অলীক ভুবন
বৈশালী চট্টোপাধ্যায়


বেরনোর মুখেই মেজাজটা তিতকুটে হয়ে গেল তিথির। “এই ভরদুপুরে আবার কোথায় চললে তুমি?”

সুপ্রভার ভুরু কোঁচকানো মুখটা অটোতে বসেও মনে পড়ে যাচ্ছিল। কারোর ওপর কোনো জোর নেই। সব কর্তৃত্ব তিথির ওপর। উনি চান ওঁর মতন সবাই সারাদিন খাটে বসে খাকদাক আর কোঁকাক। অসীমাও আজকাল সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। বড্ড সাহস বেড়ে গেছে ওর। অথচ প্রথম মাসছয়েক ভালই ছিল, অন্তত আগের দুজনের তুলনায়। এদিকে সুপ্রভার ইদানীং যা অবস্থা আয়া ছাড়া তিথির গতিও নেই। 


অসীমা অল্পবয়েসী মেয়ে; চটপটে, পরিষ্কার। বর রাজমিস্ত্রির কাজে বাইরে থাকে। বছর সাতেকের ছেলেকে মা বাবার কাছে রেখে আয়ার কাজ নিয়েছিল। কি না বর নিয়মিত টাকা পাঠাতে পারছে না। প্রথম প্রথম সকালে এসে রাতে চলে যেত। মাসখানেক পর থেকে কাজ দেখে তিথিই বলেছিল,”সবসময়ের কাজ করবে? এখানেই থাকাখাওয়া করলে, মাঝেসাঝে আমার ছুটির দিনে ছেলের কাছে একবেলা ঘুরে এলে। রাতটা আমার লোকের দরকার। দ্যাখো, যদি রাজি হও তো অন্য লোক দেখব না।”


অসীমা এককথায় রাজি। তিথিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কিছুদিন ধরে সুপ্রভা আরো জবুথবু হয়ে পড়েছেন। একেই তো ফিমার বোন ভেঙে ইস্তক মোটেই নড়াচড়া করতে চান না। যদিও ডাক্তারের কথায় অপারেশন সাকসেসফুল। ফিজিওথেরাপিস্টও বললেন এখন উনি হাঁটাচলা করতেই পারেন। কিন্তু সুপ্রভার কোনো ইচ্ছেই নেই। প্রায় সারাদিনই খাটে একভাবে শোয়া। পাশ ফিরে চশমা বা মোবাইল ফোনটা নিতেও তিথি বা অসীমাকে ডাকেন। অথচ খাওয়াদাওয়া, কথাবার্তা, সংসারের খুঁটিনাটি সবেতেই আগের মত সমান উৎসাহ আর অধিকারবোধ। সব অঙ্গ নিষ্ক্রিয় হতে হতে শুধু মুখটাই সাংঘাতিক রকম সক্রিয় রয়ে গেছে সুপ্রভার।   


তিথির হয়েছে জ্বালা। সুপ্রভার সম্পূর্ণ দায়িত্ব ওর। ছেলেমেয়েরা যে যার মতন রয়েছে। বড় ছেলে বহুকাল কানাডায়। মেজটি সিঙ্গাপুরে কাটিয়ে দেশে যদিবা ফিরলেন, নিজের সংসার সাজিয়ে দক্ষিণ কোলকাতার ফ্ল্যাটে রইলেন, এ মুখো হলেন না। মেয়ে তো সুখের পায়রা। বছরে একবার কি দুবার দিন দুইয়ের জন্যে এসে মাকে গরদ, ঢাকাই, ফলমূল-মিষ্টি আর একগাদা পরামর্শ দিয়ে চলে যায়। 


আর ছোটটি? সে আছে নিজের চাকরি নিয়ে হায়দ্রাবাদে পড়ে। বউ যে বুড়ি মা আর ছেলেকে নিয়ে প্রায় সারাটা জীবন একই ভাবে কাটিয়ে দিল, তাতে তার কোনো ভ্রূক্ষেপই নেই। 


সত্যি! দিব্যি আছে ব্রতী, ঝাড়া হাতপা। বললেই বলে,”এই তো আর কটা দিন, সামনের বছর যদি ব্যবস্থা করতে পারি… তুমি বরং দাদাদের ওদিকে একটা ভাল ফ্ল্যাট দেখে রাখ।”সেই সামনের বছর যে কবে আসবে! তবে সে বাবদ নানা জায়গায় বিস্তর ফ্ল্যাট দেখা হয়ে গেল তিথির।


