকে নাড়িয়ে দেয়!

Leave a Reply to সমরেন্দ্র বিশ্বাস Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...