অজিত রায়-একটি অন‍্য ও অনন‍্য পাঠ
রিমি দে

অজিতদাকে নিয়ে স্মৃতিচারণার তেমন কোন সুযোগ আমার নেই। তার কারণ আমাদের একসঙ্গে কাটানো সময় প্রায় নেই বললেই চলে। বইমেলা, লিটল ম্যাগাজিন মেলা, কফিহাউজে যেটুকু দেখা। বরং  বলা যেতে পারে লেখালেখিই মূল যোগাযোগের মাধ্যম। তাই বলে কি অজিত রায়ের সঙ্গে ফোনে কথাবার্তা হয়নি! হ্যাঁ, হয়েছে। বছর কয়েক আগে ওঁর স্ত্রী শিলিগুড়ি এসেছিলেন। আসবার আগে আমায় ওর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলিয়ে দিয়েছিলেন। শিলিগুড়ি এলে আমায় ফোন করবেন দরকার হলে। পরে শুনলাম আসেননি! কাজেই পারিবারিকভাবেও অজিত রায় আমার কাছে অচেনা। তবে যতটুকু মিশেছি মেলাটেলায় বা কথা বলেছি তাতে কিছুটা হলেও চেনা যায়!  সহজ ও খোলা মনের মানুষ ছিলেন। অজিত রায় সম্পাদিত শহরে গদ্য এবং কবিতা একাধিকবার লিখেছিও। এইবছর বেশ কিছু কাগজের পূজা এবং বইমেলা সংখ্যায় অজিতদার লেখা দেখলাম। প্রণব চক্রবর্তীর ইন্টারাকশন পত্রিকায় ‘আছি’ সংখ্যায় না থেকেও রয়ে গেলেন! অদ্ভুত এবং আশ্চর্য গদ্যশৈলীতে অজিতদার স্বভাষ্য তুলে ধরলাম, ‘আমি মানুষটা সর্বত্র শেকড়কাটা। আটপুরুষ আগে বংশে এক পিতা-পুত্র রামায়ণ লিখেছিলেন, যার বাবদ কাশীপুরের মহারাজার তরফ থেকে আমাদের রায় পদবী হাসিল। অর্থাৎ দায়াদসূত্রে কবি জগদ্রাম আমার সাতপুরুষ আগেরপুরুষ। কিন্তু এটুকু পেডিগ্রি কোন কাজের?  তাকে বয়ে বেড়ালেই বা কী! ভবি বললে, আই মাস্ট কাট ইওর রুট রুথলেসলি। সেই থেকে শেকড়কাটা। তারপর এক মধ্যরাতে আমাকে তালা-হাতুড়ি নারকোলের ঝাঁটার বাড়ি মেরে বাড়ি থেকে ভাগিয়ে দিল, ছ-বছর ফিরিনি, বাড়িকাটা হয়ে গেলাম। বিয়ের মতো কিছু একটা হয়েছিল প্রেরণার সঙ্গে, কিন্তু বিয়ের দশ বছরের মাথায় প্রেরণা চলে গেল যৌন-স্ট্রাইকে; আর আমি হয়ে পড়লাম একুনে রিরংসাকাটা। সঠিক অঙ্ক কষে বললে, চল্লিশ- বেয়াল্লিশ বয়সেই হয়ে পড়লাম সর্বত্রকাটা। তারপর আর কোন সম্পর্কই আর জোড়া লাগেনি। সর্বত্রকাটা একটা মানুষের কী বা ‘আছি’,কী বা ‘না-আছি’! দিনের আলো লাট খেয়ে দিগন্তে এখন রক্তিম জরিপাড়। চারদিকের শামাদান ও দীপঝাড়ের বাইরে টাকাকড়িহীন নিস্তেল রুক্ষ অন্ধকারময় পরিখায় ফাৎনা ফেলে আত্মপ্রত্যয়ী ছিপ হাতে বসে আছি।’