সুপ্রভা অবশ্য ফ্ল্যাটের কথা শুনলেই লঙ্কাকান্ড বাঁধাবেন। ছেলেমেয়েকে ফোন করে হুলুস্থুল শুরু হবে। এমনকি ব্রতী পর্যন্ত তখন হয়ত তিথির ঘাড়ে সব দায় ঝেড়ে ফেলবে। তাই পারলে অফিসফেরতই তিথি ফ্ল্যাট দেখে আসে। তবে মাঝে মধ্যে ছুটির দিনেও যেতে হয়। তখন অগত্যা অন্য কোনো অজুহাত দেয়। অথচ পৈতৃক এই একতলা বাড়িটা সারিয়ে বাড়িয়ে নিজেদের মত করে তোলার উপায় থাকলে এসবের প্রয়োজনই পড়ে না। জানা কথাই দুই ভাসুরের কেউই এ বাড়িতে কোনোদিন থুতু ফেলতেও আসবে না। তবু অধিকার ছাড়তে ঝেড়ে কাশবে না। অথচ সুপ্রভার স্বপ্ন সব ছেলে মিলে আজ না হোক শেষ বয়সে একসাথে থাকবে। 


অমু বড় হয়েছে। ওর একটা নিজস্ব ঘর দরকার বলে প্রায় লড়াই করে সেবার ছাতে অমুর জন্যে একখানা ঘর করালো তিথি। ব্যস! ওইটুকুই। সাবেকি ধাঁচের বাথরুমটা কতবার ইচ্ছে হয়েছে ঠিকঠাক করে, সুপ্রভা করতেই দেবেন না। বললেই বলেন, “থাক যেমন আছে। আমি আর কটা দিন! তারপর তোমরা সবাই মিলে যা খুশি কোরো।”অন্যরা তো বটেই ব্রতীও সেই সুরে পোঁ ধরে, “মা যতদিন আছে, থাক না অমনি।”

“মা যদি আরো কুড়ি বছর জীবিত থাকেন?”

“আহা! থাক থাক। আরে বয়স্ক মানুষ, তোমার মাথার ওপর একটা ছাতা।”


তিথি ভেবে পায় না কী উত্তর দেবে। আজ পঁচিশ বছর ধরে ওই একতলা বাড়ির সাকুল্যে দুটো শোবার ঘর, একখানা ডাইনিং কাম ড্রইং আর একচিলতে বারান্দার মধ্যে ঘোরাফেরা। সবার সুন্দর সাজানো বাড়ি, ফ্ল্যাট। ওর ওসব কোনো শখ থাকতে নেই। খালি পঁচাশি বছরের পুরনো কাপড় ছেঁড়া শিকভাঙ্গা ছাতাটা ওর বরাদ্দে। 


আজকের ফ্ল্যাটটা সত্যিই সুন্দর। খোলামেলা আর প্রচুর আলোবাতাস। বিশেষ করে পুবের ব্যালকনিটা। বহুদূর পর্যন্ত বিছিয়ে থাকা শহরতলীর সামনে একখানা চেয়ার পেতে এমনি এমনিও বহুক্ষণ বসে থাকা যায়। ব্যালকনিটার ওই কোনে একটা এরিকা পাম আর গোটাকতক শৌখিন গাছের টব রাখলে দিব্যি লাগবে। বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে বেশ কয়েকটা ছবি তোলে তিথি ফ্ল্যাটটার। ব্রতীকে পাঠাবে। বড় বেডরুমটায় দাস ফার্নিচারে সেদিন যে খাটটা দেখেছিল, ওরকম একটা সাইড টেবিলওলা সেট, মাঝারি সাইজের একটা ওয়ার্ডরোব আর একটা মর্ডান ডিজাইনের ড্রেসিং টেবিল, ব্যস। বাকি বেডরুম দুটোর একটা অমুর আরেকটা গেস্টরুম। ও বাড়ির মান্ধাতা আমলের পুরনো ফার্নিচার নতুন ফ্ল্যাটে কক্ষনো ঢোকাবে না তিথি। লিভিংরুমটা মনের মত করে সাজাবে। দেয়ালগুলো ডিজাইন করাবে রুদ্রদের ফ্ল্যাটে যে কাজ করেছে ওকে দিয়ে। রুদ্রটা সেদিন ওর বউয়ের সামনে কী টিটকিরিটাই না মারল!

