অজিত রায় – বাংলা গদ্যের এক ব্যাতিক্রমী পৌরুষ
প্রণব চক্রবর্তী

এবারের ইনটারাকশন পত্রিকার ‘আছি’ বি্ষয়ক সংখ্যাটির ভাবনা যখন মাথায় এলো, তখনই লেখা চেয়ে রেখেছিলাম  বিশেষ এই সংখ্যাটির জন্য। স্বতঃস্ফুর্ত আগ্রহ নিয়েই অজিত-দা অর্থাৎ অজিত রায় প্রবলভাবে উৎসাহিত হয়ে উঠলো। দীর্ঘদিনের সাংসারিক সঙ্গী  বা আমাদের বৌদির মৃত্যুও হয়েছে এর কিছুদিন আগেই। লেখার কথা বলতেই বললো লিখবে এবং সময় মতো পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু সে সময় হতে বরাবরই পত্রিকা ছাপা শুরুর আগে পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করতে হয়, ফোনে বেশ কয়েকবার চেঁচামেচি করবার পর তার হুঁশ ফিরতো। এবারেও প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু মারা যাবার আগে শেষবার বেলুড় শ্রমজীবী হাসপাতালে ভর্তি হবার দু-একদিন আগে লেখাটা আমায় পাঠিয়ে দিয়েছিলো। লেখা মেইল করে ফোনে শুধু জানিয়েছিলো, লেখা পাঠিয়ে দিলাম, কাল কলকাতা যাব একটু কাজ আছে। ব্যস। কি কাজ বলেনি। বাধ্যত জানতেও চাইনি। পরে জানলাম হাসপাতালে ভর্তি হয়ে প্রচুর রক্ত নিয়ে টাকার সঙ্কটে বিল মেটাতে পারছে না। যাই হোক, শুধু আমার তাড়ায়, মাঝে একবার বলেছিলো, তোমার দেড় পাতার আছি লেখা বেশ ভাবাচ্ছে।

কথাটা অজিত রায় সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে এ কারণেই প্রথমে উল্লেখ করতে হচ্ছে, একের আট ডিমাইয়ের তিনপাতা লেখাটি যেন অজিত রায়ের সামগ্রিক লেখালিখি কর্মের এক অপ্রাকৃত রসায়নের গোপন সমীকরণটি সর্বসমক্ষে হাট করে দেয়া। এবং সেটিও এমন নিজস্ব গদ্যশৈলীতেই ব্যক্ত, প্রথাবিরোধী বাংলা গদ্যের দীক্ষিত পাঠক ব্যাতীত তাকে ডিসাইফার করা মুশকিল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, অজিত রায়ের গদ্যশৈলীটা কী! আমাদের লিটল ম্যাগাজিনের অনেককেই অজিত রায় সম্পর্কে নির্বিবাদ মতামত দিতে শুনেছি, ও যৌনতা ছাড়া আর কিছু লিখতে পারে নাকি! আমার সেইসব বন্ধুদের উদ্দ্যেশ্যে আজ মনে করিয়ে দিতে চাই, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর পর্বের প্রথম বিভাগের প্রথম, এলএলবি ডিগ্রীধারী এই লেখক মানুষটি অন্য সব জীবিকা ছেড়ে দিয়ে এমন কি ইংরিজী স্টেটসম্যান কাগজের স্টাফ রিপোর্টারী, তৎকালীন ইত্যাদী প্রকাশনীর লিখিয়ের চাকরীসহ নানাবিধ প্রাতিষ্ঠানিক লিখিয়ের কাজ ছেড়ে একসময় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, তিনি অপ্রাতিষ্ঠানিক হোলটাইমার লিখিয়ে হবেন। বাংলা থেকে দূরে বর্তমান ঝাড়খণ্ডের হিন্দীভাষী ধানবাদ শহরে বসে তাঁর বাংলালেখার চর্চা শুরু হয়। প্রায় ৪৫ টি বই তাঁর প্রকাশিত যার মধ্যে আছে ৬-৭ এর দশকের কোলিয়ারী অঞ্চলের শ্রমিক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে শ্রমিকনেতা এ.কে.রায়কে নিয়ে লেখা হিরণ্যরেতাঃ, আঞ্চলিক ইতিহাস হিসেবে দু-খণ্ডের ধানবাদ বৃত্তান্ত কিংবা বাংলাভাষার স্ল্যাং শব্দের একমাত্র অভিধানও। আর তার সাথেই শহর নামক এক পত্রিকা প্রকাশ। শহর নিয়ে আমি বলতে চাইছি না এই কারণে যে, পত্রিকাটি যারা দেখেছেন, তারা জানেন, যারা দেখেননি তাদের জানাবার জন্য এ লেখা নয়। তবে মেধা, সাহস এবং প্রতিষ্ঠানকে ফুৎকার দিয়ে লিটল ম্যাগাজিনকে যারা বাংলা সাহিত্যের একটি অপ্রতিরোধ্য সমান্তরাল ধারা বলে বিবেচনা করেন, শহর সেইসব মুক্তমনা পাঠকদের কাছে একটা অহংকার।

