অজিত রায় ও একটি কেস স্টাডি
সঞ্জয় সাহা

অজিত রায়। বাংলা গদ্যের একজন অন্যতম জরুরী লেখক। ‘এক নীলকন্ঠ দিগম্বর কাপালিক’। “অদ্ভুত রামায়ণ” রচয়িতা জগদ্রাম রায়ের উত্তর পুরুষ। “শহর” -এর সম্পাদক। স্থান কাল পাত্র নিয়ে লিখে ও তাদের সাথে মিশেও স্থান-কাল-পাত্রের উর্ধ্বে ওঠা এক সফল শব্দ মাফিয়া। ভাষাকে আক্রমণ করে ভাষাকে বাঁচানোর এক অন্যতম কারিগর এই ধানবাদের অকালপ্রয়াত তান্ত্রিক গদ্যকার। স্থান নিয়ে লেখা বলতে গেলে, ধানবাদ ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের কয়লা খাদানের গল্প ও সত্য  লিখতে গিয়ে কিডন্যাপ হয়ে যাওয়া  অজিত রায়। পাত্রের কথা বললে বলতে হয় নিবেদিতপ্রাণ কমিউনিস্ট একে রায়কে নিয়ে লেখা বইটির কথা। আর কাল, সে তো শুধু এই সময়ের বলতে -বলতে- চলে -যাওয়া বর্তমান কাল নয়, রূপকথার কাল হয়ে ওয়েসিসের কাল। বরং বলা ভালো আবহমানকাল উঠে এসেছে তার চিন্তা-চেতনায়  তার আবহমানের বৈশিষ্ট্য নিয়ে, যা শাশ্বত, যা অপরিবর্তনশীল। এক “যোজন ভাইরাস” লিখেই ডাবল সেঞ্চুরি। ন্যাকা চৈতন্যের বাঙালি সত্ত্বাকে তিনি যেন একেবারে রাস্তায় এনে দেখাতে চাইলেন জীবনের প্রকৃত স্বরূপ, সত্যের প্রকৃত স্বরূপ, যৌনতার অমোঘ আলো ও বাস্তবতায়। “জোখিম কোরকাপ”, “হিরন্যরেতা”, “ঘামলাঘাট”, ” নভাক যামিনি”, “নিরুজের রক্ততৃষা” এবং  আরো অন্যান্য উপন্যাস প্রবন্ধ ও গল্প ছেড়ে আমি তাঁর একটি বিশেষ গল্পকে আমার এই ছোট্ট প্রবন্ধের বিষয় হিসাবে উপস্থাপন করতে চলেছি। এবং নাম দিচ্ছি কেস স্টাডি। একদিকে এই গল্পের ভাষা, বুনন আক্রমণ সব যেমন অজিতিয় বা অজিত রায়ের প্রতিনিধিত্ব করে ঠিক তেমনি এই গল্পটি এই সময়ের কবি ও লেখককুলের হ্যাংলামোও সঠিক ভাবে উপস্থাপিত করে। গল্পের নাম –“একটি ‘গরু’র গপ্পো”।

বাংলা মিডিয়ামে পড়া বাঙালি মাত্রই আমাদের প্রত্যেকের জীবন শুরু হয়েছিল যে রচনাটি দিয়ে তার টাইটেল ছিল অবধারিতভাবেই ‘গরু’ এবং সবারই প্রথম বাক্যটি ছিল –“গরু একটি গৃহপালিত চতুষ্পদ প্রাণী”। গরুর চতুষ্পদত্ব কিংবা গৃহপালি তত্ব তাতে কমেনি বা  বাড়েনি। যদিও হাল আমলে ‘গরু’ শব্দটি একটি রাজনৈতিক শব্দ হিসেবে পর্যবসিত হয়েছে। কিন্তু এখানে গরু শব্দটির ব্যবহার অন্য এক স্তরে। সামাজিক-সাংস্কৃতিক তো বটেই এবং কিছুটা রাজনৈতিকও। খুব উচ্চপর্যায়ের হিউমার। এর ছত্রে ছত্রে রয়েছে–” ইন্দিরা গান্ধী কাটিয়া জিলিপি করিয়া দেবার তত্ত্ব”। কিংবা অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের “তামাকু সেবনের অপকারিতা” বিষয়ক নটিকাটিতে বক্তার স্ত্রীর অনিবার্য উপস্থিতি।