 “তোর ফ্ল্যাট! তবেই হয়েছে। তুই-ই ব্যাটারি ফুরিয়ে কবে ফ্ল্যাট হয়ে যাবি, তখনো দেখবি তোর শাশুড়ি খাটে বসে খেজুর খেয়ে ক্যালোরি রিচার্জ করছে।”

সমবয়সী ছোটবেলার বন্ধু বলে এত ফাজলামি করে রুদ্রটা! সেদিন ওদের গৃহপ্রবেশে গিয়েই এই ফ্ল্যাটটার খোঁজ পেয়েছে তিথি। রুচি আছে বটে রুদ্রর বউয়ের। দারুণ সাজিয়েছে ঘরদোর। সুযোগ পেলে তিথিও কি পারে না অমন?


লিফটে নামতে নামতে অদ্ভুত লাগে তিথির। একদিন এই লিফটে ও রোজই যাতায়াত করবে। এই বিশাল ঝাঁ চকচকে কমপ্লেক্সের বাসিন্দা হবে। দরজায় একটা আর্টিস্টিক নেমপ্লেটে লেখা থাকবে- অমর্ত্য তিথি ব্রতীন্দ্র। ওই পুরনো নোনাধরা দেওয়াল, স্যাঁতস্যাঁতে বাথরুম অতীত হয়ে যাবে। ভাবতেই গা শিরশির করে ওর। নাহ! ফ্ল্যাটটা বড্ড পছন্দ হয়েছে। আজই ব্রতীকে বলবে এটার কথা। 


অটোতে বসেই ব্রতীকে ছবিগুলো পাঠিয়ে ফোন করে তিথি। বেশ কয়েকবার রিং হয়ে ঘুম জড়ানো গলায় ফোন ধরলেই তিথি তড়বড়িয়ে বলতে থাকে,”হোয়াটস অ্যাপে ছবি পাঠিয়েছি, দ্যাখো। দুর্দান্ত ফ্ল্যাট। লোকেশন থেকে সবকিছু একদম পারফেক্ট। এটা তোমার পছন্দ হবেই। তুমি আর না কোরো না। আমি এটা কিছুতেই হাতছাড়া করব না।”

বেশ কিছুক্ষণ একতরফা কথা বলে একটু থামলে ব্রতী বলে,”তুমি কোথায়?”

“এই তো অটোতে, ফিরছি।”

“ঠিক আছে বাড়ি ফেরো, পরে দেখছি।”

“আর পরে নয় ব্রতী। অনেক হয়েছে। তুমি এবার ব্যবস্থা করো। আমি মাকে জানাচ্ছি। উনি যদি ওখানে যেতে চান যাবেন। নইলে দাদাকে বলো এবার উনি দায়িত্ব নিন।”


“এত উত্তেজিত হচ্ছো কেন? সম্ভব অসম্ভব বলে তো একটা কথা আছে! দাদাকে একথা কখনো বলা যায়?”

“কেন যায় না ব্রতী। যে চোখ বুজে থাকে তাকে চোখে আঙুল দিয়েই দেখাতে হয়। অনেক হয়েছে। আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়।”

“একটা কথা ভুলে যাচ্ছ তিথি, এতদিন ধরে বাড়িটা আমরাই ভোগ করছি।”

“কীসের ভোগ? চাইলে কি এতদিনে একটা আলাদা থাকার ব্যবস্থা আমরা করতে পারতাম না? আর মায়ের দেখাশোনা ব্রতী? আমি একা। অপারেশন থেকে অসুস্থতা সবেতে তোমরা শুধু মুখ দেখিয়েছ। মাকে দেখাশোনার জন্যে তোমরা আমায়…”

“দিদি, চিড়িয়ামোড়…” অটোওলার কথায় সম্বিত ফেরে তিথির। ছিঃ ছিঃ! এতক্ষণ ধরে এভাবে অটোতে বসে চেঁচিয়ে। টাকা বের করতে গিয়ে আড়চোখে দ্যাখে পাশের মেয়েটার মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।

তাড়াতাড়ি নেমে রাস্তা পেরিয়ে এপারে আসে। একটু যশোদা মিষ্টান্ন ভান্ডারে ঢুকবে। এখানকার হিং-এর কচুরি সুপ্রভার ভারি পছন্দের। সঙ্গে খানিক সরভাজাও নিয়ে নেবে। আজ কথাটা সুপ্রভার কাছে যেভাবেই হোক পাড়বে। যা থাকে কপালে। ছেলে ছেলে করে হেদিয়ে মরল বুড়ি, ছেলেদের হুঁশ নেই আর সেই দুর্ভোগ তিথিকে পোয়াতে হবে! কবে রাম রাজা হবে তবে সীতা বনে যাবে। হুঁহ! যত্তসব!