সে যাই হোক, অজিত রায়ের গদ্যশৈলীর বিশেষত্ব কী, সেটা একটু বুঝে নেওয়া দরকার। শুধু যৌনতা লিখলে একটা হিন্দী অধ্যুষিত শহরের মাফিয়ারাজ তাকে খুন করবার জন্য টার্গেট করত না, এবং পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায়, তাকে সে শহর পরিত্যাগ করে স্ত্রীর হাত ধরে কপর্দকহীন শুধু আশ্রয়ের সন্ধানে বিভিন্ন শহরে ঘুরে বেড়াতে হয় দীর্ঘ দিন। আসলে লেখালিখির প্রতি কতটা কমিটেড হলে এই ধরণের সম্ভাব্য আক্রমণের মুখোমুখি হতে হবে জেনেও লেখক সত্যের প্রতি নিষ্ঠ থাকবার সাহস রাখে তার কলিজায়। একবার নয়, নানা সময়ে নানা জায়গা থেকে হুমকি খেয়েও তিনি চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে পারেননি তার কলম, পারেননি বাজারী প্রতিষ্ঠানের দরজায় মাল (লেখা) বিক্রির ফিরিওয়ালা হতে। ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির প্রভাবপুষ্ট শহুরে বাংলাভাষার নাকে ঝামা ঘষে দিয়ে, প্রান্তিক মানুষদের ভাষার আগুনে ঝলসে নিয়েছেন তার সাহিত্য নির্মাণের প্রয়োজনীয় ভাষা কাঠামো। মনে পড়ছে, জেলার কোনো লিটল ম্যাগাজিন মেলায়, নিজের টেবিলের পাশে বোর্ডে কাগজ লিখে সাঁটিয়ে দিয়েছেন বিখ্যাত সেই উদ্ধৃতি “I hate to be a gentleman.” । আর সেটা দেখেই মনে পড়ে গেছিলো জীবনানন্দের উপন্যাসে উচ্চারিত সেই মোক্ষম দিব্যদর্শন, মধ্যবিত্তের জীবনে সম্মান হারানোর ভয়ে যেহেতু বেশ্যা গমন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না, তাই সুযোগ পেলেই বাড়ির কাজের মেয়ের সঙ্গে সেটা পুষিয়ে নেয়। সরাসরি অজিত রায়-ও তাই লেখালিখিতে মেকি ভদ্দরলোক সাজবার চেষ্টা কখনও করেননি।

যৌনবেগও যে জীবনের ওতপ্রোত এক তীব্র অভিরুচি, তাকে ইনিয়ে বিনিয়ে সাহিত্যের রাজপথ এড়িয়ে গলি তস্যগলি সহস্র এলোমেলো বাঁক ঘুরিয়ে পাঠককে ক্লান্ত ও বিরক্ত করে দেওয়ার চাইতে, সহজ স্বাভাবিক শব্দে তাকে স্পষ্ট ও সপাট অভিব্যক্ত করাই তার লেখালিখির এক বৈশিষ্ট। আর সে জন্যই অনেকেই প্রথম প্রতিক্রিয়ায় অজিত রায়ের লেখা বলতেই ধরে নিত উনি তো নাভীর নিচে ছাড়া কিছু লেখেনই না। জানি না তাঁর লেখা গদ্য যত্ন নিয়ে পড়বার যোগ্যতা কজনের আছে! কেন এ কথাটা বললাম পরে বলছি। দুটো একটা অসফল উপন্যাস পড়ে অজিত রায়কে বোঝা যাবে না। তাঁর লেখায় প্রান্তিক মানুষের জীবন, প্রাত্যহিক অস্তিত্বের লড়াই, স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গ অসহায়তা বারবার উঠে এসেছে একেকটা বা একাধিক চরিত্র সৃজনের মধ্যে দিয়ে অন্য এক ঝংকৃত গদ্যে, যে গদ্য ঘুমের আগে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে পড়ে ফেলা যায় না, যে গদ্য পড়তে গেলেও মেরুদণ্ড টান রাখতে হয় কারণ এই অ-সাধারণ গদ্য পাঠের আমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিলো না। জগদীশ গুপ্ত, সতীনাথ ভাদুড়ী, কমল মজুমদার বা অমিয়ভূষণের উপযুক্ত উত্তরসূরী হয়েও ব্যতিক্রমী এক বাংলা ভাষাকর্মী অজিত রায় এবং সেটা কলকাতা থেকে অনেকটা দূরে হিন্দীভাষী অন্য এক রাজ্যে বসে।