সারা পৃথিবী যখন কোয়ালিটির দিকে ঝুঁকছে তখন আমরা অনুপ্রেরণায় আর উদ্যোগে  (তা কখনও ব্যক্তিগত কখনো রাষ্ট্রিক।)  ছুটছি কোয়ান্টিটির দিকে। প্রতিদিন হাজার হাজার কবিতা লেখা হচ্ছে। শত শত গদ্য। মণীন্দ্র গুপ্তদের সাবধান বাণী আমরা শুনিনি, ফলে লক্ষ লক্ষ  পৃষ্ঠা জুড়ে বাংলা শব্দের অপচয়। আর মই খোঁজার চেষ্টা। স্মারক, সম্মান প্রাপ্তির লোভ আর মাঁচা রোগের জীবানু  ঢুকে গেছে বাংলা ভাষার নির্মাণ কর্মীদের ডিএনএতে। আর নিজের জায়গায় নিজেকে কেউকেটা প্রমাণ করবার জন্য অপেক্ষাকৃত বড় শহর বা নগর থেকে অপেক্ষাকৃত বড় কোনো সাহিত্যিক বা কবিকে ধরে এনে তাকে প্রাথমিকভাবে ফুলের তোড়া মিষ্টিতে আপ্যায়ন করে ও পরবর্তীতে রাতে পানীয়ের লোভ দেখিয়ে তার প্রশংসা শোনা –এটাই এখন পবিত্র কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্রাম বাংলার তথাকথিত কবি-লেখকদের। আর এই জায়গাটিকেই আক্রমণ করেছেন গদ্যকার অজিত রায় তার “একটি গরুর গপ্পো” নামক গল্পের মধ্য দিয়ে। গল্পের শুরুতেই অনেকটা বলে দিয়েছেন অজিতদা।

“হালিডোবা এলাকার মদন বাবুর ঘাড়ে দুরারোগ্য ব্যাধির মত বড় লেখক হবার ভূত চেপেছে। এমনিতে মা-বাবার কোলে দোল খেয়ে মানুষ। ঠাকুরমা চাল বাটা খাইয়ে হাত-পা শীর্ণ থেকে ধুম্বা করেছেন। কিন্তু মা স্বরস্বতীর চাঁটি সঠিক না পড়ায় মগজটি থেকে গেছে আদ্যন্ত  নিরেট। স্বীয় তষ্টি থেকে মদন বাবু শুধুমাত্র একটি জিনিশই সফলভাবে আহরণ করেছেন—- বানান জ্ঞানহীন অশিক্ষিতের ভাষা।”

খুব অপ্রিয় অথচ সত্য কথাই বলেছেন অজিতদা তারই গল্পে এখন যেমন কবির কাছে কবিতাটা আর বড় কথা নয়, বড় কথা তার বিখ্যাত হওয়াটা। তাই মদনবাবুর ডাকে আদিত্য বাবু তার সভায় গিয়ে প্রথমেই বক্তৃতায় বলেন,—” আগে বোঝা দরকার কবি কে। কবি বিখ্যাত হন কিভাবে।” আবার বক্তব্যকে সত্যের কাছাকাছি নিয়ে যেতে তিনি উদ্ধৃতি সহযোগে সিওডোসিরিয়াস হয়ে ওঠেন বলতে থাকেন —“বিখ্যাত কবি হল ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী। প্রকৃতি যত কবিতা গান ছবি বিশ্বে, মহাবিশ্বে রচনা করেছেন তাতে কবির আনন্দ। কিন্তু সে আরও কিছু নতুন মাত্রা লাগিয়ে তাকে নিজের মত দেখতে, পেতে চায়। নির্মাণ করে। কবি দেখেন চুল সুন্দর, তবে বিদিশার নিশা। চোখ সুন্দর, তবে পাখির নীড়। রোদ সুন্দর তবে কমলা রং। মানে আমার চেতনার রঙে কান্না হল সবুজ। যেমন মঙ্গল গ্রহে সূর্যাস্তের রঙ নীল। এভাবেই কবি বিখ্যাত হয়। কবি যেহেতু ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী।” কিন্তু আদিত্য বাবু ও তো মদন বাবুর মতোই  মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তার মন পড়ে রয়েছে মদন বাবুর বাড়িতে রান্না হওয়া মাংস রন্ধনকালিন ঘ্রাণের দিকে।

“আদিত্য বাবু আবার হঠাৎ বলে উঠলেন ‘না না, মনে হচ্ছে মুরগির মাংস!’— এবারেও শ্রোতারা একসঙ্গে হেসে উঠল আদিত্য বাবু বললেন মানুষ এই মুরগী বানিয়ে মানে এই কবিতা করে কি পেতে চায় বলুনতো? না, না  আমি কবিতার কথাই বলছি। প্রত্যেক কবির কিছু নিজস্ব মশালা, ছোঁক, রন্ধনপ্রণালী। ভাবে, ওটা ওভাবে নয়, এভাবে। শব্দকে নতুন করে ভাজে। সে সেদ্ধ হোক, সুগন্ধি ছড়াক। পরাজিত দুঃখী বেস্বাদ না হয়ে সুস্বাদু হোক। এমন কবিতা লিখি, এমন, যেন একটাতেই জ্ঞানপীঠ। “