“বৌদি!”ডাকটা শুনে তিথি ফিরে তাকায়। অসীমার দিদি। ও-ই অসীমাকে কাজে ঢুকিয়েছিল। নিজেও এই কাজই করে। কী যেন নাম? তিথি ভুলে গেছে। একগাল হেসে এগিয়ে এসে বলে,”অসীমা আপনার বাড়ির চব্বিশ ঘন্টার কাজটা পেয়ে বর্তে গেল বৌদি। নিজের মত থাকা। খাওয়াপরার চিন্তা নেই। মাইনেটা ছেলের পড়াশোনায় কাজে লাগাতে পারবে। নইলে এ অসময়ে… শালা এক নম্বরের হারামি অসীমার বরটা। এমন করবে কে জানত?”

“কী করেছে অসীমার বর?” তিথি অবাক হয়।

“ওমা! ওখানে আবার বিয়ে করেছে তো! আপনি জানেন না? ওর সাথে কাজ করত পাশের পাড়ার বিমল এবার দেশে ফিরতে জানাজানি হল। বলেনি আপনাকে অসীমা?”

“কই না!”

“ওই জন্যেই তো টাকা পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। আসারও কোনো গরজ নেই। তবে একটা শান্তি, আমার ভাইটাও বৌদি কাজ পেয়ে গেছে উড়িষ্যায়।”

“কবে?”

“এই তো মাস দুই হল। ওহ! বাস এসে গেছে। আমি আসি বৌদি। যাব একদিন আপনার ওখানে।” বলতে বলতে দৌড়ে গিয়ে বাসে উঠে পড়ে অসীমার দিদি।


হতবাক তিথি হিসেব মেলাতে পারে না। তবে যে অসীমা ফোনে সারাক্ষণ বরের সাথে কথা বলে! কালকেও তো অনেক রাত পর্যন্ত ভিডিও কলে হাসাহাসি করলে পাশের ঘর থেকে তিথি ধমক দিয়েছিল,”কী হচ্ছে অসীমা? মা ঘুমবে কী করে?” 

অবশ্য সন্দেহ যে একেবারে হয়নি তা নয়। এই তো সে বার, অসীমার স্ক্রীন সেভারে দাড়িওলা অন্য কার একটা ছবি এক ঝলক চোখে পড়তে বলেছিল,”এটা কে?”

চট করে ফোনটা সরিয়ে নিয়েছিল অসীমা, বলেছিল,”কেন? আমার বর?”

“এরকম দেখতে! আগে যার ছবি দেখিয়েছিল সে নয় তো!”

“ও-ই। দাড়ি রেখেছে তাই ওরম লাগছে।”

“দেখো, উল্টোপাল্টা ব্যাপারে জড়িও না। বিয়েওলাদের এসব আদৌ টেঁকে না। দিন কয়েক নেড়েচেড়ে নেশা ছুটলে ছুঁড়ে ফেলে দেবে।”


কিন্তু পাশের বাড়ির সুমিও তো এই গত সপ্তাহেই ডেকে বলেছিল,”তিথিদি, দুপুরে সাইকেলে করে কে আসে গো তোমাদের বাড়ি? জেঠিমার ফিজিওথেরাপির লোক?”

“কই না তো! সে তো সন্ধেবেলা।” লিপি অবাক হয়।”সে কী! তবে ওটা কে? আমি তো কালকে বিকেলেও ছাত থেকে দেখলাম গেট খুলে বেরচ্ছে। তুমি জেঠিমাকে জিজ্ঞেস কর।”

দেখা গেল সুপ্রভা কিছুই জানেন না। অসীমাকে জিজ্ঞেস করতে প্রথমে বলেছিল,”কোথায়? কেউ না।”

তারপর বলেছিল, “ও, ভাই এসেছিল দুদিন টাকা নিতে। ছেলের কয়েকটা খাতাবই কিনবে।”


বাড়িতে যদিও কোনো গয়নাগাটি, টাকাকড়ি রাখে না তিথি শুধু সংসার খরচের সামান্য কিছু ছাড়া। তবু দুপুরবেলা ফাঁকা বাড়ি পেয়ে… কী সর্বনাশ! 