এরপর অজিতদা চলে এসেছেন ওঁর নভেলা ‘যোজন ভাইরাস’ প্রসঙ্গে। যোজন নিয়ে কথা হবে। কিন্তু ওঁর গদ্যের ভাষা লক্ষ করুন পাঠক। কী অদ্ভুত না! ধরনটাই পৃথক। এরকম হাটকে লেখা আমজনতার কাছে তেমন গ্রহনযোগ্য হয়ে ওঠে না এই ভাষা তেমনভাবে। যদি কোন প্রভাবশালীর হাত ওঁর মাথায় থাকত তাহলে এই ভাষাকর্মীকে কে আটকায়! কিন্তু আদ্যন্ত অন্য ধাতুতে গড়া এই মানুষ। অথচ নিরলস লিখে গেছেন। লেখায় মেধার দীপ্তি যেমন তেমনই মসৃণতায় লেগে থাকে শক্তি। যাঁরা ওঁর পাঠক তাঁরা ওঁকে খুঁজে পড়েন এবং পড়বেন। পাঠকপিয়াস  কার না থাকে বলুন! কিন্তু প্রচুর পাঠক পাবার জন্য যে ফ্যাক্টরগুলি কাজ করে সেটা সবার থাকে না! শুনতে হয়ত খারাপ লাগবে যে, খুব বেশি মেধাবী লেখা আমপাঠকের জন্য নয়! অজিত রায় নিজেই বলে গেছেন ওঁর প্রায় বেশিরভাগ  উপন্যাসই আত্মজৈবনিক। কীভাবে লিখি বলতে গিয়ে অজিত রায় বলেন যে, কাহিনি বা গল্প নিয়ে তেমনভাবে ভাবেন না। লিখতে লিখতে গল্পটা তৈরি হয়। আরও বলেন, ‘আমি উনুনে বেগুন ফেলে তার সর্বত্র দগ্ধ হওয়া অব্দি অপেক্ষা করি। এক একটা বাক্য বা অনুচ্ছেদ লিখে খারাপ না লাগা পযর্ন্ত অপেক্ষা করি।’

অজিত রায়ের বেশ কটি উপন্যাসের এবং গদ্যের পাঠ অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে একটি বহু আলোচিত ‘যোজন ভাইরাস’ -এটি নিয়ে কিছুকথা না বললেই নয়! ছয় টা সংস্করণ বেরিয়ে গেছে। এই উপন্যাস নিয়ে সর্বশেষ প্রকাশনার বিজ্ঞাপনটি ছিল এমন– ”না প্রাতিষ্ঠানিকদের বই সচরাচর আমজনতার হাতে হাতে ফেরে না, কেননা তা জনরুচির গড্ডালিকা গতের বিপ্রতীপে দন্ডায়মান এক মূর্তিমান ডিসকম্ফোর্ট স্বরূপ। কিন্তু অজিত রায়ের ক্ষেত্রে ঘটেছে এক অদ্ভূত ব্যত্যয়। সময়ের চাঁদমারিতে

হুল বিঁধিয়েছে তাঁর ‘যোজন ভাইরাস ‘।…………….যোজন ভাইরাস আধুনিক বাংলা সাহিত্যে যুগান্তকারী ও অসাধারণ সৃষ্টি।”

অজিত রায়ের গদ্যের মূল আকর্ষণ ওর কারুকার্যময় ভাষা। এবং অবশ্যই তা অপ্রচল। একেই প্রবাসী বাঙালি হওয়ার জন্য প্রচুর হিন্দী আঞ্চলিক শব্দ পাই। প্রাদেশিক বৈদেশিক ও নিজস্ব শব্দ দিয়ে উৎসব আঁকেন অজিত। লেখক নিজে বলেছেন, ‘বঙ্গেতর, দিশি, ফুটপাথিয়া, স্ল্যাং, স্বল্প-ব্যবহৃত চলিত ও সাধু শব্দ এবং স্ব-কৃত মিশ্র ও মৌলিক শব্দ দিয়ে আমার এক-একটি রচনার সিনট্যাক্স। ভাষায় এই মিশ্রভাবের সঞ্চার ঘটানো ওঁর পরিকল্পিত ও ইচ্ছাকৃত। অজিত রায়ের কোন লেখাতেই তেমন তথাকথিত গল্প নেই! আছে অননুকরণীয় গদ্য নির্মাণ। আছে ইমাজিনেশন। আছে উদভাবন! মগজের খেলা! সৃজনভাবনা এবং হিউমার। অদ্ভুত অন্যরকম আশ্চর্যজনক! না কমলকুমার, না সন্দীপন! যোজন ভাইরাসে নায়ক সাপের মতো হাসে! বউ সম্পর্কে নায়ক কমলের অ্যাম্বিশন ছিল তার বদনখানি হবে নিমকদার। এ আর এমন কী! সবাই চায়। কমলের এক্সপেক্টেশনটা ছিল খানিক হেলে। হালকা গোঁফ থাকবে। নোলক পরবে। ঝিকমিক ঝিকমিক। যার ঠোঁট মনে পড়লে মাথায় চড়ে যাবে থ্যাঁতা রসুনের গন্ধ। যাকে চুমু খেলে সারাটা রাত টকে থাকবে মাড়ি।…….’

এগুলো যোজন ভাইরাসের ভীষণ বিখ্যাত উক্তি। ‘ভাপানো বুক। বার্টসিনা বোঁটা। বোম্বাই নলকিনী। মুঠো-খানেক  মুজঘাস। কিংবা মধুকুপি। পাকাপোনার পেটির সদৃশ সিংহদ্বার। পাল্লা সরালে সদ্য পেড়ে আনা ভূতকেশী ফুলের পারফিউম। এসব অন্তত। যৌন চিহ্ন দিয়ে লেখা কবিতা! এ বই ঘাড় সোজা করে পাঠ করতে হয়েছিল! বুঁদ হয়ে থেকেছিলাম!