পাঠক, লক্ষ্য করুন, আদিত্য বাবু কেমন পুরস্কারে এসেই থেমে যাচ্ছেন। অর্থাৎ কবিতার নান্দনিকতা, কবিতার সৌন্দর্য নিয়ে কোনো কথা নয়, কবিতার লক্ষ্যই যেন পুরস্কার। আসলে পুরো গল্পটাই কবিলেখকদের বিখ্যাত হওয়ার রস ও রসায়ন নিয়ে মদন বাবু এবং আদিত্যবাবুর একটি ডিসকোর্স। বইয়ের অভ্যন্তরস্থ বিষয় নয়, আকার আয়তন ও যে বিচার্য হয়ে ওঠে তারও শ্লেষাত্মক  বিশ্লেষণ আছে।

“আরে মশায় চৌষট্টি  পৃষ্ঠার কম হলে তাকে বলে পুস্তিকা। চৌষট্টি  থেকে একশো ষাট  পৃষ্ঠা হলো বই বা পুস্তক। এটাই সরকারি মাপদণ্ড। ৫০০ পৃষ্ঠার  অধিক হলে বলা হয় মহাগ্রন্থ। মহাগ্রন্থের লেখকরাই অমর, বাকিরা চুনোপুটি।  এটা কিন্তু সরকারি হিশেব। কোন খাদ নেই। “লেখক অজিত রায় কি নিজেকেও এখানে জাস্টিফাই করছেন না? তারও তো সব লেখাই পাঁচশো পাতার কম। আদিত্য বাবুর সাজেশন মদনবাবুকে একজন পার্ট টাইমার  ক্লার্ক নিয়োগ করার যে শুধু তার বংশের কথাগুলো লিখবে এবং তাই বই আকারে সমাদৃত হবে জনমানুষেরকাছে। লেখক কবি বিনয় মজুমদারের মতো তিনি সুন্দরভাবে গাণিতিক হিসাব পেস করে দেন যে কত টাকা ইনভেস্ট করলে কত টাকা লাভ হতে পারে এবং কতজন পাঠকের কাছে তাকে পৌঁছানো সম্ভব। সংবাদপত্রের রিভিউ যে শুধু ব্লার্ব পড়েই হয় সেটাও জানিয়ে দিতে ভোলেন না লেখক সম্পাদক অজিত রায় তাঁর সরস মুন্সিয়ানায়।

বিষয় ও বিষয় হীনতাকেও আক্রমণ করেন গল্পকার অজিত রায়। “চারিদিকে তাকিয়ে দেখুন গুচ্ছের সাবজেক্ট পড়ে আছে। যেমন ধরুন  ইয়ে,আপনি একটা গোরু নিয়েও তো  দিব্যি লিখতে পারেন। পারেন না? ভারতীয় গোরু, সুতরাং গুঁতোর কথাটা অবশ্যই লিখবেন। তার পায়ে প্লাস্টিকের খুর, গায়ের রং হলুদ। বয়স আট বছর আট মাস আট দিন। বিদেশীরা এসে তো পরখ করছে না যে ভারতীয় গরুর রং হলুদ কি শাদা। হলুদ গরুও তো হয়। যেমন মঙ্গল গ্রহে সূর্যাস্তের রঙ নীল। কেউ দেখতে গেছি? নাসার বিজ্ঞানীরা বলেছে তাই বিশ্বাস করতে হচ্ছে। “

এইসব বলতে বলতে রাত হয়ে যায়। মদনবাবুর ঘুম পেতে থাকে। হাই তোলে আর আদিত্য বাবু বলতে থাকেন ।—-“এভাবেও তো লেখা যায়, মদনবাবু। এ গোরুর ঘুম পায়, গোরু হাই তোলে, গোরুর চোখ জ্বালা করে, গোরুর মাথায় পোকা—“

আমরা বুঝতে পারি আসলে গরুটি কে বা কারা। আর ঠিক  তখনই মদনবাবুও বিখ্যাত হবার সঠিক রসায়নটি খুঁজে পায় –পঞ্চাশ  জন কবির কাছ থেকে এক হাজার টাকা করে তুলে ও তাদের একটি করে কবিতা নিয়ে  পঞ্চাশ  হাজার টাকা মোট খরচ করে  পৃথিবীর পঞ্চাশটি দেশে বইটি পাঠিয়ে পঞ্চাশ গুন টাকা  ফেরত পাবার নিশ্চিত আশ্বাসে। গল্প শেষ হয়। লেখাকর্মী হিসেবে অনেককেই এ গল্প আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিতে থাকে।