তিনি নিজেই বলেছেন, তাঁর লেখার প্রেরণা শক্তি কোনো মেটাফিজিক্যাল মিউজ বা ঈশ্বরী-টিশ্বরী নয়, শরীরী যৌনতার এক লৌকিক চেতনা– যে যৌনচেতনা পৃথিবীর যাবতীয় সৃজনের প্রেরণাশক্তি। যে শক্তিকে ধর্ম বর্ণনা করেছে কামশক্তি হিসেবে। আর এই কামই কর্মে রূপান্তরিত হয়। বা এভাবেও বলা যায়, কামহীন কর্ম হয়ই না বা হতেই পারে না, প্রাকৃতিক পর্যবেক্ষণের এটাই সিদ্ধান্ত। “কোথাও ফড়িঙে কীটে / মানুষের বুকের ভীতর”…। কোথাও এই যৌনতা শরীরে শরীর বিদ্ধতার মজায় বীর্যপতনে ছেতড়ে যায় বিছানায়, আর কোথাও এই যৌনচেতনাই শিল্পের সহস্র শাখায়, কালোত্তীর্ণ হয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, জীবনাতীত আরও এক সত্যের দিকে মানুষকে প্রলুব্ধ করে।  সুতরাং এটাই বলতে চাইছি, অজিত রায়ের বেশির ভাগ ভালো লেখাগুলির চালিকা শক্তি যৌনতা, অর্থাৎ তিনি যৌনতা লেখেন নি, যৌন চেতনাই তাঁকে লেখায় প্রণোদিত করেছে বিষয় থেকে বিষয়ের বিভিন্নতায়– এরকমই অজিত রায় মনে করতেন। এ প্রসঙ্গে ‘আছি’ বিষয়ক লেখার যে অংশটি আমার পত্রিকার ব্যাক-কভারে রাখতে বাধ্য হয়েছি, আরও একবার এই লেখাটির সঙ্গেও গেঁথে দিলাম–

“…লেখক হিসেবে আমার ধারণা একদম ক্লিয়ার কাট। লেখকের ব্যক্তিগত ইতিহাস এবং স্বমেহনই লেখালিখির একমাত্র বিষয় হতে পারে।– এই ডকট্রিনটা যখন আমার আস্থা আর্জন করেছিল, নিজের মধ্যে বেশ পুলক জেগেছিল। মানছি যে, কোন লেখকই এভাবে ফর্মুলেট করে লিখতে শুরু করে না। কিন্তু আদপেই আমার লেখা লেখে একজনই। স্বয়ং আমি। এই আমার সাহিত্য-স্মৃতি, বা প্রতিজ্ঞা। ব্যতিরেক শূন্য। আমার ‘আছে’ যা, ‘নেই’ও তা। আমার সমস্ত লেখালিখি মূলত একটিই বিরাট কন্টিনিয়েশনের এঁড়িগেঁড়ি খণ্ড। কোনোক্রমেই তা মোনোসেন্ট্রিক নয়। আমার প্রতিটি লেখার সিকোয়েল হামেশা বকেয়া

থেকে যায়। একফালি খেয়ে বাকিটা বাতায় ঠুসে দিই। আসলে কাঁচের গাড়ীই আমার অন্তঃপাদী আস্মদ। এভাবেই আমি ‘আছি’, নিজের ভেতর। দরমায় গাটি-মারা সরু সরু কঞ্চির মতো হাজার হাজার শব্দের বিনুনির মধ্যে গাঁথা আমার এই ‘আছি’।”…