‘খানাখারাব’ এও এক অদ্ভুত যৌনকাতরতা।  ট্যাবু নেই বিন্দুমাত্র। আসলে লেখক বিশ্বাস করেন যৌনতা শব্দটি ধর্মশাসন আর আকাদেমির  ট্যাবু ব্যাপারটার সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গিয়েছে যে ‘যৌনতা’ তার সনাতনী ঝংকারই ভুলে গেছে! ফ্রয়েড যৌনতাকে যেভাবে দেখেছেন সেসব তাত্ত্বিক লিবিডো বিষয়ে না গিয়ে বরং বলি অজিত রায়ের কাছে যোনি উদ্ভুত যৌনতা যতখানি যথার্থ তার চেয়েও বেশি কল্পনা। অনুপম যা কিছু তা যদি কল্পনার স্পর্শে অর্গাজমের সুন্দর আনন্দে পৌঁছে দেয়, সেটাই একজন লেখকের হয় বলে অজিত রায় বিশ্বাস করতেন।

তবে ‘জোখিম কোরকাপ’ কিংবা ‘খানাখারাব’ বা ‘কারগিল হাসিলের দিনগুলি’ যেটাই হোক না কেন, ওঁর নির্মাণে শৃঙ্গার রসের আধিক্য রয়েছে এক্কেবারে ট্যাবুহীন। তার চেয়েও বেশি যা রয়েছে প্রচলিত ধারাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজস্ব আদব কায়দায় প্রবাহিত হওয়ার সাহস! যা নিতান্তই অজিতীয়। শুধু মেধা নয়, তার সঙ্গে প্রজ্ঞা পর্যবেক্ষণ ও জীবনবোধের সংমিশ্রণে অজিত রায়ের নির্মাণ শৈলীতে যে কৌশল ও অধ্যয়ন রয়েছে তা চেতনাবক্ষে আঘাত যেমন দেয়, তেমনই পাশাপাশি মসৃণতার আরামে আলুলায়িতও করে। মোদ্দা কথা হল অজিত রায় পড়তে বসার আগে মানসিক প্রস্তুতি দরকার। পাঠের পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং ট্রাডিশনাল চিন্তার প্রভাববর্জিত হয়ে একজন নিবিষ্ট পাঠককে লক্ষ‍্য করতে হবে গদ্যের নির্মাণ এবং মানব চরিত্রের সহজাত অনুভব। কামনা ও কাব্যের ব্যঞ্জনা অক্ষরের শিরায় উপশিরায়। সবচেয়ে মুগ্ধ হই তখন, যখন দেখি সত্যের শীতলপাটিতে অজিত রায়ের গদ্য সত্যেরই অনুসন্ধানে! আর সত্যের মূলে রয়েছে সৃষ্টির আদিতমসুর। নর ও নারী! প্রকৃতি ও পুরুষের চিরকালের সম্পর্ক।

ওঁর বই বিক্রিটিক্রির খবর বলতে পারব না ঠিকই, কিন্তু অজিত রায়ের লিখনশৈলী নিয়ে আলোচনা লিটল ম্যাগাজিনে হয়েছে। একজন শক্তিশালী ব্যতিক্রমী গদ্যকার হিসেবেই তাঁর পরিচয়। একজন সম্পাদক হিসেবেও আমি ওঁকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।

দোগলাচরিতে সন্দীপনীয় স্টাইলের ছায়া থাকলেও  ভালোবাসা ও অ-ভালোবাসায় মোড়া ছিল যৌনতা। তখনও ফ্রয়েডীয় লিবিডো অমন উগ্রতায় দেখা দেয়নি। কেউ কেউ অজিতের লেখাকে অশ্লীলতার ছায়া পেলেও আমি বলি চলমান প্রথাগত ধারার বিপ্রতীপে অজিতীয় ধারা এক আঘাত যা ব্যথার পরিবর্তে মগজের আন্দোলন ঘটায়। শব্দ- ভাষা-চেতনা-অবচেতনার তলদেশ অব্দি নাড়িয়ে দেয়! কেঁপে উঠতে হয়! ধরে ধরে  অজিতপাঠের প্রতিক্রিয়া জানাতে হলে এ এক অসীম প্রশ্নের মুখে দাঁড় না করিয়ে ছাড়বে না, এ-কথাহলফ করে বলা যায়! অনন্ত পরিসরও বৈকি!

কাজেই আমার মনে হয় দায় না সেরে বাংলাভাষা চিন্তকদের মধ্যে অজিতভাবনা জারি থাকুক। উন্মোচিত হোক অজিত রায়ের লেখালেখির নানান দিকগুলি।

Write a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loading...