অজিতদার প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা শুধুতো বিষয়গত ভাবে নয়, তার উপস্থাপনাতেও। এমনি এমনি তো আর তাকে আমরা শব্দমাফিয়া বলছি না। প্রাকৃত শব্দের প্রকৃত ভাবে প্রয়োগ করার বিরল ক্ষমতা তার ছিল। বাংলার শব্দ মানচিত্রকে তিনি বিস্তৃত করেছেন। শুধু  তাদের স্থানিক ভূগোলে নয়, অবস্থানগত বৈচিত্রেও । শ্রেণীহীন সমাজ ব্যবস্থার জন্য যে শব্দ ও শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রেও শ্রেণী চেতনার ঊর্ধ্বে ওঠা প্রয়োজন তা তিনি বুঝেছিলেন এবং বুঝেছিলেন বলেই তা নিজের লেখাতেও  আনতে পেরেছিলেন সেভাবে । তার গদ্যসাহিত্যের প্রত্যেকটা লেখাই যেন শব্দ এবং অক্ষর দিয়ে তৈরি করা একেকটা আরডিএক্স এর সমাবেশ। এবং এ গল্পেও  এরকম একটা সূত্র প্রয়োগ করে কোথায় যেন নিজেকেও আক্রমণ করেছেন।

“—সাধারণ লেখকদের বেশকিছু মুদ্রাদোষ আছে। তারা অনেক শব্দই না বুঝে বা অল্প বুঝে লেখার ব্যবহার করেন। এই যে আপনি বললেন ভোরবেলা বেলি! বেলা কথাটা ঠিক আছে কিন্তু তাতে বেলি যোগ করলেন কেন? তারপর ধরুন যত্নআত্তি কালেভদ্রে আশেপাশে বিষয়আশয় আধিব্যাধি  বাসনকোসন সাদামাটা অবরেসবরে। এইরকম প্রচুর শব্দ। যত্ন কাকে বলে আপনি জানেন কিন্তু আত্তি মানে বলুন তো? আপনি জানেন না। পাশে জানেন কিন্তু আশে জানেন কি? কার্য বোঝেন,কলাপ বোঝেন কি? খেয়াল করে দেখবেন বিখ্যাত লেখকরা তাদের সারা জীবনের সাহিত্যকর্মে কখনোই এইসব হাফ মিনিং শব্দ ব্যবহার করেননি। তাহলে এটাও বড় লেখক হয়ে ওঠার একটা সূত্র। “

একইসাথে লেখক অজিত রায় কি এটা বোঝাতে চান না, যে একজন বিখ্যাত লেখক সে সবসময়ই পরিকল্পিতভাবে কিছু ড্রইং রুমের বাঁধা বাঁধা, বাছা-বাছা শব্দ ব্যবহার করে তার সাহিত্যকে কৃত্রিম করে তোলেন, তাঁর সাহিত্যকে মুখের ভাষা থেকে সরিয়ে কেতাবি মৃত  ভাষায় পরিণত করেন?

ব্যক্তিগত পরিচয় সূত্রে জানি অজিতদা কতটা অকপট ছিলেন জীবনে, লেখায়, জীবনচর্যায় ও জীবনচর্চায়। প্রচুর ডিগ্রি ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও জীবিকার পেছনে না ছুটে জীবনের পেছনে ছুটেছেন। জীবনকে ভালোবেসেছেন এবং জীবনকেই বাজি রেখেছেন। এ গল্প তার বিখ্যাত হবার গল্প নয়। এ গল্প মধ্যমেধার লেখকদের উচ্চাশার গল্প, ছলে বলে কলে কৌশলে প্রচারের নেওন আলো পাবার গল্প যা অজিত রায় সারাজীবন ধরে দেখেছেন। এবং যার বিপ্রতীপে তাঁর অবস্থান গিরিরাজ হিমালয়ের মতো। অজিতদার প্রতিটি গল্প, লেখা ধরে ধরে, পোস্টমর্টেম করে করে আমরা এক অদেখা, অলেখা সত্যের কাছে পৌঁছতে পারব একদিন। আমাদের পৌঁছতে হবে একদিন, কেননা বাংলা সাহিত্যের মানচিত্র বিস্তারের ক্ষেত্রে, বাংলা সাহিত্যের স্পন্দনকে ধরতে গেলে বা বলা ভাল জীবনের স্পন্দনকে ধরতে গেলে অজিত রায় বড় বেশি জরুরি ও অপরিহার্য । 

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...