বহুদিন ধরে লোক রাখার অভিজ্ঞতায় তিথি জানে, বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত এদের বেশিরভাগেরই পরকীয়া বা প্রেম একটা নেশা। সর্বক্ষণ সেই নিয়ে মোবাইলে ব্যস্ত থাকে।


আজকাল প্রায়ই সন্ধেবেলা তিথি অফিস থেকে ফেরার পর বাড়ি যাবার নাম করে খুব সেজেগুজে বেরোয় অসীমা। ঘন ঘন যাওয়া দেখে বিরক্ত লাগলেও অল্পবয়সী মেয়ে, সাজতে ভালোবাসে এমনটাই ভাবত। তিথির এখন সন্দেহ হতে থাকে বাড়ি কি আদৌ যায়?সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে বাড়ির কাছাকাছি আসতেই দেখে অসীমা তালা খুলে ঢুকছে।


“কোথায় গিয়েছিলে তুমি? এভাবে বাইরে থেকে তালা দিয়ে, আমি বাড়ি নেই, মায়ের যদি কোনো অসুবিধা হত?”

“এই তো একটুখানির জন্যে গেছি! জেঠিমা ঘুমোচ্ছিল।”

“একটুখানির জন্যে মানে? তোমার বাড়িতে যেতে আসতেই তো কুড়ি কুড়ি চল্লিশ মিনিট লাগার কথা।”

“বাড়ি যাইনি।” বলে ফেলেই অপ্রস্তুত হাসি হেসে অসীমা হাত বাড়ায়,”দাও, কী এনেছ? চপ? জেঠিমাকে দিই?”

তিথি আজ একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বে, “দাঁড়াও। তোমার দিদির কাছে সব শুনলাম। কার সাথে কথা বল তুমি ফোনে? কোথায় যাও সেজেগুজে রোজ?”

“তোমার কাজের সাথে সম্পর্ক বৌদি। আমি কোথায় যাই, কী করি সে খবরে তোমার কী?”

“মানে? আমার বাড়িতে থাকো, আমার জানার প্রয়োজন নেই! তোমার ভাইও তো শুনলাম দুমাস হল উড়িষ্যায়। সেদিন যে তবে ভাই এসেছিল বললে?” এবার তেরিয়া হয়ে ওঠে অসীমা, “তুমিও তো প্রায়ই কোথায় যাও। কী কর আমি জানতে যাই?”


স্তম্ভিত তিথির কথা যোগায় না। আর কিছু বলার আগেই ফোন বেজে ওঠে। ওপার থেকে ব্রতী বলে,”শোন, মাথা ঠান্ডা কর। আমি এবার বাড়িতে গিয়ে মাকে বোঝাব। ও বাড়িটাই আপাতত রিমডিউলেশন করিয়ে নি। হঠাৎ অন্য জায়গায় থাকার কথা শুনে মার ভালোমন্দ কিছু হয়ে গেলে কিন্তু তার ভাগী আমরাই হব তিথি। অমুর সামনে ভর্তির ব্যাপার আছে। সেখানে কত খরচখরচা হবে ঠিক কী! এখনই অতগুলো টাকা আটকে রাখার কোনো মানেই নেই। তাছাড়া অমু হোস্টেলে থাকলে ও বাড়িতে তো শুধু তুমি আর মা।”

হঠাৎ তিথির খুব কান্না পায়। ফিসফিসিয়ে বলে,”তুমি আর ফিরবে না ব্রতী? তোমার মায়ের সাথেই আমি সারাটা জীবন…?”

“তা কেন? সে দেখা যাবে। মাকে এখনই কিছু বোলো না। আমি রাতে ফোন করব ‘খন।”


সত্যিই ব্রতী ফিরতে পারে না নাকি ফিরতে চায় না? সব কিছু খুব গুলিয়ে গিয়ে কেমন যেন অর্থহীন লাগে তিথির। মনে হয় ও, সুপ্রভা, অসীমা- ওরা সব্বাই একই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে সাদাকালো বাস্তবটাকে প্রাণপণ রংতুলির পোঁচ দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে অনবরত। এক অলীক ভুবনের নেশায় ডুবে থাকতে গিয়ে ক্রমাগত গভীর থেকে আরো গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে। যেন বহুতল বাড়ির ছিঁড়ে যাওয়া অন্ধকার লিফটে ভারশূন্য কয়েকটা মানুষ। লিফটটা খুব দ্রুত নিচের দিকে নামছে। খালি নামছেই।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...