অজিত রায়ের যে কোনও লেখার বিচ্ছিন্ন যে কোন একটি স্বতন্ত্র বাক্যও আমাদের বাজারচলিত পরিচিত ও প্রচলিত গদ্যের সহজ পথ ধরে হাঁটে না। সব চেয়ে বিস্ময়কর তাঁর শব্দ ব্যবহার। এত অচেনা শব্দ প্রতিটি বাক্যে, আবার চেনা শব্দেরও পদান্তর ঘটিয়ে এমন অচেনা করে পরিবেশিত করলেন, যেন চিরাচরিত অর্থের বাইরে বেরিয়ে এসে আরও নতুন কোনো অর্থব্যঞ্জনায় প্রতীকায়িত করছে নিজেকে। গদ্য নির্মাণের এই দক্ষশৈলী অভূতপূর্ব। কিন্তু এত নতুন নতুন শব্দ কোথায় পেতেন! এত এত অচেনা শব্দের এমন সাবলীল ব্যবহার, যেন ধরেই নেয়া হয়েছে পাঠক এ সব শব্দ জানেন বা তার অর্থ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। আদৌ আমাদের মত আমোদগেঁড়ে পাঠক এ সব শব্দের অর্থ না জানলেও, লেখকের সুদক্ষ প্রয়োগে নিজের মতো করে তার অর্থ করে নিতে অসুবিধে হয় না। লেখকের কৃতিত্ব তো এখানেই। প্রবন্ধ হোক বা উপন্যাস কিংবা ছোটগল্প, তাঁর লেখা পড়তে শুরু করলেই লেখক তার স্বতন্ত্র পরিচিতি নিয়ে অদৃশ্য পথে দাঁড়িয়ে যাবে পাঠকের সামনে। এতটাই স্বাতন্ত্র তাঁর গদ্যশৈলীতে এবং এতটাই ব্যতিক্রমী সেই স্বাতন্ত্র। আসলে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাভাষার এক ডায়াসপোরা নিয়ে চর্চা করছিলো অজিত-দা। বহুবার কথাপ্রসঙ্গে এ কথাটা বলেছে। এই চর্চার আইডিয়াটা তিনি পেয়েছিলেন নিয়মিত এক সান্ধ্য মদের ঠেক থেকে। এমন একটি মদের ঠেক যেখানে ভারতবর্ষের অন্তত দশটি ভাষার শ্রমজীবী মানুষ এসে বসে যেত সারাদিনের শেষে দম নিতে। সে ঠেকে আসত মাফিয়া ডন, ভাড়াটে খুনি, ছোট নেতা এসব মানুষ। আর প্রাত্যহিক তাদের সঙ্গে ইন্টার‍্যাকশনের ফসল তুলত অজিত রায় তাঁর নিজস্ব লেখায়। এখান থেকেই তাঁর মাথায় এই ভাষার ডায়াসপোরার ধারণাটি গেড়ে বসে এবং তাঁর লেখা পেতে শুরু করে বাংলাভাষায় নতুন শব্দব্যবহারের এক বিচিত্র প্রকাশমুখ। অপরিচিত শব্দের অর্থকে নিষ্কাশিত করবার দায়িত্ব নিয়ে ফেলে কাঁধে বাক্য-কাঠামোর ব্যতিক্রমী চলন। লেখক সফল ভাবে এই শৈলীর চর্চায় নিজেকে দক্ষ করে তুলতে থাকেন প্রতিটি লেখায়।

আর সে জন্যই বলছিলাম, দীক্ষিত পাঠক ছাড়া, অজিত রায়কে পড়তে শুরু করে পাঠ শেষ করবার জন্য পাঠকেরও একটা যোগ্যতা প্রয়োজন হয়। প্রচলিত শব্দ ব্যবহারের, প্রচলিত বাক্যগঠনের ফর্মূলামাফিক বাংলাগদ্যের পাঠকের কাছে অজিত রায় স্বাভাবিক ভাবেই এক ব্যতিক্রমী ওজনদার গদ্যকার, যার দেহাবসানের সঙ্গেই ঢ্যাঁড়া পড়ে গেল বাংলাভাষার বিশেষ এক গদ্যরীতির। যারা অজিত রায়কে নতুনভাবে জানছেন, তাদের অবশ্যই অন্ততঃ দুটি বই পাঠ করবার জন্য অনুরোধ জানাবো–  ‘যোজন ভাইরাস’ এবং ‘জোখিম কোরপাক’।… আপাতত লেখাটিকে এখানেই বন্ধ রাখছি পরবর্তী লেখার প্রয়োজনে।…

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...